সর্বশেষ

  মালয়েশিয়ার সরকার ও বিশ্বব্যাংকের সহায়তা চাইলেন মেয়র আরিফ   ওসমানীনগরে কিশোরী ধর্ষণের ঘটনায় ধর্ষক গ্রেফতার   নিজের নিরাপত্তা চেয়ে যুবলীগ নেতা শামিমের জিডি   দিরাইয়ে তুহিন হত্যা, বাবার পক্ষে লড়বেন না কোনো আইনজীবী   বিয়ানীবাজারে সিসি ক্যামেরায় আওতায় আসলো খলিল চৌধুরী আদর্শ বিদ্যা নিকেতন   সন্ত্রাসের-দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম জেলা ছাত্র ইউনিয়নের পদযাত্রা   সন্ত্রাস ও আধিপত্যের বিরুদ্ধে সারাদেশে ছাত্র ইউনিয়নের ‘শুভ্র পদযাত্রা   বড়পুকুরিয়া দুর্নীতি মামলা: বরখাস্ত হচ্ছেন অভিযুক্ত কর্মকর্তারা   নিজ সন্তান হত্যা এক ধরনের মানসিক রোগ   ভারতে আটকে আছে পাঁচশ টন পেঁয়াজ   বিবিসির ১০০ নারী ২০১৯: তালিকায় রোহিঙ্গা ক্রিকেটার জেসমিন   কলেজে না গিয়েও সারাদেশে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় দ্বিতীয় নেহা   সিলেটে বিদেশগামী মানুষের মেডিক্যাল চেকআপের নামে ভয়াবহ প্রতারণা   ১৫ বেপারীর নিয়ন্ত্রণে সিলেটের পেঁয়াজের বাজার   দক্ষিণ সুরমায় ধর্ষণ মামলার পলাতক আসামি গ্রেফতার

কৃষি

তাল চাষ ও তার সম্প্রসারণ

প্রকাশিত : ২০১৭-০৮-২০ ১৯:৫১:২৫

রিপোর্ট : দিবালোক ডেস্কঃ




তাল বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অপ্রচলিত ফল। একক লম্বা কান্ড ও তার আগায় সুন্দর ভাবে এক গুচ্ছ পাতার সমারোহে সুশোভিত তাল গাছ দেখতে অপূর্ব লাগে। গাছের প্রাকৃতিক রূপের অপূর্ব বর্ণনা দিয়ে অনেক কবি তাঁদের কবিতায় তাল গাছকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নারিকেল, খেজুর, সুপারীর মত তাল একই ‘পামী’ পরিবারভূক্ত। এ উদ্ভিদ এক দল বীজপত্র দলীয় এবং এ গাছের শিকড় গুচ্ছ মূল বিশিষ্ট। তাল গাছের  শিকড় মাটির বেশি গভীরে পৌঁছে না, তবে শতাধিক গুচ্ছ মূল চারদিকে সমান ভাবে ছড়িয়ে মাটিকে শক্ত করে ধরে রাখে। প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা (ঝড়, সাইক্লোন) থেকে গাছকে রক্ষা ও ভূমির ক্ষয় রোধ করে। বয়স্ক গাছ ৬র্০-৮র্০  ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। গাছের আগায় ৩৫-৫০ টা শক্ত পাতা থাকে। পাতার আগা সূচালো হওয়ায় বর্জ্যপাত রোধক গাছ হিসাবে এ ফলের আবাদ অতি জনপ্রিয়। একই কারণে বর্জ্যপাতের কবল থেকে প্রাণিকূলকে রক্ষা করার জন্য ও গাছের বহুবিধ ব্যবহার সুবিধাকে কাজে লাগানোর লক্ষ্যে তাল ফল সম্প্রসারণে অনেক দেশেই প্রাধান্য দেয়া হয়। একই গুরুত্বে বাংলাদেশ সরকার চলতি বছরে (২০১৬-২০১৭) ১০ লক্ষ তাল চারা রোপণ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। চলতি ২০১৭ সালে ডিএই ২ লক্ষ তাল বীজ/চারা সারা দেশে রোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।


