সর্বশেষ

  প্রাণীর চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে বিলুপ্ত হচ্ছে উদ্ভিদ প্রজাতি   ডেনমার্কের কমবয়সী প্রধানমন্ত্রী হবেন বামদলের মিটি ফ্রেডরিকসেন   কৃষকের দুর্গতির আসল কারণ হলো দেশে ‘পুঁজিবাদী ব্যবস্থা’   দিনে ছাপবে ২৫ হাজার ই-পাসপোর্ট, ছাপা হবে এমআরপিও   সরকারবিরোধী স্লোগান দেয়ায় এই বালকের শিরোশ্ছেদ করবে সৌদি!   অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস   ৭৩ বছরে ৩ কোটি মানুষ হত্যা করেছে যুক্তরাষ্ট্র   মিলিয়ন বছরের ঘুমন্ত জীবের পুনরুত্থান!   আজ ঐতিহাসিক ৭ জুন- শহিদ মনু মিয়া দিবস   রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শায়িত হলেন মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মুছব্বির   রমজানের পরই তিন আলেমের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করবে সৌদি   ব্রয়লার মুরগি খেলে কাজ করবে না অ্যান্টিবায়োটিক!   গেম আসক্তিকে রোগ হিসেবে স্বীকৃতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার   বাসার গেট খোলা রেখে ঈদের নামাজে না যাওয়ার অনুরোধ   বড়লেখায় শাহবাজপুর ব্লাড ডোনেট ক্লাব’র উদ্যোগে খাদ্য সামগ্রি বিতরণ

সম্পাদকীয়

ব্যবস্থার বদল কেন প্রয়োজন

প্রকাশিত : ২০১৮-১২-১০ ১৪:০৪:৫৯

রিপোর্ট : মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম



জাতীয় নির্বাচন আসন্ন। মানুষের মুখে মুখে এখনো যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে সেগুলো হলো_ দলবদল, জোটবদল, মেরুকরণ, পরস্পরের প্রতি কাদা ছোড়াছুড়ি ইত্যাদি ধরনের নানা ঘটনা। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তথা ‘নৌকা’ ও ‘ধানের শীষ’কে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠা পাওয়া তথাকথিত মূলধারার দুটি জোট, ‘ভোটের আগেই জয়ী হওয়ার’ ব্যবস্থা করার জন্য নানা ফন্দি-ফিকিরের কসরত করে চলেছে। যেহেতু সরকার ও পার্লামেন্ট বহাল রেখেই নির্বাচন হচ্ছে তাই এই মল্লযুদ্ধে সরকারি দল নানাদিক থেকে অন্যায্য সুবিধা হাত করে নিচ্ছে। ফলে নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে। এসব নীতিহীন দলবাজি ও ধান্দাবাজির ঘটনা মানুষের মনে নানারকম জল্পনা-কল্পনা মিশ্রিত বিরক্তি ও ক্ষোভের জন্ম দিয়ে চলেছে।

কিন্তু অনেক আগে থেকেই নির্বাচনকে উপলক্ষ করে যা আলোচনার প্রধান বিষয় হওয়া উচিত ছিল তা হলো, দেশ আগামীতে কোন নীতি-আদর্শ অনুসরণ করে চলবে, সে বিষয়টি। কিন্তু সেই মৌলিক ও একান্তভাবে প্রয়োজনীয় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক এখনো শুরুই হয়নি। একমাত্র সিপিবি তার নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করে এসব প্রসঙ্গ সামনে এনেছে। বড় জোটগুলোর ইশতেহার এখনো প্রকাশই হয়নি। এদিকে হাতে আছে মাত্র গুটিকয়েক দিন। ফলে এই মূল বিষয় নিয়ে আলোচনা, বিতর্ক ও জনগণের মতামত গ্রহণের কাজটি উপেক্ষিতই থাকবে। আগামীতে তাই দেশ চলবে ‘বিজয়ী দলের’ অথবা আরও সত্য করে বললে, বিজয়ী দলের রাজাধিরাজ তথা তার ‘সুপ্রিমোর’ স্বেচ্ছাচার অনুযায়ী।

