সর্বশেষ

  জগন্নাথপুরে শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দিল সোনার বাংলা সমাজ কল্যাণ সংস্থা   আশারআলো ফাউন্ডশনের শিক্ষা উপকরণ বিতরণ   জুড়ীতে আদালতের নির্দেশে মৃত্যুর ১৮দিন পর ধনমিয়ার লাশ উত্তোলন   ক্যাসিনো থেকে মাসে ১০ লাখ টাকা নিতেন মেনন   ভারতের সঙ্গে চুক্তি বাতিল, আবরার সহ সকল হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে প্রগতিশীল সংগঠনসমূহের বিক্ষোভ সমাবে   বিয়ানীবাজারে নিসচা'র সড়ক দূর্ঘটনা রোধে করণীয় শীর্ষক মতবিনিময় সভা ও অভিষেক অনুষ্ঠিত   ৫ দফা দাবীতে বিয়ানীবাজারে ফারিয়া'র মানববন্ধন   লক্ষীপুরে ছাত্রলীগে পদ পেতে লিখিত পরীক্ষা, ডোপ টেস্ট   ভারী অস্ত্রসহ ভাইরাল ছাত্রলীগ কর্মী   ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আহত ৫০, আটক ৩   কুষ্টিয়ায় চাঁদাবাজি মামলায় ছাত্রলীগ আহ্বায়ক গ্রেফতার   বালিশকাণ্ডের দায় মন্ত্রণালয়ও এড়াতে পারে না: আইইবি সভাপতি   ঢাবির ‘ক’ ও ‘চ’ ইউনিটের ফল রোববার   শ্রীমঙ্গলে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে চার ভুয়া সাংবাদিক আটক   মানসিকভাবে দুর্বল তরুণরাই জঙ্গিবাদে ঝুঁকছে : মনিরুল

কৃষি

গ্রামে গ্রামে কৃষকের পদযাত্রা

প্রকাশিত : ২০১৯-০৯-১৪ ১৭:৫৫:৩৮

রিপোর্ট : দিবালোক ডেস্ক


গ্রামে গ্রামে কৃষকের পদযাত্রা। কেন এই পদযাত্রা? এর উত্তর খোঁজার আগে দেখতে হবে–কী হচ্ছে গ্রামাঞ্চলে? নাগরিক চোখ দিয়ে ঢাউস দালানের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সচিবালয় কিংবা সেমিনার কক্ষে বসে কিংবা ল্যাপটপের ইঁদুর দিয়ে গুগোলের জগতে গ্রামকে খুঁজে ধারণাপত্র, গবেষণাপত্র, প্রোজেক্ট প্রোফাইল, খানাজরিপ, পরিসংখ্যান দিয়ে কী হচ্ছে গ্রামাঞ্চলে–এর উত্তর পাওয়া যাবে না। 

‘আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা– যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।’ ‘মানুষের উপর মানুষের শোষণ হইতে মুক্ত ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজ লাভ নিশ্চিত করিবার উদ্দেশ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হইবে।’ ‘রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে মেহনতি মানুষকে– কৃষক ও শ্রমিককে এবং জনগণের অনগ্রসর অংশসমূহকে সকল প্রকার শোষণ হইতে মুক্তি দান করা।’ মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে মুক্ত-স্বাধীন দেশকে অগ্রসর করে নেয়ার জন্য এই মূলনীতিসমূহ বাস্তবায়নের অঙ্গিকার নিয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিলেও প্রকৃতপক্ষে দেশ পরিচালিত হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীত ধারায়। 

গ্রামাঞ্চলের যে কোনো শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবনযাপনে বিরাজ করছে এক চরম হতাশা-ক্ষোভ-অনিশ্চয়তা-নিরাপত্তাহীনতা। গ্রামীণ অর্থনৈতিক অবকাঠামো মূলত কৃষি নির্ভর। কৃষি অর্থনীতির দেয়ালগুলো আজ ভেঙে দেয়া হচ্ছে। কৃষি বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী, জনপ্রতিনিধিসহ তাদের পৃষ্ঠপোষক সিন্ডিকেট। প্রতি বছর ধান, আলু, পাটসহ প্রধান ফসলের লাভজনক দাম না পেয়ে কৃষক চরমভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। কৃষকের ফসলের লাভের টাকা ছিনিয়ে নেয় এই সিন্ডিকেট। বারবার লোকসান গুণে কৃষক আর কৃষির দিকে ফিরে তাকাতে চাচ্ছে না।