পুষ্টিগুণঃ  তাল অতি পুষ্টিকর ও ঔষধীগুণ সমৃদ্ধ। সব ধরণের ফলে দেহের জন্য উপযোগী বিভিন্ন প্রকার ভিটামিন ও মিনারেলস সমৃদ্ধ হলেও তালে এর বর্হিভূত কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদন রয়েছে। অন্য ফলের তুলনায় এ ফলে ক্যালসিয়াম, লৌহ, আঁশ ও ক্যালোরীর উপস্থিতি অনেক বেশি। বয়স্কদের জন্য এ ফলের উৎস থেকে সহজেই হজমযোগ্য পর্যাপ্ত আঁশ


প্রাপ্তিতে অতি গুরুত্ব বহন করে। আখের গুড়ের চেয়ে তালের গুড়ে প্রোটিন, ফ্যাট ও মিনারেলসের উপস্থিতি বেশি।


ঔষধীগুণঃ  তালের রস আমাশয় নিরাময়, মূত্রের প্রবাহ বৃদ্ধিকারক এবং পেটের পীড়া/প্রদাহ, কোষ্ঠকাঠিন্য নিরসনে সহায়ক। এ ফলের রস সেবনে শরীরকে ঠান্ডা রাখে, কান্তি দূর করে, দেহে শক্তি যোগায় এবং অনিদ্রা দূর করে। তালের রস থেকে তৈরী  মিশরী সর্দি-কাশি নিবারণে বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য মহৌষধ হিসাবে কাজ করে। এছাড়া যকৃতের পীড়া ও পিত্তনাশক হিসাবে এ ফল অতি কার্যকর।


উপকারিতাঃ কাঁচা-পাকা  তাল ও গাছের প্রতিটা অঙ্গ জনজীবনে অতি গুরুত্ব বহন করে। বয়স্ক গাছের (৫০ বছর ও তার উর্দ্ধ) কান্ডের টিম্বার ভ্যালু খুব বেশি। গ্রাম-গঞ্জে টিনের বা সেমিপাকা বাড়ি তৈরীতে এ গাছের শক্ত দীর্ঘস্থায়ী কাঠের ব্যবহার জনপ্রিয়তা খুব বেশি। কাঁচা ঘর তৈরীতে খড়ের বিকল্প হিসাবে দরিদ্র পরিবারবর্গ তালের পাতাকে অন্যতম উপাদান হিসাবে ব্যবহার করে থাকে।


বর্ষায় প্লাবনে তালের কান্ড দিয়ে ডিঙ্গি বানিয়ে অনেকে পানি পথ পারাপার হয়। জ্বালানী হিসাবেও তালের পাতা ও ডগা ব্যবহার করার প্রচলন গ্রাম-গঞ্জে বেশি। প্রাচীনকালে যখন কাগজের ব্যবহার প্রচলন ছিলনা তখন লেখা-পড়ার কাজে কাগজের বিকল্প হিসাবে তাল পাতা ব্যবহার করা হত। তাল পাতা দিয়ে নানা প্রকার হাত পাখা তৈরী করা হয়। গরমকালে এ পাখার ব্যবহার খুব বেশি। তাল পাতা দিয়ে রংবেরঙের পাখা তৈরী ও বিপণনের মাধ্যমে বাড়তি  উপার্জনের কাজে মূলত: মহিলারা নিয়োজিত থাকে।


তালের ফুল ও কচি ফল থেকে সংগৃহীত রস অন্যতম সুস্বাদু মূল্যবান পানীয় হিসাবে ব্যবহার অতি জনপ্রিয়। তালের রস থেকে গুড় তৈরী করা হয়। এ গুড়ের বাজার মূল্য তুলনায় অনেক বেশি। তালের রস বেশি সময় রাখা হলে তা দ্রুত “ফারমেনটেড” হয় এবং তা পান করলে মাদকের বিকল্প স্বাদ বা নেশা করার দৃষ্টান্ত অহরহ দেখা যায়। পুরুষ-স্ত্রী উভয় প্রকার গাছ থেকেই তালের রস পাওয়া যায়। মৌসুমে একটা তাল গাছ থেকে দৈনিক ১০-১৫ লিটার রস পাওয়া যায়।


