সর্বশেষ

  কবি হেলাল হাফিজ হাসপাতালে   সিলিং ফ্যানের দাম এক লাখ টাকা!   শুনতে কি পাও কৃষকের কান্না   আজ রক্তে ভেজা ২০ মে : মহান চা-শ্রমিক দিবস   একটি অন্য রকম প্রতিবাদ   হুয়াওয়ের শীর্ষে পৌঁছানোর স্বপ্ন গুড়িয়ে দিলো গুগল?   মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই ছয় ছাত্রলীগ নেতাকর্মী; হতাশ বিশ্বজিতের পরিবার   বুধবার থেকে পাটকল শ্রমিকদের ৬ ঘণ্টা সড়ক-রেলপথ অবরোধ   সাগরে যাবে বিয়ানীবাজারের দুই শতাধিক তরুণ   র‍্যাবের অভিযানে বিয়ানীবাজার দু'জন গ্রেফতার   ছাত্রলীগের কমিটি নিয়ে কেন এই রক্তারক্তি   ৯৫ ভাগ জাতীয় আয় চলে যাচ্ছে ৫ ভাগ মানুষের হাতে   যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও খরচ বেশি বাংলাদেশের শিক্ষায়   হাজী আব্দুস সাত্তার শপিং কমপ্লেক্স মালিকপক্ষে'র ইফতার সামগ্রী বিতরণ   অনন্ত হত্যার বিচার বিশেষ ট্রাইব্যুনালে করার দাবি

সম্পাদকীয়

ইতিহাসের মহানায়ক কমরেড মণি সিংহ

প্রকাশিত : ২০১৯-০১-০৬ ১৮:৩২:০৮     আপডেট : ২০১৯-০১-০৬ ১৯:০৫:৪৩

রিপোর্ট : সম্পাদকীয় (অনিরুদ্ধ দাশ অঞ্জন )



“... প্রগতির/ প্রসিদ্ধ চারণ জাগো, জেগে ওঠো, চেয়ে দ্যাখো–/ করোনি শাসন কোনোদিন তবু বাংলাদেশ আজ/ তোমাকেই গার্ড অব অনার জানায়।” (ভাস্বর পুরুষ, শামসুর রাহমান) কমরেড মণি সিংহ উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের এক কিংবদন্তী। এ অঞ্চলের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে তাঁর নাম ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে আছে। সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে যাঁরা এই অঞ্চলে কমিউনিস্ট আন্দোলনের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, মণি সিংহ তাঁদের অগ্রণী। তাঁর ৮০তম জন্মদিনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি তাঁকে যথার্থই ‘পার্টির বিপ্লবী ঐতিহ্যের প্রতীক’ বলে অভিহিত করে। 

বাংলাদেশের শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের শোষণমুক্তির লড়াই, গণতন্ত্রের সংগ্রাম, জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম-সব আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন কমরেড মণি সিংহ। তিনি ছিলেন নেতাদের নেতা। তিনি শুধু আন্দোলনের নেতৃত্বই দেননি, তৈরি করেছেন আন্দোলনের অসংখ্য নেতা-কর্মী। তাঁর বিপ্লবী জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে অসংখ্য তরুণ হয়ে ওঠেন সমাজবদলের যোদ্ধা। কবি সুফিয়া কামাল তাঁকে ‘ইতিহাসের যুবরাজ’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। 

মণি সিংহ কলকাতায় স্কুলে পড়ার সময়ই বিপ্লবীদের সংস্পর্শে আসেন এবং যুক্ত হন ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতাসংগ্রামে। ১৯১৪ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে সশস্ত্র বিপ্লববাদী দল ‘অনুশীলনে’র সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। ধীরে ধীরে বিপ্লবী ধারায় নিজেকে গড়ে তোলেন। ১৯২১ সালে তাঁর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হয়। ১৯২৫ সালে রুশ বিপ্লবের প্রত্যক্ষদর্শী কমরেড গোপেন চক্রবর্তীর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে আদর্শ হিসেবে তিনি গ্রহণ করেন এবং ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সূচনাপর্বেই যোগ দেন কমিউনিস্ট পার্টিতে। ১৯২৬ সালের শেষের দিকে তিনি কলকাতায় ক্লাইভ স্ট্রিটের গুপ্ত ম্যানশনে ‘ওরিয়েন্টাল ট্রেডিং’য়ের নামে অফিস চালু করেন। ১৯২৮ সালের প্রথম দিকে সেখানেই শুরু করেন শ্রমিক আন্দোলন। কলকাতার মেটিয়াবুরুজে চটকল শ্রমিকদের প্রিয় নেতা হয়ে ওঠেন তিনি। 

