সর্বশেষ

  জগন্নাথপুরে শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দিল সোনার বাংলা সমাজ কল্যাণ সংস্থা   আশারআলো ফাউন্ডশনের শিক্ষা উপকরণ বিতরণ   জুড়ীতে আদালতের নির্দেশে মৃত্যুর ১৮দিন পর ধনমিয়ার লাশ উত্তোলন   ক্যাসিনো থেকে মাসে ১০ লাখ টাকা নিতেন মেনন   ভারতের সঙ্গে চুক্তি বাতিল, আবরার সহ সকল হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে প্রগতিশীল সংগঠনসমূহের বিক্ষোভ সমাবে   বিয়ানীবাজারে নিসচা'র সড়ক দূর্ঘটনা রোধে করণীয় শীর্ষক মতবিনিময় সভা ও অভিষেক অনুষ্ঠিত   ৫ দফা দাবীতে বিয়ানীবাজারে ফারিয়া'র মানববন্ধন   লক্ষীপুরে ছাত্রলীগে পদ পেতে লিখিত পরীক্ষা, ডোপ টেস্ট   ভারী অস্ত্রসহ ভাইরাল ছাত্রলীগ কর্মী   ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আহত ৫০, আটক ৩   কুষ্টিয়ায় চাঁদাবাজি মামলায় ছাত্রলীগ আহ্বায়ক গ্রেফতার   বালিশকাণ্ডের দায় মন্ত্রণালয়ও এড়াতে পারে না: আইইবি সভাপতি   ঢাবির ‘ক’ ও ‘চ’ ইউনিটের ফল রোববার   শ্রীমঙ্গলে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে চার ভুয়া সাংবাদিক আটক   মানসিকভাবে দুর্বল তরুণরাই জঙ্গিবাদে ঝুঁকছে : মনিরুল

সম্পাদকীয়

‘আমার এই দাবি নিয়ে কোনো আপস চলবে না (নন নেগোশিয়েবল)।’-জঁ ক্যা

প্রকাশিত : ২০১৯-০৯-১৪ ১৩:৪৮:২০

রিপোর্ট : দিবালোক ডেস্ক


সকাল ১১টা ৫০ মিনিট! ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর।
ফ্রান্সের অরলি বিমানবন্দর। আলো ঝলমলে রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া। বিমানবন্দরের সবকিছুই ঠিকঠাক। একটু পরেই অরলিতে অবতরণ করবে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের (পিআইএ) একটি বোয়িং-৭২০বি বিমান ১৭ জন যাত্রী ও ছয়জন ক্রু নিয়ে বিমানটি লন্ডন থেকে প্যারিস, রোম ও কায়রো হয়ে করাচি যাবে।

এর মধ্যে পাঁচজন যাত্রী প্যারিস থেকে উঠবে।ওই পাঁচজনের সঙ্গে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যূহ পেরিয়ে বোয়িংটিতে উঠে বসলেন ২৮ বছর বয়সী যুবক জঁ ক্যা। পাইলট আকাশে ওড়ার প্রস্তুতি হিসেবে বিমানটি চালু করতেই পকেট থেকে পিস্তল বের করে জঁ ইঞ্জিন বন্ধ করার নির্দেশ দিলেন।কেউ তাঁর নির্দেশ অমান্য করলে সঙ্গে থাকা বোমা দিয়ে পুরো বিমানবন্দর উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিলেন তিনি।

ওয়্যারলেসটি কেড়ে নিয়ে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের মাধ্যমে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্যে জঁ নির্দেশ দিলেন, বিমানটিতে যাতে ২০ টন ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী তুলে তা যুদ্ধাহত ও বাংলাদেশি শরণার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। বললেন, ‘আমার এই দাবি নিয়ে কোনো আপস চলবে না (নন নেগোশিয়েবল)।’