কচি তালের ভিতরের আহার্য্য অংশ অতি সুস্বাদু ও জনপ্রিয়। কচি ফলের বাজার মূল্যও অনেক বেশি। এপ্রিল-মে মাসের গরমে তৃষ্ণা নিবারণে ও বিচিত্র স্বাদ আহরণে কচি তালের কদর বেশি। কচি তাল সংগ্রহ ও তা বিপণন কাজে হাজার হাজার মানুষ মৌসুমে নিয়োজিত হয়ে থাকে। পাকা তালের ঘন রস বিভিন্ন উপাদেয় সুস্বাদু খাবার তৈরীর কাজে ব্যবহার হয়। তালের রস দিয়ে তৈরী হরেক রকমের পিঠা, পায়েশ, হালুয়ার স্বাদই আলাদা। তালের আঁটিকে ছাই মিশ্রিত মাটির নিচে ৫-৭ সপ্তাহ সংরক্ষণ করা হলে তা থেকে লম্বা মোটা শিকড় গজায়। এ অবস্থায় আঁটির ভিতরে নরম শাঁস তৈরী হয়। শিশু, কিশোর ও বয়স্ক সবার নিকট এ সুস্বাদু আঁশ  অতি আকর্ষণীয়।


জলবায়ুঃ প্রাচীনতম এ ফল ট্রপিক্যাল ও সাব ট্রপিক্যাল আবহাওয়ায় ভাল জন্মে। মধ্য আফ্রিকার দেশগুলোতে বিশেষ করে সেনেগ্যাল ও ক্যামেরুনে এ ফলের অস্তিত্ব অনেক আগে থেকেই দেখা যায়। ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন এলাকায় এ ফলের কম-বেশি চাষ প্রচলন আছে। বাংলাদেশের সব জেলাতেই তালের চাষ হয়। তবে বৃহত্তর ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, নোয়াখালী, কুমিল্লা ও রাজশাহী জেলায় এ ফলের চাষ তুলনায় অনেক বেশি। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুপ প্রভাবে বাংলাদেশে অসময়ে প্রচুর বৃষ্টি ও বর্জ্যপাতের প্রতিকূল প্রভাব অহরহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কয়েক বছর ধরে বর্জ্যপাতের আধিক্য অনেক বেড়ে গেছে। চলতি বছরে (২০১৬-১৭)  বর্জ্যপাতের কারণে অনেক মানুষ ও অন্যান্য প্রাণিকূলের অকাল মৃত্যু ঘটেছে। বিশেষ করে হাওড় এলাকায় তালসহ অন্য বয়স্ক বড় গাছের (বট, পেকুড়, তেঁতুল) অনুপস্থিতির কারণে তদাঞ্চলে বর্জ্যপাতে মৃত্যুর হার তুলনায় অনেক বেশি। এ অবস্থার উন্নয়নে সারাদেশে তাল গাছ সম্প্রসারণে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া সকলের কর্তব্য।


মাটিঃ  তাল সব ধরণের মাটিতে চাষ সুবিধা আছে। প্রতিকূল পরিবেশে কিছুটা অনুর্বর মাটিতেও তাল চাষ করা যায়। অন্য  গাছের তুলনায় জলাবদ্ধতা ও লবনাক্ত সহিষ্ণুগুণ এ ফলের বেশি।


জাতঃ দেশ-বিদেশে তালের কোন সুনির্দিষ্ট জাত কম দেখা যায়। তাল ফলের আকার, রং ও ফল ধরার অবস্থা বিবেচনায় স্থানীয় ভাবে জাতের বিভিন্ন নামকরণ হয়ে থাকে। পাকা তালের রং হালকা বাদামী, গাঢ় হলুদ এবং কাল হতে পারে। এছাড়া কিছু বারোমাসি জাতের তাল গাছ দেখা যায়। যেহেতু খেজুর, লটকনের মত তাল গাছের পুরুষ ও স্ত্রী গাছ আলাদা ভাবে জন্মে। এ জন্য টিস্যুকালচার বা অনুরূপ ব্যবস্থায় বংশ বিস্তার ব্যবস্থা ছাড়া বীজ থেকে প্রাপ্ত চারায়  জাতের বৈশিষ্টতা বজায় রাখা সম্ভব হয়না।