এমনটি যে হবে সেটি খুবই স্বাভাবিক। কেননা ‘নৌকা’ বা ‘ধানের শীষ’- এই দুটি জোটের পক্ষ থেকে নীতি-আদর্শের বিষয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। এ বিষয়ে দুটি জোটেরই একই কথা। তা হলো, more of the same অর্থাৎ ‘যা চলছে তাই আরও বেশি করে চলবে।’
দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল এখন ‘নৌকা’ ও ‘ধানের শীষ’ এই দুটি জোটের more of the same নীতির পক্ষপুটে ঢুকে গেছে। এর বাইরে উল্লেখ করার মতো একটি মাত্র শক্তিই মেরুদ- শক্ত করে স্বাধীন অবস্থান নিয়ে আছে। সেটি হলো সিপিবিসহ ‘বাম গণতান্ত্রিক জোট’। ‘নৌকা’ ও ‘ধানের শীষ’ জোট দুটি হলো more of the same অব্যাহত রাখার পক্ষভুক্ত পরস্পরের ‘প্রতিযোগী’ দুটি গোষ্ঠীমাত্র। পক্ষান্তরে ‘বাম গণতান্ত্রিক জোট’ হলো তাদের more of the same নীতি ও কর্মপন্থা ‘বদলে দেওয়ার’ পক্ষের শক্তি। তথা এই উভয় জোটের ‘প্রতিপক্ষ’। এর মাঝেই নিহিত রয়েছে সিপিবিসহ ‘বাম গণতান্ত্রিক জোটের’ বর্তমান এই স্বাধীন ভূমিকার ঐতিহাসিক তাৎপর্য।

বর্তমানে আমাদের দেশ ‘অবাধ পুঁজিবাদ ও মুক্তবাজার অর্থনীতির’ নীতি-দর্শন ও ব্যবস্থার ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। পঁচাত্তরে খুনি মোশতাকের দ্বারা সূচিত এই ব্যবস্থার কাঠামোকে অবলম্বন করেই, তার পর থেকে আজ পর্যন্ত দেশ চালিয়েছে জিয়া, সাত্তার, এরশাদ, খালেদা, হাসিনা, ফখরুদ্দীন প্রমুখের নেতৃত্বাধীন পর্যায়ক্রমিক সরকারগুলো। গত ১০ বছরে একটানা মহাজোট সরকারের অধীনেও সেই একই আর্থ-সামাজিক নীতি-ব্যবস্থার ভিত্তিতে দেশ পরিচালিত হয়েছে।

পঁচাত্তর থেকে চলে আসা এই ‘ব্যবস্থা’র কাঠামোগত কতগুলো বৈশিষ্ট্য হলো- (ক) বাজারের শক্তির ওপর তথা চাহিদা ও সরবরাহ দ্বারা অবাধে নিয়ন্ত্রিত হতে দেওয়া পুঁজিবাদী বাজার ব্যবস্থার স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বয়ংক্রিয় ক্রিয়াকর্মের ওপর ভর করে চলা (খ) অর্থনৈতিক কর্মকা-ে সরাসরি অংশগ্রহণ ও ভূমিকা গ্রহণ থেকে সরকারের হাত গুটিয়ে আনা এবং তা থেকে বিরত থাকা (গ) অভ্যন্তরীণ বাজারকে বিদেশি পুঁজি ও পণ্য প্রবাহের জন্য অবারিত করে দেওয়া (ঘ) ঢালাও বিরাষ্ট্রীয়করণের (de-nationalisation) পদক্ষেপ গ্রহণ করা (ঙ) ব্যক্তিগত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উদারীকরণ (liberalisation) এবং বিনিয়ন্ত্রণ (de-regulation) করা (চ) ব্যক্তি মালিকানাধীন খাতের ওপর চূড়ান্ত নির্ভরতা (absolute dependence on private sector) (ছ) অর্থনৈতিক কর্মকা- তো বটেই, স্বাস্থ্য-শিক্ষাসহ বিভিন্ন সেবা ও সামাজিক কার্যক্রম থেকে রাষ্ট্রের ভূমিকা হ্রাস করে তা ব্যক্তিমালিকানাধীন খাতে স্থানান্তর করা ইত্যাদি।