১৯৩০ সালে মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রামে অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের পর ব্রিটিশ শাসক নির্বিচারে শত শত বিপ্লবীকে গ্রেপ্তার করে। ৯ মে কলকাতায় গ্রেপ্তার হন মণি সিংহ। টানা ৫ বছর বিভিন্ন জেল-ক্যাম্প ঘুরিয়ে এনে ১৯৩৫ সালে সুসং-দুর্গাপুরে নিজ গ্রামের বাড়িতে তাঁকে নজরবন্দী করে রাখা হয়। এখানে সাধারণ প্রজাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন গড়ে তুললে তাঁকে তিন বছরের কারাদণ্ডে দেওয়া হয়। পরে আপিলে সাজা দেড় বছর কমে আসে। ১৯৩৭ সালে জেল থেকে বের হওয়ার পর তিনি পার্টির সভ্য হন। 

কমরেড মণি সিংহ ছিলেন টঙ্ক আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা। এ আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর নামটা একাকার হয়ে আছে। টঙ্ক মানে ধান কড়ারি খাজনা। কৃষকদেরকে উৎপাদিত ধানের ওপর যে টঙ্ক দিতে হতো, তার পরিমাণ ছিল প্রচলিত খাজনার চেয়ে কয়েকগুন বেশি। উৎপাদন হোক বা না হোক কড়ার ধান দিতেই হতো। টঙ্ক-জমির ওপর কৃষকদের কোনো স্বত্ব ছিল না। বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিভিন্ন স্থানে টঙ্ক প্রথা প্রচলিত ছিল। ১৯৩৭ সালে নদীয়া জেলার করিমপুর থানা থেকে মুক্তি পেয়ে কমরেড মণি সিংহ নেত্রকোনায় গ্রামের বাড়িতে গেলে, কৃষকরা তাঁকে বলেন :
“খোদার রহমতে আপনে খালাস পাইছেন। আমরা খুশি হইছি। এহন টঙ্কটা লইয়া লাগুইন। আমরা আর টঙ্কের জ্বালায় বাঁচতাছি না।” 
কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে এই সংগ্রামী আহ্বানে তিনি সাড়া দিতে পারেননি। কলকাতায় ফিরে গিয়ে শ্রমিক আন্দোলনকে অগ্রসর করার তাগিদ ছিল তাঁর। এছাড়া টঙ্ক প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গেলে নিজের আত্মীয়দের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে-এটা ভেবে তাঁর মধ্যে নানা দ্বিধা-দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছিল। সেই দ্বন্দ্বের নিরসন হয়েছিল মার্কসবাদী-লেনিনবাদী মতাদর্শের প্রতি তাঁর দৃঢ় আস্থার কারণে। হাজং, গারো ও মুসলিম কৃষকদের নিয়ে তিনি টঙ্ক প্রথা উচ্ছেদের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। 