দীর্ঘ ছয় ঘণ্টা ধরে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেও তাঁর সিদ্ধান্ত থেকে একচুলও নাড়ানো গেল না। জঁ ক্যার ওই বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনা মুহূর্তে পুরো ফ্রান্স ছাড়িয়ে ইউরোপ হয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল। ফ্রান্সসহ বিশ্বের প্রভাবশালী টেলিভিশন চ্যানেলগুলো কিছুক্ষণ পরপর ঘটনার হালনাগাদ সংবাদ দিতে থাকল। বিশ্বজুড়ে চলা যুদ্ধবিরোধী ওমানবতার পক্ষের আন্দোলনকারীদের কাছে জঁ নামের ওই বাবরি দোলানো যুবক রীতিমতো হিরো বনে গেলেন।

তাঁর সঙ্গে দেখা করতে ফ্রান্সের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনের নেতারা অরলি বিমানবন্দরে এসে জড়ো হতে থাকলেন। তাঁদের কেউ কেউ গ্রেপ্তারও হলেন।

পিআইএর বিমানটিকে মুক্ত করতে ফরাসি সরকার তখন নতুন এক ফাঁদ আটল। তারা জঁ ক্যার দাবি অনুযায়ী ওষুধ আনতে ফরাসি রেডক্রসকে খবর দিল। রেডক্রস আরেক ফরাসি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘অর্ডি দ্য মানতে’র সহায়তায় বিমানবন্দরে দুটি ওষুধভর্তি গাড়ি নিয়ে হাজির হলো। ওই গাড়ির চালক ও স্বেচ্ছাসেবকের পোশাক পরে বিমানটিতে প্রবেশ করলেন ফরাসি পুলিশের বিশেষ শাখার চারজন সদস্য।

তাঁরা বিমানে তোলা ওষুধের বাক্সে পেনিসিলিন রয়েছে, এ কথা বলে বিমানের ভেতরে বিভিন্ন জায়গায় সেগুলো সাজিয়ে রাখার ভান করে সময়ক্ষেপণ করতে থাকলেন। একপর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা ওষুধের বাক্স নামানোতে সহায়তার নাম করে জঁ ক্যার হাতে একটি বাক্স তুলে দিলেন।

এরপরই তাঁর ওপর আক্রমণ শুরু করলেন পুলিশের সদস্যরা।পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে রাত আটটায় জঁ পুলিশের হাতে আটক হলেন। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হলো অরলি পুলিশ স্টেশনে।

সেখানে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জঁ জানালেন, তিনি ইচ্ছা করেই ৩ ডিসেম্বর বিমান ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করেন। কারণ ওই দিন পশ্চিম জার্মানির চ্যান্সেলর উইলি ব্র্যান্ডট ওই বিমানবন্দরে এসে নেমেছিলেন।নিরাপত্তাকর্মীরা তখন তাঁকে নিয়েই বেশি ব্যস্ত ছিলেন।
কে এই জঁ ক্যা?
আলজেরীয় সৈনিক বাবার একমাত্র সন্তান জঁ ক্যা।বাবা-মা দুজনই গত হয়েছিলেন।জঁ বিমান ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করেছিলেন ’৭১-এ জুনের মাঝামাঝি কোনো এক দিনে। তিনি তখন সবে ফরাসি সেনাবাহিনীর হয়ে বিদ্যুৎ প্রযুক্তিবিদ হিসেবে ইয়েমেনে চাকরি শেষে দেশে ফিরেছেন।

যুদ্ধে আহত শিশু ও শরণার্থীদের কষ্টের স্মৃতি তখন তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল।পশ্চিম পাকিস্তান সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের নিরীহ মানুষদের ওপর হামলা শুরু করার পর থেকে জঁ ঘটনাপ্রবাহ খেয়াল রাখছিলেন। ফরাসি পত্রিকায় বাঙালিদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা তাঁকে ব্যাপকভাবে পীড়িত করে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কিছু একটা করার উপায় খুঁজতে গিয়েই বিমান ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা আঁটেন তিনি।