এগুলো সবই হলো বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, ডব্লিউটিও এবং সাম্রাজ্যবাদী দেশ ও বহুজাতিক কোম্পানির সনাতন প্রেসক্রিপশন। মুক্তিযুদ্ধের পর মাত্র তিন-সাড়ে তিন বছর বাদ দিলে ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু করে ৬ দশক ধরে মোটা দাগে এই একই ‘সাম্রাজ্যবাদনির্ভর লুটেরা পুঁজিবাদী ধারার’ নানা উনিশ-বিশ সংস্করণ অনুসরণ করে দেশ পরিচালিত হয়েছে। জাতির সামনে আজ মুখ্য বিতর্ক ও বিবেচনা ও বিতর্কের বিষয় হলো, এই পথ কি অব্যাহত রাখা হবে? নাকি এ পথ ‘বদলে দিয়ে’ মুক্তিযুদ্ধের চার নীতির ভিত্তিতে প্রগতির পথ অনুসরণ করা হবে?

প্রসঙ্গটি বিচার-বিবেচনা করতে হলে, এই ‘নীতি-ব্যবস্থা’ অনুসরণ কি ফলাফল বয়ে এনেছে, প্রথমে সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। হিসাব করলে দেখা যাবে যে, এই পথ অনুসরণের ফলে বহুল বিজ্ঞপিত তথাকথিত ‘প্রবৃদ্ধি’ ও ‘উন্নয়ন’ সাধিত হলেও সেজন্য অর্থনীতি ও সমাজকে বিপুল মূল্য দিতে হয়েছে। এসবকে ‘উন্নয়নের অবশ্যম্ভাবী প্রসব বেদনা’ বলে অজুহাত দেওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু এ অজুহাত মেনে নেওয়া যায় না। কারণ এ ধরনের ‘প্রসববেদনা’ পরিহার করেও ‘উন্নয়নের’ প্রগতিশীল ও গণমুখী অন্য পথ আছে। সে পথেই মুক্তিযুদ্ধের পর দেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সেই পথে দেশকে ফিরিয়ে আনা জাতির সামনে আজ প্রধান কর্তব্য হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। তা করতে হলে বর্তমান নীতি-ব্যবস্থা বদলে দিতে হবে।

বর্তমান লুটেরা পুঁজিবাদী ব্যবস্থা অনুসরণের কারণে কী ধরনের নেতিবাচক ও চরম ক্ষতিকর ফলাফল সৃষ্টি হয়েছে সেটিও হিসাব করে দেখা প্রয়োজন। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে যেম সেসব চরম নেতিবাচক ফলাফলের মধ্যে যেগুলো প্রধান সেগুলো হলো_ (১) পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের অন্তর্নিহিত স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ত গতিশক্তি (dynamics) আমাদের দেশের প্রান্তস্থিত (peripheral) অবস্থানকে অব্যাহতভাবে আরও বর্ধিত পরিমাণে পুনরুৎপাদিত করে চলেছে। আন্তঃরাষ্ট্রীয় বৈষম্যের মানদ-ে আমাদের অধোগতি ও আপেক্ষিক পিছিয়ে থাকার সার্বিক সূচক প্রসারিত হয়ে চলেছে। (২) অভ্যন্তরীণ বাজারে বিদেশি পুঁজি ও পণ্যের অবাধ প্রবেশাধিকার জাতীয় অর্থনীতির স্বাধীন বিকাশ ক্ষুণœ করে ‘পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের’ বাজার ব্যবস্থার ওপর দেশের পরনির্ভরতা বাড়িয়ে তুলছে। অর্থনৈতিক নির্ভরতার সুযোগ নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, সামাজিক-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, সামরিক প্রভাব ইত্যাদি বিপজ্জনভাবে প্রসারিত হচ্ছে। দেশের সার্বভৌমত্ব বিপদাপন্ন হয়ে পড়েছে। (৩) দেশে উৎপাদনশীল বিনিয়োগের তুলনায় ফটকাবাজি, পরগাছাবৃত্তি, বিদেশি-পুঁজির কমিশন খাওয়া ইত্যাদি প্রবণতা প্রধান হয়ে উঠেছে।

