সর্বশেষ

  বাজেটে শিক্ষাকে বিশেষ শ্রেণির হাতে দেওয়ার চেষ্টা: ছাত্র ইউনিয়ন   এ বাজেট ধনীকে আরও ধনী, গরিব-মধ্যবিত্তকে অসহায় করে তুলবে: সিপিবি   আড়াই বছরেও সম্পদের হিসাব জমা দেননি দুদকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা   মুর্তজার মৃত্যুদণ্ড বাতিল করছে সৌদি আরব!   বিয়ানীবাজারে তথ্য আপা প্রকল্পের উঠন বৈঠক অনুষ্ঠিত   শ্রীবাসুদেবের স্নানমন্দিরে উৎসব পালিত   প্রাণীর চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে বিলুপ্ত হচ্ছে উদ্ভিদ প্রজাতি   ডেনমার্কের কমবয়সী প্রধানমন্ত্রী হবেন বামদলের মিটি ফ্রেডরিকসেন   কৃষকের দুর্গতির আসল কারণ হলো দেশে ‘পুঁজিবাদী ব্যবস্থা’   দিনে ছাপবে ২৫ হাজার ই-পাসপোর্ট, ছাপা হবে এমআরপিও   সরকারবিরোধী স্লোগান দেয়ায় এই বালকের শিরোশ্ছেদ করবে সৌদি!   অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস   ৭৩ বছরে ৩ কোটি মানুষ হত্যা করেছে যুক্তরাষ্ট্র   মিলিয়ন বছরের ঘুমন্ত জীবের পুনরুত্থান!   আজ ঐতিহাসিক ৭ জুন- শহিদ মনু মিয়া দিবস

সম্পাদকীয়

ধর্মঘট, হরতাল ও অনশন প্রসঙ্গে সংক্ষিপ্ত কিছু কথা

প্রকাশিত : ২০১৯-০৪-০৯ ১৫:১৯:১০

রিপোর্ট : নেসার আহমেদ


বৌদ্ধধর্মের মানুষরা সম্ভবত এটা চালু করেছিলেন। সড়কে পাশে কিছু দুর পর পর কলসে পানি ভর্তি করে রাখা হত। যাতে করে পথচারি তৃষ্ণার্থ মানুষরা ওই পানি পান করতে পারেন। এর নাম ধর্মঘট। এবার রাঙ্গামাটিতে গিয়ে সড়কের পাশে সেই ধর্মঘটের সন্ধান পেলাম।' তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিকাংশ বন্ধুদের মন্তব্য ছিল এটা ধর্মঘট নয়। ধর্মঘর। আজ এ বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য কিছু কথা লিখছি।

প্রথমে আসি ধর্মঘট প্রসঙ্গে। আমরা সাধারণত ধর্মঘট বলতে ইংরেজি স্ট্রাইক শব্দের বাংলা বুঝি। কিন্তু বিষয়টি আদতেই সে রকম নয়। ধর্মঘট বাংলা ভাষায় বহু প্রাচীন একটা শব্দ। এর দুই ধরণের ব্যবহার ছিল। ধর্মমঙ্গলকাব্য, মহাভারতেও ধর্মঘটের উল্লেখ আছে। আবার প্রাচীনকালে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভিন্ন প্রথা বা ব্রত্যের মধ্যেও ধর্মঘটের উল্লেখ আছে। আমি বিস্তারিত আলোচনায় যাব না। খুব সাধারণ ভাষায় ধর্মঘটের প্রয়োগ নিয়ে দুই/একটি উদাহরণ দিব।

জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস, বঙ্গ ভাষার অভিধানে বলেছেন-'ধর্মঘট হলো ধর্মার্থে বৈশাখ মাসে প্রত্যহ দেয় গঙ্গোদকপূর্ণ সভোজ্য সদক্ষিণা চন্দনাক্ত কলস। কিংবা ধর্মসাক্ষীপূর্বক স্থাপিত ঘট। কিংবা কোনো সম্প্রদায়ভুক্ত ব্যক্তিগণের সকলে সমবেত হইয়া কোনো কার্য করা বা না করা সম্বন্ধে যে প্রতিজ্ঞা করে। ...এইরুপ প্রতিজ্ঞা করিয়া ঘটস্থ ধর্মকে সাক্ষী রাখিত বলিয়া এই নাম।' আবার বাংলা ১৩৯০ সালে গুপ্তপ্রেস ডাইরেক্টরি পঞ্জিকায় বলা হয়েছে ধর্মের নামে জলপূর্ণ ঘটকে সাক্ষী রেখে কিংবা কোনো কিছুর সাফল্য কামনা করে যে প্রার্থনা উচ্চারণ করা হয় ঘটের সামনে সেই ঘটকেই 'ধর্মঘট' জ্ঞানে ও ধ্যানে পূজার্চনা করা।এবার আসা যাক ধর্ঘঘটের সাথে ঠেকোর সম্পর্কে নিয়ে। এই দুইয়ের আন্তঃসম্পর্ক বোঝা গেলে ঘর্মঘটের অর্থ আমাদের কাছে অনেকটা পরিস্কার হবে।