তারপর তার নামে মামলা হয়! কোর্টে উঠে সে মামলা।আইনজীবী ছিনতাই হওয়া ওই পাকিস্তানি বিমানের সব যাত্রী ও বিমানের ক্রুদের সাক্ষ্য নেন।তাঁরা সবাই একবাক্যে বললেন, জঁ ক্যা তাঁদের সঙ্গে কোনো খারাপ ব্যবহার করেননি।এমনকি কারও দিকে সরাসরি পিস্তল তাক করেননি।

তিনি উল্টো যাত্রীদের উদ্দেশে বলেছেন, আমি বাংলাদেশের যুদ্ধাহত শিশু ও শরণার্থীদের ওষুধ পাঠানোর জন্য বিমানটি ছিনতাই করেছি।তাঁরা যাতে বাংলাদেশের ওই মানুষদের জীবন বাঁচাতে তাঁকে সহযোগিতা করেন।সেই আহ্বানই তিনি যাত্রী ও ক্রুদের উদ্দেশে জানিয়েছিলেন।

আর সত্যি কথা কি জানেন, জ্যঁ ক্যার কাছে কোনো বোমা ছিল না। যে বাক্সটি তার হাতে ছিল তাতে কেবল কিছু বৈদ্যুতিক তার, বই, এক কপি বাইবেল এবং একটি ইলেকট্রিক শেভার পাওয়া গিয়েছিল। এত সব চেষ্টা করেও অবশ্য জঁ-এর শেষ রক্ষা হয়নি। তাঁকে ফরাসি আদালত পাঁচ বছরের জন্য জেল দেয়।

জঁ কারাগারে থাকা অবস্থাতেই তাঁর পক্ষে ফরাসি দার্শনিক, কবি, লেখক ও ফরাসি সংস্কৃতিমন্ত্রী আন্দ্রে মারলোর নেতৃত্বে ফ্রান্স ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানবাধিকারকর্মীরা সোচ্চার হয়ে ওঠেন। অনেক আইনি লড়াইয়ের পর আদালত জঁ-এর শাস্তির মেয়াদ তিন বছর কমিয়ে তাঁকে ১৯৭৩ সালে মুক্তি দেন। জঁ ক্যা যখন জেল থেকে মুক্ত হলেন বাংলাদেশ তত দিনে স্বাধীন।

৭১-এ বিশ্ব কাঁপানো জঁ-এর জীবনের শেষ কটা বছর কেটেছে একান্ত পারিবারিক পরিসরে। তবে ’৭১-এর ৩ ডিসেম্বর প্যারিস বিমানবন্দরে তিনি যে দুঃসাহসী ঘটনা ঘটিয়েছিলেন, তা কিন্তু বৃথা যায়নি।
ডিসেম্বরের ৮ তারিখে জঁ ক্যা জেলে থাকা অবস্থাতেই ফরাসি রেডক্রস ও নাইটস হাসপাতাল বাংলাদেশের শরণার্থীদের জন্য ২০ টন ওষুধ ও শিশু খাদ্য পাঠায়। পাকিস্তানি বাহিনীর বাংলাদেশের মানুষের ওপর নির্মম গণহত্যা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে জনমত তীব্র হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের সমর্থন বাড়ে।বিস্ময়করভাবে জঁর মৃত্যুও হয়েছিল আমাদের বিজয়ের মাস ডিসেম্বরেই।দিনটি ছিল ২৩ ডিসেম্বর।

আপনি কি জানেন, ২৮ বছর বয়সী এক ফরাসি তরুণ জঁ ক্যা একাত্ম হয়েছিলেন আমাদের মুক্তিসংগ্রামে। ’৭১ সালে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিমান ছিনতাই করে শোরগোল ফেলে দিয়েছিলেন বিশ্বজোড়া।
স্যালুট বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের এই অকৃত্রিম বন্ধুকে!
সংগৃহীত

শেয়ার করুন

Print Friendly and PDF


মতামত দিন

Developed By -  IT Lab Solutions Ltd. Helpline - +88 018 4248 5222