সর্বশেষ

  নেত্রকোনা-৪ আসনে বাম জোটের প্রচারণায় হামলা, প্রার্থীসহ আহত ৪   ওয়ানডেতে অভিষিক্ত হচ্ছে সিলেট স্টেডিয়াম   আজ শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস   কুড়ারবাজার ইউপি সদস্য মাছুম গ্রেফতার   ২৪-২৬ ডিসেম্বরের মধ্যে সেনাবাহিনী নামবে   কলচার্জ, কলড্রপ ও বিরক্তিকর মেসেজের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট   আস্থা ভোটে টিকে গেলেন থেরেসা মে   জামায়াত বাদ, সিলেট-৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী ফয়সল চৌধুরী   বিয়ানীবাজার পলাতক আসামী শিবির নেতা রাজ্জাক গ্রেফতার   বিয়ানীবাজার পৌর আ.লীগের সহ সভাপতি যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী খছরুল হক মঙ্গলবার দেশে আসছেন   বিয়ানীবাজার মুড়িয়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান খয়ের গ্রেফতার   বিয়ানীবাজারে ডাকাতিঃ নগদ দুই লক্ষ টাকাসহ ১০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার লুট   বিএড কোর্সে ভর্তির অনলাইন আবেদন শুরু ১৭ ডিসেম্বর   হাঁসের ডিম থেকে বাচ্চা ফোটানোর অভিনব ‘তুষ-হারিকেন’ পদ্ধতি   অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে ফিরছেন সেরেনা উইলিয়ামস, রাফায়েল নাদাল