দীর্ঘ ১২ বছর টঙ্ক আন্দোলন চলছিল এবং এক সময় তা সশস্ত্র আন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে ৬০ জনকে প্রাণ দিতে হয়েছে। কৃষকদের শতশত বাড়ি, গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আত্মরক্ষা ও আশ্রয়ের জন্য সংগ্রামী কৃষকেরা পাহাড়ে ৯টি যুদ্ধঘাঁটি তৈরি করেন। সশস্ত্র পুলিশ, প্যারামিলিটারি এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তাঁরা পাহাড়ি অঞ্চলে অস্ত্র তৈরি করেন। গুপ্ত ক্যাম্পে তাঁরা ৮০টি গাড়া বন্দুক এবং পরপর ৪০টি গুলি ছোড়ার ক্ষমতাসম্পন্ন কামারসালার কামান তৈরি করতে সক্ষম হন। তাঁরা অনেক সময় পরাজিত পুলিশের রাইফেলও ছিনিয়ে নেন। হাজং অঞ্চলে কৃষকদের ওপর যে নির্যাতন হয়েছিল, সে বিষয়ে কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে ১৯৪৭ সালে কমরেড জ্যোতি বসু ও কমরেড স্নেহাংশু আচার্য ‘রেইন অব টেরর ওভার দ্য হাজংস-অ্যা রিপোর্ট অব দি এনকোয়ারি কমিটি’ নামে প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন। 

মণি সিংহের পরিবারপ্রদত্ত নাম ছিল মণীন্দ্র কুমার সিংহ। আর পার্টিতে ছদ্মনাম ছিল ‘কমরেড আজাদ’। কিন্তু তিনি ‘বড়ভাই’ বলেই সমধিক পরিচিত। তিনি হাজংদের প্রিয় ‘মণি বেটা’, ‘টঙ্করাজ’, ‘মণিরাজ’। টঙ্ক আন্দোলনের সময় হয়ে উঠেছিলেন কল্পলোকের মহানায়ক। তাঁর সম্পর্কে নানা ধরনের রোমাঞ্চকর কাহিনি ছড়িয়ে পড়েছিল-ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে গারো পাহাড়ে ঘুরে বেড়ান, এক স্থান থেকে অন্য স্থানে দ্রুতই চলে যেতে পারেন, মুহূর্তেই চেহারা পরিবর্তন করতে পারেন ইত্যাদি। স্বাধীনতার আগে পার্টির খুব কম নেতা-কর্মীই তাঁকে সরাসরি দেখার সুযোগ পেয়েছেন।

পঞ্চাশের দশকের শুরু থেকে ষাটের দশকের শেষ পর্যন্ত টানা ২০ বছর মণি সিংহকে বাধ্য হয়ে আত্মগোপনে থাকতে হয়। এ সময় আইয়ুব সরকার তাঁকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ১০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে। ১৯৫৫ সালে মাত্র ১ মাস তিনি প্রকাশ্যে থাকতে পেরেছিলেন। ১৯৬৭ সালে আত্মগোপন অবস্থায় গ্রেপ্তার হন। তবে ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের পর ২২ ফেব্রুয়ারি তিনি মুক্তি পান। কিন্তু ওই বছরই মার্চ মাসে সামরিক শাসন জারি হলে আবার তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর কমিউনিস্ট পার্টি আবারও বেআইনি ঘোষিত হয় এবং তিনি আবার গ্রেপ্তার হন। ১৯৭৭ সালের মাঝামাঝি সময় তাঁকে গ্রেপ্তার করে বিনা বিচারে ছয় মাস অন্তরীণ রাখা হয়। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর।

মুসলিম লীগ সরকার মণি সিংহের বসতভিটা গুড়িয়ে দিয়েছিল। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু মণি সিংহকে তাঁর বাড়ি ফিরিয়ে দিতে চাইলে, তিনি তা নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বঙ্গবন্ধুকে বলেন-‘টঙ্ক আন্দোলন করতে গিয়ে যে সব হাজং কৃষকের জমি-বাড়ি বেদখল হয়েছে, এবং যাঁদের বংশধরেরা এখনও বাংলাদেশে বেঁচে আছেন তাঁদের কি বাড়ি-জমি ফেরত দিতে পারবেন?’
দেশভাগের পর অল্প যে কয়েকজন কমিউনিস্ট নেতা মাটি কামড়ে পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশে থেকে যান, মণি সিংহ তাঁদের অন্যতম। কত প্রতিকূলতার মধ্যে, কত নির্যাতন-অত্যাচার সহ্য করে তখন কাজ করতে হয়েছে, তা বর্তমান তরুণ প্রজন্মের অনেকের পক্ষেই ধারণা করাও সম্ভব নয়। জীবনের বাঁকে বাঁকে তিনি নির্যাতন সহ্য করেছেন। তাঁর সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, নিষ্ঠা, সততা, সাহস, দৃঢ়তা, বিচক্ষণতা কমিউনিস্ট কর্মীদের কাছে অনুসরণীয় হয়ে আছে। শোষিত-বঞ্চিত মানুষের প্রতি অকৃত্রিম দরদ-ভালোবাসা, আদর্শের প্রতি অবিচল আনুগত্য ছিল তাঁর। পার্টির নেতা-কর্মীদের প্রতি তিনি ছিলেন প্রচণ্ড আন্তরিক, বন্ধুবৎসল।