বংশবিস্তারঃ  তালের বীজ থেকে চারা তৈরী করে অথবা সরাসরি বীজ মাটিতে বপন করে তালের বংশবিস্তার করা হয়। অন্য ফলের মত বাগান আকারে তালের চাষ প্রচলন এদেশে নেই। আগষ্ট-অক্টোবর মাসে পাকা তাল প্রাপ্তির ভরা মৌসুম। পাকা তাল বা বীজ কোন ভাবে জমিতে, রাস্তা, পুকুর বা দিঘির পাড়ে পড়ে থাকলে তা থেকেই নতুন গাছের সৃষ্টি হয়। যেহেতু বীজ গজিয়ে চারা  তৈরী করে তা থেকে ফল পেতে ১০-১২ বছর সময় লেগে যায়, এ জন্য অন্য ফলের ন্যায় বড়তবাড়ীতে বা বাগান আকারে তাল গাছ রোপনে কারো আগ্রহ দেখা যায়না। তবে রাস্তা, বাঁধের ধার, চিংড়ির ঘের, রেল লাইনের পার্শ্বে ও অন্য কমিউনিটি স্থানে বৃক্ষ রোপণে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ কিছু প্রতিষ্ঠান প্রতি বছর  তালের আাঁটি এবং সীমিত আকারে তালের চারা রোপণের মাধ্যমে এ ফল সম্প্রসারণে অবদান রেখে থাকে।


চারা তৈরীঃ  চারা তৈরীর জন্য প্রথমে ভাল উন্নত মানের বেশি ফলদানে সক্ষম এমন মাতৃগাছ নির্বাচন করে তা থেকে বীজ সংগ্রহ করা উচিত। পাকা ফল সংগ্রহের দু সপ্তাহের মধ্যে রোপণ করা উচিত। অন্যথায় বীজ শুকিয়ে গেলে তা থেকে চারা জগায় না।  অসময়ে তাল প্রাপ্তির প্রয়োজনে বারোমাসি জাতের গাছ থেকে তাল বীজ সংগ্রহ করা উত্তম। আগষ্ট মাস হতে অক্টোবর মাস পর্যন্ত তাল পাকে। এ সময় তাল বীজ বেশি সংগ্রহ সুবিধা রয়েছে। তবে বারোমাসি জাতের তালের বীজ এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে সংগ্রহ করে সরাসরি বীজ রোপণ অথবা জুলাই-আগষ্ট মাসের মধ্যে তৈরী  চারা রোপণ করা বেশি উপযোগী। বিশেষ করে হাওড় অঞ্চলে চারা রোপণের ক্ষেত্রে আগাম চারা তৈরী করে নিয়ে হাওড়ের কিনারের অপেক্ষাকৃত উঁচু জমি  থেকে পানি নেমে গেলে সে সব স্থানে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে চারা রোপণ কাজ সমাধা করা উত্তম ।