তথ্য-প্রযুক্তি

প্রযুক্তির ফাঁদে দেশের ভবিষ্যৎ

প্রকাশিত : ২০১৪-০৩-০২ ১৯:৪৮:২৫

রিপোর্ট : নিজস্ব প্রতিবেদক

‘পাখী-সব করে রব, রাতি পোহাইল/ কাননে কুসুমকলি, সকলি ফুটিল।।রাখাল গরুর পাল, ল'য়ে যায় মাঠে/ শিশুগণ দেয় মন নিজ নিজ পাঠে।।’একটা সময় ছিল যখন মদনমোহন তর্কালঙ্কার-এর লেখা এই কবিতাটি পড়ার জন্যই যেন শিশুদেররাত পোহাত। বই-স্লেট-পেন্সিল, মাস্টার মশাইয়ের বজ্রকন্ঠ, রবিঠাকুর, নজরুল, সুকুমার পড়তেপড়তে পড়তে কখন যে কৈশোর এসে যেত তা কি সবার মনে আছে? যুগ পাল্টাল, আদর্শলিপিকোথায় যেন হারিয়ে গেল! এখন বিদ্যালয়–মহাবিদ্যালয়-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপচে পড়া ভিড়। কাঁধেভারী ব্যাগ, হাতে নোটবুক, স্মার্টফোন, কানে হেডফোন নিয়ে আমাদের শিশুকিশোররা ছুটে জ্ঞানঅন্বেষণে। কেউ পৌছায় সাফল্যের শীর্ষে, কেউ ছিটকে যায় মাঝপথে। পড়াশোনায় অনীহা ও ঝরেযাওয়াদের ব্যর্থতার কারণ নিয়ে শিক্ষক-অভিভাবক সর্বোপরি আমাদের সমাজ কতটুকু অনুসন্ধিৎসুএই প্রশ্নটি থেকে যায়।দিবালোকের এক অনুসন্ধানে অনেকগুলো বিষয় উঠে আসে। বর্তমানে যে বিষয়টি আমাদেরকিশোর-কিশোরীদের বিপথগামী করছে তা হল প্রযুক্তির অপব্যবহার। বিয়ানীবাজার সিলেট বিভাগেরমধ্যে একটি ধনাঢ্য অঞ্চল। সিংহভাগ পরিবারের এক বা একাধিক অভিভাবক সদস্য বিদেশেজীবিকার তাগিদে পাড়ি জমিয়েছেন। তাই, দেশে অবস্থানরত এসব পরিবারের নারী (যথাযোগ্য সম্মানরেখে) ও অপ্রাপ্তবয়স্করা অভিভাবকের মত গুরুত্বপূর্ণ পদটি দখল করায় সমাজের ভাল-মন্দ,শালীন-অশালীন, ইতিবাচক-নেতিবাচক অনেক বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করা তাদের জন্যদুষ্কর। পরবাসে থাকা অনেক সদস্য/সদস্যরা তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারেন না।অভিভাবকদের অসচেতনতা ও অনেক ক্ষেত্রে অল্পশিক্ষাও কিশোর-কিশোরীদের পাঠবৈমুখ্যের একটিপ্রধান কারণ। প্রযুক্তির অপব্যবহারের ফলে আমাদের কিশোর-কিশোরীরা নিচের অবক্ষয়গুলোর শিকার:ধর্মীয় অবক্ষয়: আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে উৎসারিত সংস্কৃতি এখন বিলুপ্তপ্রায় কারণ,মোবাইল অপারেটরগুলোর বিজ্ঞাপনচিত্রেও খুবই সতর্কভাবে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে অশ্লীলতা। এমনকিশিশুদের জন্য তৈরি কার্টুনগুলোতে যেসব নারী চরিত্র সৃষ্টি করা হয় তাও এই ষড়যন্ত্রের বাইরে নয়,যা শিশুদের মাঝে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। তাছাড়া মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগেতরুণ-তরুণীদের কাছে এই অপসংস্কৃতি পৌঁছে যাচ্ছে খুব সহজেই। প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন : সাংস্কৃতিক আগ্রাসনটা ঘটেছে একেবারেইদানিংকালে। ৩০০ বছরের শাসনে যে কাজটি পুঁজিবাদীরা ও সাম্রাজ্যবাদীরা যা করতে পারেনি,প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে তাই হচ্ছে স্বচ্ছন্দে। তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ ও বিশ্বায়নের মাধ্যমে সমস্তপৃথিবীতে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে তাদের প্রাচীন অসভ্য সংস্কৃতি তথা নগ্নতা, অশ্লীলতা, ও বেহায়াপনা।অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অশ্লীলতাই এখন সবার কাছে আধুনিকতার মানদণ্ড।ইভটিজিং ও আত্মহত্যা: পাশ্চাত্য ও ভারতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশের ফলে শিশু-কিশোররা গণমাধ্যমদেখে নিজেদের বাস্তব জগতের নায়ক ভাবতে থাকে। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে একটি মেয়ের প্রতিস্বাভাবিক প্রেম নিবেদন অস্বাভাবিকভাবে হয় যা মেয়েটির জীবনে দুর্বিষহ যন্ত্রণা নিয়ে আসে।মুঠোফোনের অযৌক্তিক ব্যবহার তরুণ-তরুণীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা, যৌনহয়রানিসহ বিভিন্নসামাজিক অপরাধ বৃদ্ধি করছে। সব বয়সের মানুষের হাতে মুঠোফোন থাকায় স্কুল, কলেজ ওবিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের মূল্যবান সময় কেড়ে নিচ্ছে মুঠোফোন কোম্পানীগুলোর রাতজাগাঅফার। সম্প্রতি বিয়ানীবাজারে ইভটিজিং-কে কেন্দ্র করে আত্মহত্যাসহ বেশ কিছু অনাকাঙ্খিত ঘটনাঘটে গেছে।