মণি সিংহের বাবা কালি কুমার সিংহ ছিলেন নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলার জমিদার পুত্র আর মা সুসং দুর্গাপুর রাজপরিবারের মেয়ে। রাজ পরিবারে জন্মেও তিনি স্বাচ্ছন্দ্য, নিরাপত্তা, স্বস্তিময় জীবনের সব সুযোগ স্বেচ্ছায় ত্যাগ করে বেছে নেন কঠিন সংগ্রামের জীবন। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল অনাড়ম্বর সাদামাটা। দেশ ও মানুষের জন্য নিবেদিত ছিল তাঁর সমগ্র জীবন। তাঁর জীবনসঙ্গিনী কমরেড অনিমা সিংহও ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টি ও কৃষক আন্দোলনের নেত্রী। 

কমরেড মণি সিংহ সম্পর্কে কমরেড সত্যেন সেন বলেছেন :“দু শত বছরের বৈদেশিক শাসনের জিঞ্জির থেকে উপমহাদেশকে মুক্ত করার সংগ্রামে অসহযোগ, খেলাফত আন্দোলনের আমলে যে বিপ্লবী যুবকেরা সর্বস্ব ত্যাগ করে সামনের সারিতে এসে যোগ দিয়েছিলেন, মণি সিংহ তাঁদের অন্যতম। অতঃপর স্বাধীনতা সংগ্রামের কর্মকাণ্ডে সর্বহারা, কৃষক, মজুর ও বিত্তহীন বুদ্ধিজীবীদের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে যাঁরা পুরোভাগে আনার চেষ্টা করেন, মণি সিংহ তাঁদেরও একজন। স্বাধীনতা সংগ্রামে মেহনতি জনতার ভূমিকা যাঁদের উদ্যোগে প্রবল ও প্রধান হয়ে ওঠে, মণি সিংহ তাঁদের একজন।”

শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের মুক্তিসংগ্রামে, গণতান্ত্রিক আন্দোলনে, জাতীয় মুক্তির আন্দোলনে কমরেড মণি সিংহ নেতৃত্ব দিয়েছেন। আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকে তিনি ভাষা আন্দোলনে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। ১৯৬১ সালে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর ও খোকা রায়ের যে ঐতিহাসিক বৈঠক হয়, তা এ দেশের রাজনৈতিক বিকাশের ক্ষেত্রে দিকনির্ধারণমূলক হিসেবে বিবেচিত। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান নেতৃত্বের একজন ছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালের ৭ এপ্রিল রাজশাহী কারাগার ভেঙে জনতা তাঁকে মুক্ত করে। তাঁর প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছিল ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ গেরিলা বাহিনী। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক শক্তির সমর্থন ও সাহায্য-সহযোগিতা আদায়ে তিনি প্রধান ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। 

সারা ভারতে পরিচিত মণি সিংহ পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম। কখনও পার্টির সম্পাদক, কখনও সভাপতি, আবার কখনও মূল দায়িত্বে না থেকেই প্রধান নেতা হিসেবে তিনি পার্টিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি ছিলেন কৃষাণ সভার প্রেসিডিয়াম সদস্য। ১৯৪৫ সালে নেত্রকোনায় অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত কৃষাণ সভার ঐতিহাসিক সম্মেলনের প্রধান সংগঠক ছিলেন তিনি। এ সম্মেলনে লক্ষাধিক কৃষকের সমাবেশ ঘটেছিল। 