 (৪) বেপরোয়া ঘুষ-দুর্নীতি-লুটপাটের প্রবণতা অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও রাজনৈতিক দায়মুক্তি পেয়ে সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতিতে অপরাধবৃত্তি, দুর্বৃত্তায়ন ইত্যাদিকে ভয়ঙ্কর মাত্রায় বাড়িয়ে দিয়েছে। (৫) মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে বিপুল সম্পদের পাহাড় জমেছে। বিত্তবানদের সংখ্যা ও তাদের সম্পদ-বৈভব কুৎসিত পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু তার অল্পই বিনিয়োজিত হয়ে পুঁজিতে পরিণত হয়েছে। তার বেশিরভাগ ভোগবিলাসে অপচয় কিংবা বিদেশে পাচার হচ্ছে। (৬) সমাজে ধনবৈষম্য, শ্রেণিবৈষম্য বেড়েছে। এর মধ্য দিয়ে সামাজিক নৈরাজ্যের বাস্তব উৎস ও উপাদান শক্তিশালী হয়েছে। (৭) ‘উন্নয়নের’ চুইয়ে পড়া ছিটেফোঁটা সাধারণ মানুষের হাতে এসে পৌঁছালেও তাদের ক্রয়ক্ষমতা প্রবৃদ্ধির হারের কাছাকাছি না হওয়ায় ‘অভ্যন্তরীণ বাজার’ (domestic market) আপেক্ষিকভাবে সংকুচিত রয়ে গেছে। (৮) লুটপাটের অর্থনীতি সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে জন্ম দিয়েছে স্থূল বাণিজ্যিক মূল্যবোধ, ভোগবাদ, প্রদর্শনবাদ ইত্যাদি। যার আগ্রাসনে নিঃশেষিত হয়ে চলেছে সমাজের সনাতন যাবতীয় নীতি-নৈতিকতা বোধ ইত্যাদি। এসবকে ‘প্রসববেদনা’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এগুলো আসলে হলো ‘মৃত্যুযন্ত্রণা’।
এসবই হলো প্রচলিত ‘সাম্রাজ্যবাদনির্ভর লুটেরা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার’ অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় এ কথা আজ প্রমাণিত যে, এই ‘ব্যবস্থার’ কাঠামোর মধ্যে দেশকে আবদ্ধ রেখে তার মধ্যে যত উনিশ-বিশ পরিবর্তনই, যতই সংস্কারই সাধন, যতই নব-নব সংস্করণের ছবি এঁকে গদি বদলের পর্ব সম্পন্ন করা হোক না কেন, তাতে সাধারণ মানুষের অবস্থার মৌলিক কোনো উন্নতি সম্ভব নয়। দশকের পর দশক ধরে এই ব্যবস্থা অনুসরণের অবশ্যম্ভাবী ফলাফল হিসেবে একদিকে ওপরতলার ‘এক ভাগ’ মানুষের সীমাহীন লুটপাট, ওপরভাসা ‘উন্নয়নের’ কিছু চাকচিক্য ও অন্যদিকে তৃণমূলের ‘পনেরো আনা’ মানুষের জন্য চুইয়ে পড়া ছিটেফোঁটা অগ্রগতি ছাড়া সমাজ-অর্থনীতি-সংস্কৃতি-নৈতিকতা প্রভৃতি সব ক্ষেত্রেই সমস্যা-সংকট ও অবক্ষয়-অধোগতি ক্রমাগত গভীরতর হয়ে চলেছে।

এই অবস্থা থেকে দেশকে রক্ষা করে ‘জাতীয় পুনরুজ্জীবনের’ ধারা সূচনা করাটি আজ জরুরি কর্তব্য। কিন্তু যে নীতি-ব্যবস্থায় দেশ এখন পরিচালিত হচ্ছে তারই আরও দক্ষ ব্যবস্থাপনার দ্বারা সেরূপ ‘জাতীয় পুনরুজ্জীবন’ সাধন করা যাবে না। সেটি সাধন করতে হলে অবক্ষয়-অধোগতির উৎস যে ‘নীতি-ব্যবস্থা’ তা বদলে দিতে হবে। তার জায়গায় ‘বিকল্প নীতি-ব্যবস্থা’ প্রবর্তন ও অনুসরণ করতে হবে। এটি একটি র‌্যাডিকাল কাজ। গোটা বিষয়টি তাই সামগ্রিকভাবে ‘ব্যবস্থা’ বদলে ফেলার একটি র‌্যাডিকাল কর্তব্যকে নির্দেশ করে।