নিকট আত্মীয়ের দ্বারা যৌন হয়রানি: প্রযুক্তি ব্যবহারের বিভিন্ন ডিভাইস সহজলভ্য হওয়ায় তা অতিসহজেই নিম্নমধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী সম্প্রদায়ের নাগালে চলে এসেছে। অধিকাংশ পরিবারের প্রতিটি কক্ষেটেলিভিশন, পিসি, ডিভিডি, নোটবুক, স্মার্টফোন, আই-প্যাড ইত্যাদি থাকার ফলে প্রাপ্ত ওঅপ্রাপ্তবয়স্করা বুঝে না বুঝে কুরুচিপূর্ণ ও অশ্লীল ছবি দেখে। সরেজমিনে তদন্তে দেখা যায় যে,বিয়ানীবাজারের বিভিন্ন মোবাইল মেরামতের দোকানে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া অল্পবয়সী থেকে শুরু করেতদূর্ধ্ব বয়সীদের মোবাইলের মেমোরি কার্ডে গোপনীয়তা বজায় রেখে কুরুচিপূর্ণ ও অশ্লীল ছবি এবংআপত্তিকর দৃশ্য ঢুকিয়ে দেয়া হয়। কখনো কখনো এভাবে শিশুকিশোরদের ফাঁদে ফেলা ও ব্যবসা চাঙাকরার উদ্দেশ্যে নিষ্পাপ শিশুকিশোরদের অজান্তে এই জঘন্য কাজটি সারা হয়। এই ফাঁদে পা রাখাশিশু-কিশোরদের হাতে তাদের নিকট আত্মীয়রাও যৌন নিগ্রহের শিকার হয়। নির্যাতিতরা লজ্জা, ভয়ও মান-সম্মানের ভয়ে মৌন থাকে। এগুলো পরিবারের মেয়েশিশু ও নারীদের মনে দীর্ঘমেয়াদীনেতিবাচক প্রভাব ফেলে। উল্লেখ্য, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে বলা হয়েছে যে কোনো ব্যক্তি পর্নোগ্রাফিউৎপাদনের উদ্দেশ্যে কোনো নারী, পুরুষ বা শিশুকে প্রলোভন দিয়ে জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে স্থির, ভিডিও বাচলচ্চিত্র ধারণ করলে বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৭বছরের কারাদণ্ড ও ২ লাখ টাকা পর্যন্তঅর্থদণ্ড আরোপ করা যাবে। যদি কোনো ব্যক্তি পর্নোগ্রাফির মাধ্যমে কারও সম্মানহানি করে বাকাউকে ব্ল্যাকমেইল করে বা করার চেষ্টা চালায় তবে বিচারক ২ থেকে ৫ বছর মেয়াদী কারাদণ্ডআরোপ করতে পারবেন এবং তদুপরি, ১ থেকে ২লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড আরোপ করতে পারবেন।শিষ্টাচার বহির্ভূত আচরণ, মাদকাসক্তি : অভিভাবকদের অজান্তে নিজেদের কক্ষে নিভৃতেশিশু-কিশোররা অবাধে প্রযুক্তির অপব্যবহার করছে। এর ফলে যেমন কমছে পারিবারিক বন্ধন,তেমনি বাড়ছে অচেনা মানুষের সাথে সম্পর্ক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে চোখ রাখলেইখুঁজে পাবেন নীল পরী , রোদেলা আকাশ, মেঘলা দুপুর, পদ্মলোচন ইত্যাদি। এসব ভাঁওতাবাজিরফাঁদে পড়ে অনেকেই প্রতারিত হয়ে ঝুঁকছে মাদকের দিকে। এদের মধ্যে অনেকেই অভিভাবক ওগুরুজনদের সাথে করছে কর্কশ আচরণ।এই বিষাক্ত দংশন সম্বন্ধে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি (দুপ্রক),বিয়ানীবাজার-এর চেয়ারম্যান ও পঞ্চখণ্ড হরগোবিন্দ উচ্চ বিদ্যালয়-এর প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক আলীআহমদ বলেন, ‘‘ঘন ঘন বিভিন্ন অপারেটরের লোভনীয় অফার নিয়ে শিশু-কিশোরদের ব্যস্ততা অনেকসময় পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটায়। স্কুল-কলেজের অভিভাবক ও শিক্ষকদের সমন্বয়ে মোবাইল ব্যবহারনিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।’’ বিয়ানীবাজার আদর্শ মহিলা কলেজ, ফয়জুর রহমান একাডেমী ওবিয়ানীবাজার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে মোবাইল ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন,‘‘প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ফোন ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েশিক্ষার্থীদেরকে নিজস্ব ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করতে পারে।’’বিয়ানীবাজার বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন কিশোর-কিশোরীদের মুঠোফোন ও কম্পিউটারব্যবহার সম্পর্কে বলেন “আমি আমার বিদ্যালয়ে মুঠোফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছি। যদিও অনেকঅভিভাবক সন্তানদের খোঁজ নেবার জন্য মুঠোফোন দিয়ে থাকেন, তাদের সন্তানেরা প্রকৃতপক্ষেইন্টারনেটের মধ্য দিয়ে খারাপ বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে থাকে। তাদের তীক্ষ্ণ মস্তিষ্ক দ্রুত কাজ করে,যার ফলে একটার পর একটা অপশন ব্যবহার করার ফলে রাইট-রং বুঝে উঠার আগেই বিভ্রান্ত হয়েপড়ে। আমি মনে করি অভিভাবকরা তাদের ছেলেমেয়েদের প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রতি সতর্ক দৃষ্টিরাখবেন।”নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক অভিভাবক অভিযোগ করেন, “স্কুল-কলেজে বসেই অনেক শিক্ষার্থীলুকিয়ে বাইরে মুঠোফোনে কথা বলে। কিশোর-কিশোরীরা অবশ্যই মুঠোফোন ব্যবহার করবে। তবেনিজেদের দায়িত্বশীলতা নিয়ে তা ব্যবহার করতে শেখাতে হবে।”অন্য আরেকজন বলেন, “মা-বাবা ছেলে-মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার পর কৌশলে তারামুঠোফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করে অপরিচিত লোকের সাথে বাইরে চলে যাচ্ছে। বিষয়টি খুবইউদ্বেগজনক।”

শেয়ার করুন

Print Friendly and PDF


মতামত দিন

Developed By -  IT Lab Solutions Ltd. Helpline - +88 018 4248 5222