স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার কমরেড মণি সিংহকে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ (মরণোত্তর) প্রদান করে। শান্তি, মৈত্রী, গণতন্ত্র ও সমাজপ্রগতির সংগ্রামে অনন্য ভূমিকার জন্য তাঁকে সোভিয়েত ইউনিয়ন সরকার ‘অর্ডার অব ফ্রেন্ডশিপ অব পিপলস’ ও ‘লেনিন শতবার্ষিকী’ পদক, বুলগেরিয়ার সরকার ‘অর্ডার অব জর্জি দিমিত্রফ’ এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী যুদ্ধের ৪০ম বার্ষিকীতে চেকোশ্লোভাকিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি বিশেষ পদক প্রদান করে। 

আপসকামিতা, সংকীর্ণতা, বিকৃতির বিরুদ্ধে মতাদর্শগত দৃঢ়তা নিয়ে মণি সিংহ নিরন্তর লড়াই চালিয়ে গেছেন। ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের কম ভোট পাওয়ার প্রেক্ষিতে পার্টির নাম পরিবর্তন করে ঢিলেঢালা পার্টি করার প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। এই বিলোপবাদী প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন : “নাম বদলালেই মানুষ আসবে-এ কথা ঠিক না। এখন যাঁরা নাম বদলানোর প্রস্তাব দিচ্ছেন, তাঁরা আস্তে আস্তে দাবি করবেন ডেমোক্র্যাটিক সেন্ট্রালিজম কেটে দিতে হবে, ডিক্টেটরশিপ অব প্রলেতারিয়েত কেটে দিতে হবে, ইন্টারন্যাশনালিজম কেটে দিতে হবে, মার্কসিজস-লেনিনিজম কেটে দিতে হবে-ফরাসি পার্টির মতো। তাঁরা কমিউনিস্ট পার্টির কনটেন্টই নষ্ট করে দেবে।”

মণি সিংহ বাকশাল, জিয়ার খাল কাটা কর্মসূচি, হ্যাঁ-না ভোটে অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে থাকলেও, গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার কারণে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠের মত মেনে নেন। পরবর্তী সময়ে এসব বিষয়ে পার্টির আত্মসমালোচনামূলক মূল্যায়ন থেকে তাঁর বিচক্ষণতা বোঝা যায়। 

কমরেড মণি সিংহ দৃঢ়ভাবেই বলেছিলেন :“কমিউনিস্ট পার্টি শ্রমিকের পার্টি, কৃষকের পার্টি, গরিবের পার্টি, ইনসাফের পার্টি। এই পার্টিকে যারা ধ্বংস করতে চাইবে, তারাই ধ্বংস হয়ে যাবে। কমিউনিস্ট পার্টি জিন্দা আছে, জিন্দা থাকবে।”তাঁর এই কথা বারেবারেই সত্য প্রমাণিত হয়েছে। পার্টির ভেতর এবং বাইরে থেকে যারাই পার্টিকে ধ্বংস করতে চেয়েছে, তারাই ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টি তার আদর্শ ও সংগ্রামের ধারায় অগ্রসর হচ্ছে। মণি সিংহ দুর্দান্ত স্বপ্নবান মানুষ ছিলেন। তিনি স্বপ্ন দেখতেন, স্বপ্ন দেখাতেন। তিনি স্বপ্নকে সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন। এখনও তিনি আমাদেরকে স্বপ্ন দেখিয়ে চলেছেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশের। ৮০তম জন্মদিনের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি বলেন :

“এ দেশে সমাজতন্ত্র হবে এই বিশ্বাস নিয়ে বেঁচে রয়েছি। যদি মৃত্যুবরণ করি, তাহলেও এই বিশ্বাস নিয়েই মরব যে-এ দেশে একদিন সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবেই, প্রতিষ্ঠিত হবে কৃষক-শ্রমিকের রাজত্ব।” ইতিহাসের মহানায়ক কমরেড মণি সিংহের এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ ধরেই আমাদের অগ্রসর হতে হবে।লেখক : প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)

শেয়ার করুন

Print Friendly and PDF


মতামত দিন

Developed By -  IT Lab Solutions Ltd. Helpline - +88 018 4248 5222