প্রায় ১র্০ ফুট লম্বা এবং র্৩ ফুট চওড়া বীজ তলায় প্রায় এক হাজার তালের আঁটি বা বীজ বসানো যায়। বীজ থেকে চারা গজানোর সময় শিকড় দ্রুত মাটির নিচে প্রবেশ করে এবং তা উঠিয়ে পলি ব্যাগে সংরক্ষণ করা কষ্টকর হয়। এ অবস্থায় মাটি থেকে চারা উঠালে অধিকাংশ চারা মারা যেতে পারে। এ জন্য বীজ তলার নিচের অংশে পাতলা টিনের সীট বা পুরু পলিথিন বিছিয়ে অথবা তলার এ অংশ র্২র্ -র্৩র্  পুরু করে সিমেন্ট বালি খোয়া দিয়ে ঢালাই করে নিয়ে তা তালের চারা তৈরীর কাজে ব্যবহার করা ভাল, তাতে শিকড় মাটির ভিতরে প্রবেশ বাধাগ্রস্থ হয়। এতে গজানো আঁটি সহজেই উঠিয়ে পলি ব্যাগে সংরক্ষণ উপযোগী হয়। বীজতলা তৈরী কালে নীচের অংশ কম্পোষ্ট/পঁচা গোবর ও ছাই মিশ্রিত বেলে-দো-আঁশ মাটি দিয়ে  র্৩র্  পরিমাণ ভরাট করে তাতে সারি করে বীজ বসাতে হয়। বীজগুলো বসানো হলে মোটা বালু  ও মাটির মিশ্রণ দিয়ে প্রায় র্১র্  (২-৩ সেমি) পুরু করে বসানো বীজের উপরিভাগ ঢেকে দিতে হয়। বীজ তলার মাটিতে নিয়মিত হালকা পানি সেচ দিয়ে ভেজাতে হয়। বীজ বপনের ৩-৪ সপ্তাহের মধ্যে বীজ অঙ্কুরিত হওয়া শুরু হবে। গজানো বীজ থেকে মোটা শিকড়ের মত নরম, আগা কিছুটা সুচালো এক প্রকার টিউব তৈরী হয়। এ টিউবের মধ্যে শিকড় ও সুপ্ত পাতা একই সঙ্গে বড় হয়ে ৮-১০ সপ্তাহের মধ্যে গজানো পাতা প্রায় র্৭র্ -১র্৫র্  লম্বা হয়। পাতা বের হওয়া শুরু হলে টিউবের আবরণ শুকিয়ে বা পঁচে ভিতরের পাতা ও শিকড় আলাদা ভাবে বড় হওয়া শুরু করে। এ সময় চারাগুলো আঁটিসহ উঠিয়ে পুরু শক্ত ১র্০র্ দ্ধ১র্০র্  মাপের পলি ব্যাগে অথবা পরিত্যক্ত সিমেন্টের বস্তা দিয়ে তৈরী ব্যাগে ভাল মানের পটিং মিডিয়া (বেলে দো-আাঁশ মাটি ৫০%, জৈব পদার্থ ৪০% এবং ১০% কেকোডাষ্ট/করাত কলের গুড়া) ব্যবহার করে তা সংরক্ষণ ব্যবস্থা নেয়া হয়। অনেক সময় তৈরী নতুন চারার শিকড় বেশি বড় হয়, এ ক্ষেত্রে ব্যাগিং করার সময় কাজের সুবিধার্থে গাজানো শিকড় র্৪র্ -র্৬র্  রেখে অবশিষ্ট অংশ সিকেচার বা ধারালো চাকু দিয়ে কেটে ফেলা উত্তম হবে। চারা ব্যাগিং করার প্রথম ২-৩ সপ্তাহ হালকা ছায়া দেয়ার ব্যবস্থা করা ভাল। বেশি দিন সংরক্ষণের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত কিছু বড় মাপের পলি ব্যাগে অথবা সিমেন্টের ছালার তৈরী ব্যাগ ব্যবহার করার প্রয়োজন হয়। শুকনা মৌসুমে ২-৩ দিনের ব্যবধানে নিয়মিত পানি সেচ দিয়ে চারার জন্য প্রয়োজনীয় রসের অভাব দূর করতে হয়।


বীজ/চারা রোপণঃ  রাস্তা, বাঁধ ও রেল লাইনের ধারে, চিংড়ির ঘেরে, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, গোরস্থান ,শ্মশান, ঈদগাহ ইত্যাদি বিভিন্ন ধরণের ‘কমিউনিটি’ প্লেসে তাল ফল সম্প্রসারণ সুবিধা এ দেশে বেশী। চারা তৈরী, সংরক্ষণ, পরিবহন ও তা রোপণ কাজ অনেক ঝামেলা/ কষ্টকর ও ব্যয় বহুল। এ জন্য বেশি পরিমাণে তাল সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে সরাসরি জমিতে বীজ রোপণ করা  সহজতর।  এ জন্য তাল বীজ রোপণের জন্য শুরুতেই  স্থান নির্বাচন করে নেয়া ভাল। এসব ক্ষেত্রে রাস্তার সংলগ্ন স্থানের বেশ কিছু অংশ ছেড়ে ঢালু অংশের শেষ ভাগে তালের বীজ বপন করা উচিত হবে। কেননা পরবর্তীতে রাস্তা সংস্কার ও চওড়া করার ফলে আগে রোপিত বড় বড় গাছকে কেটে ফেলতে হয়, তবে রাস্তা ছেড়ে কিছু নীচে বীজ/চারা লাগানো হলে তা রোধ করা সম্ভব। বিদ্যুৎ লাইনের অবস্থান বিবেচনায় এনে তাল বীজ/চারা রোপণ ব্যবস্থা নিতে হয়।