একদিকে ফসল উৎপাদন করে নিঃস্ব, অন্যদিকে কৃষি জমি রক্ষা করার মরিয়া চেষ্টা। সরকারের তথাকথিত উন্নয়ন, বিলাসী কর্মকাণ্ড, নগরায়ণের বিস্তারকরণের ফলে কৃষি জমি সরকারি বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প, শিল্প-কারখানা-আবাসন ব্যবসায়ীরা দখল করে নিচ্ছে। পরিবেশ-প্রকৃতি-নদীনালা ধ্বংস হচ্ছে, দখল হচ্ছে। ক্ষুদ্র কৃষক ১০/২০ হাজার টাকার কৃষি ঋণ শোধ করতে না পারায় সার্টিফিকেট মামলায় পালিয়ে বেড়াচ্ছে। মাত্র ৫০০ কোটি টাকার জন্য সারাদেশে ১ লক্ষ ৬৮ হাজার কৃষক এই সার্টিফিকেট মামলায় হয়রানি হচ্ছে। ১২ হাজার কৃষক গ্রেফতারী পরোয়ানা নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। অথচ এস আলম গ্রুপকে ৩১৭৫ কোটি টাকা মওকুফ করে দিচ্ছে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ নিয়ে লোপাট করে দিচ্ছে কতিপয় ব্যবসায়ী। সরকার তাদের মাফ করে দিচ্ছে। বিএডিসি-কে নিষ্ক্রিয় করে বহুজাতিক কোম্পানিকে সার-বীজ-কীটনাশকের বাজার দিয়ে দিয়েছে। কৃষক ফসল উৎপাদন করতে গিয়ে এই কোম্পানিগুলোর কৃষি উপকরণের মূল্য নির্ধারণের কাছে জিম্মি। সরকার ধানের মূল্য নির্ধারণ করে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার নীতিমালা গ্রহণ করলেও স্থানীয়ভাবে কৃষকের কাছ থেকে ধান না কিনে সরকার দলীয় চেলা-চামুণ্ডা আর ফড়িয়াদের কাছ থেকে ধান কিনছে। ফলে কৃষক প্রায় ৯০০ টাকায় এক মণ ধান উৎপাদন করলেও ৫০০/৬০০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। 

এখন পাটের মৌসুম। পাটের উৎপাদনও এ বছর ভালো। কিন্তু পাটের বাজারও নিয়ন্ত্রণ করছে সিন্ডিকেট। কৃষক পাটের দাম পাচ্ছে না। সরকারের ‘অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য ক্রয় নীতিমালা, কৃষি নীতি, পাট নীতিসহ নানাবিধ নীতিমালায় আদর্শবাদী বয়ানে থাকলেও তা বাস্তবায়নে মূলত চলে লুটপাটের মহোৎসব। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর এই অসহায়ত্বের সুযোগে এক শ্রেণির এনজিও ‘সাস্টেইনেবল লাইভ’– এর নামে গরিব মানুষের লাইভ আখের কলের মতো চিপে রস বের করে দিচ্ছে। গ্রামের শিক্ষা-স্বাস্থ্য ব্যবস্থাও নিয়ন্ত্রণ করছে মূলত শিক্ষা-স্বাস্থ্যের প্রাইভেট বেপারিরা। বিচার-আচার, ঝগড়া-ফ্যাসাদে শকুনের মতো হাজির হয় নানান রংয়ের লীগ, মেম্বার, চেয়ারম্যানরা। বাদীর থেকেও খায়, বিবাদীর থেকেও খায়। আর বিচারের আশায় থানা পর্যন্ত গেলেতো প্রাণ বাঁচানো দায়। ভূমি অফিসের অনিয়ম-হয়রানি-দুর্নীতির বিশাল রমরমা বাণিজ্যে ভূমি বিষয়ক মামলাও পাহাড়সম। এভাবে গ্রামীণ কৃষি নির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামো দ্রুত গতিতে ভেঙে দেয়া হচ্ছে।

কী হচ্ছে গ্রামাঞ্চলে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে একজন বোকা-সোজা, সরল প্রাণ, কাদামাটির প্রান্তিক কৃষকের কাছে গিয়ে প্রশ্ন করুন। উত্তর পেয়ে যাবেন।