অনেকে বলতে চান যে, লুটেরা পুঁজিবাদের বদলে উৎপাদনশীল পুঁজিবাদে উত্তরণ ঘটানোর মধ্য দিয়েই দেশের সংকট নিরসন সম্ভব। কিন্তু আর্থ-সামাজিক বিকাশধারার ঐতিহাসিক যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমাদের দেশ বর্তমান অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে তাতে উৎপাদনশীল পুঁজিবাদের ধারাকে প্রধান কিংবা এমনকি যথেষ্ট শক্তিশালী করাটিও এ দেশে অসম্ভব। 

সম্পদের সঞ্চয় প্রক্রিয়ায় লুটপাটের সুযোগ-সুবিধা এখন এ দেশে এত বেশি যে, তার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় কখনই উৎপাদনশীল পুঁজি টিকে থাকতে পারেনি, ভবিষ্যতেও পারবে না। রাষ্ট্রব্যবস্থায় লুটেরা পুঁজি সব দিক থেকে (সামরিক-বেসামরিক প্রশাসন, অর্থনীতির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, তথাকথিত নাগরিক সমাজ, প্রচার ব্যবস্থা, সামাজিক মনস্তত্ত্ব ইত্যাদি সব ক্ষেত্রে) যে একচ্ছত্র কর্তৃত্ব স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে তাতে বিদ্যমান স্থিতাবস্থার ভেতরে ঢুকে এই ‘ব্যবস্থা’ ভেঙে বেরিয়ে আসা কখনই সম্ভব হবে না। তাই পুঁজির লুটেরা চরিত্রকে সংযত করে তার উৎপাদনশীল ভূমিকা নিশ্চিত করতে হলেও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার গ-িকে অতিক্রম করে সমাজতন্ত্র অভিমুখিনতা ও বামপন্থার দিকে মুখ ঘুরানোটি আজ দেশ, জাতি ও জনগণের স্বার্থে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তথা ‘নৌকা’ ও ‘ধানের শীষের’ মধ্যে বহুবার ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে। কিন্তু তাদের হাত দিয়ে আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার মূলনীতি ও দর্শন কখনই মুক্তিযুদ্ধের চার নীতির ধারায় পরিবর্তিত হয়নি। ফলে, গদি বদলের মধ্য দিয়ে ‘আপদ’ দূর হয়েছে, তো এসে হাজির হয়েছে ‘বিপদ’। ‘বিপদ’ বিদায় হয়ে এসেছে ‘আপদ’। দেশ ও জনগণ ‘ফুটন্ত কড়াই’ থেকে ‘জ্বলন্ত উনুনে’ কিংবা ‘জ্বলন্ত উনুন’ থেকে ‘ফুটন্ত কড়াইয়ে’ নিক্ষিপ্ত হয়েছে। এ ‘খেলার’ অবসান ঘটাতে হবে। ‘ব্যবস্থা বদল করে’ এই বৃত্ত থেকে দেশকে বের করে আনতে না পারলে ‘নিরানব্বই ভাগ’ মানুষের অবস্থার কোনো মৌলিক অগ্রগতি ঘটানো যাবে না। সিপিবি ও ‘বাম গণতান্ত্রিক জোট’ সেই এজেন্ডার বিষয়টিকেই তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের মধ্য দিয়ে সামনে এনেছে।

‘ব্যবস্থা বদল’ আজ অপরিহার্য কর্তব্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু ‘ব্যবস্থা বদল’ করে কোন ব্যবস্থায় দেশ পরিচালনা করা উচিত, সেটি আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সে সম্পর্কে আগামী সপ্তাহে লেখার আশা রাখি।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিদৈনিক আমাদের সময়, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৮

শেয়ার করুন

Print Friendly and PDF


মতামত দিন

Developed By -  IT Lab Solutions Ltd. Helpline - +88 018 4248 5222