দু’এক সারি  তাল বীজ/চারা রোপণের জন্য ১র্০-১র্২ ফুট দূরত্ব দিলেই চলে। প্রতিটা গাছের দূরত্ব নির্ধারণ করে নিয়ে র্২দ্ধর্২দ্ধর্২ ফুট মাপের গর্ত তৈরী করে সার মাটি দিয়ে পুনরায় তা ভরাট করে বীজ/চারা রোপণ করা উচিত হবে। রোপণের আগে প্রতিটা গর্তে ১০-১৫ কেজি গোবর এবং ২৫০ গ্রাম করে টিএসপি ও পটাশ  সার মিলে মোট ৫০০ গ্রাম গর্তের মাটির সাথে ভাল ভাবে মেশানো প্রয়োজন। গোবর সার প্রাপ্তি সুবিধা না থাকলে নিকটস্থ জমির উপরিভাগের (ঞড়ঢ় ংড়রষ) উর্বর মাটি দিয়ে গর্ত ভরাট করলেও রোপিত বীজ/চারা বাড়তে সহায়ক হবে।


সার প্রয়োগঃ  তাল গাছে সার প্রয়োগ করার প্রচলন এদেশে নেই। তবে রোপিত গাছে প্রথম বছর পঁচা গোবর-১০ কেজি, ইউরিয়া-৩০০ গ্রাম, টিএসপি-২৫০ গ্রাম এবং এমওপি-২০০ গ্রাম হারে সার প্রয়োগ করা হলে গাছ ভালভাবে বাড়বে, ফলন বেশি দিবে। এ সারের অর্ধেক পরিমাণ বর্ষার আগে এবং বাকি অর্ধেক সার বর্ষা শেষে বছরে দুবার প্রয়োগ করা প্রয়োজন। তাল গাছের বয়স বাড়ার সাথে সাথে প্রতি বছর ১০% হারে সারের পরিমাণ বাড়াতে হবে এবং  এ প্রবৃদ্ধি ৭-৮ বছর পর্যন্ত অব্যাহত রাখতে হবে। এরপর প্রতিটা বয়স্ক গাছের জন্য পঁচা গোবর -২০ কেজি, ইউরিয়া -১ কেজি, টিএসপি-৯০০ গ্রাম এবং এমওপি-৮০০ গ্রাম হারে প্রয়োগ করার প্রয়োজন হবে।


পরিচর্যাঃ  তাল বীজ/চারা রোপণের পর খুব একটা যতœ নেয়া হয়না। তবে দু’এক মাসের ব্যবধানে গাছের গোড়া আগাছা মুক্ত রাখার প্রয়োজন হয়। খরা মৌসুমে গাছের গোড়ায় ১.র্৫-র্২ দূর পর্যন্ত স্থানের মাটি আগলা করে দিয়ে কচুরী পানা/খড়কুটা অথবা স্থানীয়ভাবে সহজ লভ্য অনুরূপ দ্রবাদি দিয়ে ঢেকে মালচিং ব্যবস্থা নেয়া ভালো। পরবর্তীতে এ মালচিং দ্রবাদি পঁচে জৈব সার হিসাবে গাছের উপকারে আসবে। তাতে মাটিতে রস সংরক্ষিত থাকবে, আগাছা সহজেই দমন হবে। খরা মৌসুমে পানি সেচ এবং বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নেয়া ভাল।


ট্রেনিং-প্রুনিংঃ নারিকেল, সুপারি, বোটল পাম এ সব গাছের বয়স্ক পাতা হলুদ হয়ে নিজে থেকেই ঝরে পড়ে। তবে একই পরিবারভুক্ত হলেও তাল-খেজুর গাছের বয়স্ক পাতা প্রাকৃতিক ভাবে ঝরে পড়েনা।  এ জন্য নিচের দিকে ঝুলে থাকা বয়স্ক পাতাগুলো কান্ড বরাবর ধারালো দা দিয়ে সময়মত ছেঁটে ফেলা জরুরী। এছাড়াও ফলন্ত গাছের ফলের কাঁদির ও পুরুষ গাছের ফুলের বয়স্ক ছড়া ছেঁটে পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন।