গ্রামে গ্রামে কৃষকের পদযাত্রা। এই পদযাত্রা কেবল পায়ে হেঁটে গ্রাম দর্শন নয়। গ্রামের মানুষকে জাগরণের যাত্রা। কিন্তু কেন এই জাগরণের যাত্রা? মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত মূলনীতি– ‘রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে মেহনতি মানুষকে-কৃষক ও শ্রমিককে এবং জনগণের অনগ্রসর অংশসমূহকে সকল প্রকার শোষণ হইতে মুক্তি দান করা।’ কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দেশ পরিচালিত হচ্ছে এর বিপরীত ধারায়। তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূল চেতনা রক্ষা করা ও তা বাস্তবায়নের জন্য সকল শ্রেণি-পেশার বিশেষভাবে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত হতে হবে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে তাঁর অধিকার আদায়ের জন্য সংগঠিত হয়ে লড়াই-সংগ্রাম করতে হবে।

গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতি নির্মাণের মূল নির্মাতা- কৃষকদের সংগঠিত করে লড়াই-সংগ্রামের মাধ্যমে এদেশের কৃষকের অধিকার আদায় ও দাবিসমূহ আদায়ের লক্ষ্যে বাংলাদেশ কৃষক সমিতি দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম করছে। এই আন্দোলন কর্মসূচির অংশ হিসেবেই গ্রামে গ্রামে কৃষকদের সংগঠিত করে আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে কৃষকদের পদযাত্রা। পুরো সেপ্টেম্বর মাস জুড়ে কৃষক সমিতির এই পদযাত্রা সফল করতে স্থানীয় দাবিগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে পোস্টার, লিফলেট, প্রচারপত্র ছাপানোর উদ্যোগ নিতে হবে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের কমিটিগুলোকে।

এই পদযাত্রা কর্মসূচির বিশেষত্ব হচ্ছে– প্রচারপত্র, দু’একটি প্ল্যাকার্ড, ছোট একটি ব্যানারসহ গ্রামের সরু পথ, আলপথ দিয়ে হেঁটে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে গণসংযোগ করা। রাস্তার মোড়ে, চায়ের স্টলে, বাজারে, হাটে গণসংযোগ করে কৃষকদের অধিকার সচেতন করে কৃষক সমিতির সংগঠনে অন্তর্ভুক্ত করে আন্দোলনের শক্তি অর্জন করা। তবে প্রাধান্য দিতে হবে আন্দোলনকে। আন্দোলন করতে করতেই জনগণকে সংগঠিত করতে হবে। আবার সংগঠিত শক্তিকে আন্দোলনে নামাতে হবে। তবে এই আন্দোলন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে পরিচালনা করতে হবে। অর্থাৎ ইস্যুভিত্তিক দাবিগুলো আদায় না হওয়া পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন করে যেতে হবে।

এর জন্য গ্রামে গ্রামে কৃষকদের সংগঠিত করে গ্রাম কমিটি গঠন করতে হবে। গ্রাম কমিটিগুলোর অন্তত প্রতিমাসে নিয়মিত বৈঠক করে কৃষকের নানাবিধ সমস্যা নিয়ে আলাপ-আলোচনা, দাবিসমূহ সুনির্দিষ্ট করে পরিকল্পনা গ্রহণ করা। অগ্রসর সকল কৃষককে অবশ্যই কেন্দ্র নির্ধারিত সদস্য ফরম পূরণ করা এবং তা সংরক্ষণ করার কাজটি নিয়মিত করতে হবে। গ্রামে গ্রামে পদযাত্রা করে স্থানীয় ইস্যুতে আন্দোলন করে ইউনিয়ন ও উপজেলায় পদযাত্রার মাধ্যমে বিক্ষোভ সমাবেশ, ডেপুটেশন, স্মারকলিপি পেশ কর্মসূচি পালন করতে হবে। কয়েকজন গিয়ে ইউএনও কিংবা ডিসি’র কাছে স্মারকলিপি দেয়ার কর্মসূচি পরিহার করে মিছিলসহ কৃষক জমায়েত নিয়ে কর্মসূচি পালন করার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

সংগঠন করার ক্ষেত্রে কৃষক সমিতির দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলনে গৃহীত ‘ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্র’ অনুসরণ করা উচিত।
গ্রামে গ্রামে কৃষকের পদযাত্রা। এই পদযাত্রা হবে কৃষকের জাগরণ যাত্রা। কৃষকের সংগঠন, আন্দোলনই এই জাগরণ সৃষ্টি করতে পারে। এই জাগরণের মধ্য দিয়েই রচিত হবে গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতি নির্মাণের দেয়াল।

শেয়ার করুন

Print Friendly and PDF


মতামত দিন

Developed By -  IT Lab Solutions Ltd. Helpline - +88 018 4248 5222