প্রাচীন ভারতে কোনো গোষ্ঠী বা সম্প্রদায় যাতে তার সামাজিক অনুশাসন উপেক্ষা করতে না পারে বা ধর্ম পরিত্যাগ করতে না পারে তার জন্য যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হত তার নাম ঠেক। এই ঠেক কর্যকর করার প্রধান উপায় ছিল ধর্মঘট। একটি সম্প্রদায়ের সমস্ত মানুষ প্রথমে একটি চত্বরে সমবেত হয়ে ধর্মঘট স্থাপন করত। সেই জলপূর্ণ ঘটের মুখে আমগাছের পাতা ও গায়ে সিঁদুর দিয়ে একটা চক্র একে এবং সেই চক্রের মধ্যে বসে মানুষ তাদের সমস্যা সমাধান অথবা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঘোঁট পাকিয়ে বা ঘুটিয়ে বিষয়টির চুড়ান্ত নিষ্পত্তি করত। এই সময় যদি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিধান নেয়া হত তাহলে ওই সম্প্রদায়ের সব সদস্য ওই ধর্মঘট স্পর্শ করে প্রতিজ্ঞা করতেন ঘোঁট বা স্থিরকৃত ব্যবস্থা অনুসারে ওই নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সম্প্রদায়কে তারা কোনো সামগ্রী জোগাবে না।

অর্থাৎ তাকে সামাজিকভাবে বয়কট করা হত। এমন কি কোনো মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও এই সামাজিক শাসন অমান্য করত না। তাছাড়া ঘোঁটের সিদ্ধান্ত গৃহিত হওয়ার পর ওই সম্পদয়ের প্রধানরা ধর্মঘট মাথায় করে ঢাক বাজিয়ে বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিত। মহারাজ নন্দকুমারের বিরুদ্ধে তাঁতিরা ঘট স্থাপন করে ধর্মঘট করা শুরু করলে অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মানুষও তাতে শামিল হন। তাঁতিরা কোনো হাটেই তাঁর কাছে কাপড় বিক্রি করত না। শেষ পর্যন্ত নন্দকুমারকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়েছিল। বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে তাদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিধান থেকেই ধর্মঘটের প্রচলন শুরু হয়। কারণ ওই সময়ে কোনো আধুনিক রাজনৈতিক দলের উদ্ভব ঘটেনি। ফলে ধর্মঘট যেমন তৃষ্ণার্থ মানুষের প্রয়োজনে স্থাপন কর হত। তেমনি অবোরোধের প্রয়োজনেও ঘর্মঘট স্থাপন করে শপথ নেওয়া হত। ঘর্মঘট বলতে প্রধানভাবে ধর্মীয় বিধিবিধান থেকে প্রতিজ্ঞা পালন বোঝাত। 

এবার আসা যাক হরতাল প্রসঙ্গে। মোগলদের আমলে কিছু কিছু অঞ্চলে হরতালকে ধর্মঘটের পরিপূরক হিসেবে গণ্য করা হত। হরতাল শব্দটা মূলত গুজরাটি। ফারসি হর শব্দের অর্থ অর্থ ব্যক্তি। আর তালু শব্দের অর্থ কুলুপ বা বন্ধ করা। অর্থাৎ হাটেবাজারে বেচাকেনা বন্ধ অর্থে হরতাল শব্দের ব্যবহার হয়ে আসছে। যেমন মোগল যুগে ১৬০০ সালে আদিল শাহির রাজ্যের ব্রোচে ও ১৬৮৮ সালে মাদ্রাজে তাঁতি সম্প্রদায়ের মানুষ কর নীতির বিরুদ্ধে অনেকদিন হরতাল পালন করেন। কিন্তু হরতালে তাদের সমস্যা সমাধান না হওয়ায় তারা উল্লেখিত অঞ্চল ছেড়ে চলে যান।

অনশনঃ এটাও একটা ধর্মীয় রীতি। ভারতীয়দের মধ্যে অনশন বহু বছর ধরে ব্রত হিসেবে পালন হয়ে আসছে। অনশন হলো প্রধানভাবে অরন্ধন প্রক্রিয়া। আগে কিছু ধর্মীয় রীতি ও পদ্ধতি পালনের জন্য অনশন করা হত। পরে অনশন ব্রতটি রাজনীতিতে যুক্ত হয়। যাকে আমরা বলি অনশন ধর্মঘট। এটা দাবি আদায়ের পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। এর আবার প্রতিবাদের দিকও রয়েছে। যেমন ব্রিটিশ বিরোধী অন্দোলনের সময় লাহোর জেলে যতীন দাস ৬৩ দিন অনশনের পর ১৯২৯ সালে ১৩ সেপ্টম্বর মৃত্যুবরণ করেন। এ ঘটনায় বাংলার মানুষকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। সেদিন বাংলার অধিকাংশ ঘরে প্রতিবাদ হিসেবে অরন্ধন প্রক্রিয়া গ্রহন করা হয় বা অনশন করা হয়।

শেয়ার করুন

Print Friendly and PDF


মতামত দিন

Developed By -  IT Lab Solutions Ltd. Helpline - +88 018 4248 5222