পোকামাকড়  ও রোগবালাইঃ  অন্য ফল গাছের তুলনায় তাল গাছে পোকা-মাকড়ের উপদ্রব কম। এছাড়া অতি লম্বা গাছের আগায় পাতা, ফুল ও ফলে ছত্রাক/কীটনাশক ব্যবহার করা ততটা সহজ নয়। তথাপি রোগ বালাই  ও পোকা-মাকড়ের উপদ্রব দেখা দিলে তা সময়মত দমন করা উচিত।


ফল সংগ্রহঃ  বীজ/চারা রোপণের ১০-১২ বছর পর থেকে গাছে ফুল ফল ধরা আরম্ভ করে। জানুয়ারী মাস হতে শুরু করে মার্চ মাস পর্যন্ত তাল গাছে ফুল ফুটে। তবে বারোমাসি জাতের তাল গাছে সারাবছরই কম-বেশি ফুল ফল ধরে। আগষ্ট মাস হতে অক্টোবর মাস পর্যন্ত  পাকা তালের ভরা মৌসুম। মে-জুন মাস কচি তাল প্রাপ্তির উপযোগী সময়। প্রতিটা গাছে ২০০-৩০০ টা কাঁচা পাকা তাল ধরে। সুস্থ সবল গাছে ১০-১৫ টা তালের কাদি/ছড়া থাকে। তাল পাকা শুরু হলে ৩-৫ সপ্তাহ পর্যন্ত ক্রামন্বয়ে  পাকা ফল পাওয়া যায়। ফল পাকলে মাটিতে ঝরে পড়ে। অনেকে পুষ্ট ফল পেড়ে ২-৫ দিন ঘরে রেখে পাকিয়ে নিয়ে বাজারজাত করে। কিছু চাষী  দড়ি বা লাইলনের  দড়ি দিয়ে জাল  তৈরী করে তা গাছের নীচের কান্ড ও পাতার ডগায় বেধে রাখে। পাকা ফল ঝরে এ জালে জমা হয়। তাতে পরে গাছে উঠে জমায়িত ফল সংগ্রহ করা হয়। এ ব্যবস্থায় তাল ফল পড়ে আঘাতপ্রাপ্ত বা গলে যাওয়া রোধ হয়। এ ব্যবস্থায় ফল সংগ্রহ করা হলে  বাজার মূল্য বেশি পাওয়া যায়। একেকটা কচি তালের মূল্য প্রায় ২০ টাকা। তবে পাকা তাল ফলের আকার অনুযায়ী ৬০-১০০/- টাকা দরে বিক্রি হয়। সে হিসাবে একটা গাছ থেকে ৫-৭ হাজার টাকার কচি তাল অথবা ৮-১০ হাজার টাকার পাকা তাল থেকে আয় হয়। একেকটা পুরুষ/স্ত্রী তাল গাছ থেকে প্রতিদিন ১০-১৫ লিটার রস পাওয়া যায়। মার্চ মাস হতে জুন মাস পর্যন্ত তালের রস সংগ্রহ করা যায়। মৌসুমে একেকটা তাল গাছ থেকে প্রায় ৭০০-১৫০০ লিটার রস সংগ্রহ করা যায়। প্রতি লিটার রসের বাজার মূল্য প্রায় ২০-৩০/- টাকা। সে অনুযায়ী একটা পুরুষ গাছ থেকে ১০-১২ হাজার টাকার রস বিক্রি করা যায়। একটা তাল গাছের রস থেকে প্রায় ৫০-৭০ কেজি  গুড় পাওয়া যায়।


সব দিক বিবেচনায় তাল গাছ মানব জীবনে অতি উপকারী বৃক্ষ। এ গাছের বহুল সম্প্রসারণ ও নিধন বন্ধ করে একে রক্ষা করা আমাদের সবারই একান্ত কর্তব্য।

--------------------------------------


এম. এনামুল হক
মহাপরিচালক (অব) এবং, সদস্য, বিশেষজ্ঞ পুল (অচঅ), কৃষি মন্ত্রণালয়।

শেয়ার করুন

Print Friendly and PDF


মতামত দিন

Developed By -  IT Lab Solutions Ltd. Helpline - +88 018 4248 5222