সর্বশেষ

  প্রতিটি স্কুলে অভিযোগ বক্স রাখার নির্দেশ হাইকোর্টের   ছাত্রলীগ নেতা বললেন, ‘সাংবাদিক পেলেই গুলি করে মারব’   কৃষক নয়, নেতারাই দিচ্ছেন ধান-চাল   বিয়ানীবাজারে ছাত্র ইউনিয়নের কাউন্সিল সম্পন্ন।। সভাপতি আবীর সম্পাদক সুজন   এইচএসসিতে বিয়ানীবাজারে পাশের হার ও ফলাফল   এইচএসসিতে বিয়ানীবাজারে পাশের হার ও ফলাফল   আনু মুহাম্মদের পরিবারের সদস্যদের গুমের হুমকি   ধর্ষণের বিচার ১৮০ দিনের মধ্যেই শেষ করার নির্দেশ   ইংল্যান্ড জিতেছে, নিউজিল্যান্ড তো হেরে গেল ভাগ্যের কাছে   বিয়ানীবাজারে সাংবাদিকের উপর হামলার প্রতিবাদে সাংবাদিকদের নিন্দা ও উদ্বেগ   বিশ্ব ক্রিকেটে নতুন চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড   বিয়ানীবাজার সাংবাদিককে ডেকে নিয়ে জিম্মি রেস্টুরেস্টের মালিকের হামলা   স্পর্শ সোস্যাল মিডিয়া’র উপদেষ্টা ও গভর্নিংবডির কমিটি গঠন এবং বিদায়ী সংবর্ধনা   পানি বিপদসীমার ৫০ সেন্টিমিটার ওপরে, তিস্তা ব্যারাজের সব গেট খোলা   পানি বিপদসীমার ৫০ সেন্টিমিটার ওপরে, তিস্তা ব্যারাজের সব গেট খোলা

সাহিত্য-সংস্কৃতি

শরতের অনুপম প্রসন্ন মূর্তি

প্রকাশিত : ২০১৬-০৮-২০ ১৪:০১:৫০

রিপোর্ট : ---সুহেল ইবনে ইসহাক




গাঢ় নীল আকাশ, সোনা ঝরা রোদ, দক্ষিণ দিক হতে উত্তরে শিমুলের তুলোর মতো ভেসে চলা সাদা মেঘের ভেলা, নদীর ধারে মৃদু মন্দ বাতাসে দোল খাওয়া সাদা সাদা কাশফুল, সাদা বক, পাখ-পাখালির দল মহা কলরবে ডানা মেলে আকাশের উজ্জ্বল নীলিমার প্রান্ত ছুঁয়ে মালার মতো উড়ে চলা, বাঁশঝাড়ে বাচ্চা তুলা কালো ডাহুক, বড় পুকুর ধারে জারুল গাছে বসা মাছ শিকারী মাছরাঙা, বাতাসে ছোট ছোট ঢেউ তুলে নদীতে পাল তুলে চলা নৌকা, মোহনীয় চাঁদনী রাত, মায়াবী পরিবেশ, আঁধারের বুক চিরে উড়ে বেড়ানো জোনাকীরা, চারদিকে সজীব গাছপালার ওপর বহে যাওয়া মৃদুমন্দ বায়ু, শিউলী, কামিনী, হাসনাহেনা, দোলনচাঁপা,  বেলী,  ছাতিম, বরই,  শাপলা, জারুল, রঙ্গন, টগর, রাধাচূড়া, মধুমঞ্জুরি, শ্বেতকাঞ্চন, মল্লিকা, মাধবী, কামিনী, নয়নতারা, ধুতরা, কল্কে, স্থলপদ্ম, কচুরী, সন্ধ্যামণি, জিঙে, জয়ন্তীসহ নাম না জানা নানা জাতের ফুলের গন্ধে মৌ মৌ করা বাতাস, চারপাশের শুভ্রতার মাঝে বৃষ্টির ফোঁটা, বৃষ্টিশেষে আবারো রোদ, দিগন্তজুড়ে সাতরঙা হাসি দিয়ে ফুটে ওঠা রংধনু।  এ দৃশ্য শুধু এক ঋতুতেই চোখে পড়ে। সে হল শরৎ।শুভ্রতার ঋতু I সবচেয়ে মোহনীয় ঋতু । 

শরতের স্নিগ্ধতা এক কথায় অসাধারণ। জলহারা শুভ্র মেঘের দল যখন নীল, নির্জন, নির্মল আকাশে পদসঞ্চার করে তখন আমরা বুঝতে পারি শরৎ এসেছে। শরতের আগমন সত্যিই মধুর।শরতের কাশফুলে মুগ্ধ হয় না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কাশফুল নদী তীরে বনের প্রান্তে অপরূপ শোভা ছড়ায়। গাছে গাছে শিউলির মন-ভোলানো সুবাসে প্রকৃতি হয়ে উঠে মায়াময়। শরৎকালে কখনো কখনো বর্ষণ হয়, তবে বর্ষার মতো অবিরাম নয়। বরং শরতের বৃষ্টি মনে আনন্দের বার্তা বয়ে আনে। শরতের সৌন্দর্য বাংলার প্রকৃতিকে করে তোলে রূপময়। ভাদ্র-আশ্বিন এ দু’মাস শরৎ ঋতু। বর্ষার পরের ঋতু শরৎ। তাই শরতের আগমনে বাংলার প্রকৃতি থাকে নির্মল স্নিগ্ধ।শরতের্ আকাশের মতো আকাশ আর কোন ঋতুতে দেখা যায় না।শরৎ কালের রাতে জ্যোৎস্নার রূপ অপরূপ। মেঘ মুক্ত আকাশে যেন জ্যোৎস্নার ফুল ঝরে। চাঁদের আলোর শুভ্রতায় যেন আকাশ থেকে কল্পকথার পরীরা ডানা মেলে নেমে আসে পৃথিবীতে। শরতের আকাশের ছেঁড়া ছেঁড়া সাদা মেঘের সাথে শৈশবের স্বপ্নেরা ঘুরে বেড়ায়, উড়ে বেড়ায় লাটাই বাঁধা ছোট কাগজের তৈরি ঘুড়িরা। অপরূপ বিভাও সৌন্দর্যের কারনে শরৎ কাল কে বলা হয়ে থাকে ঋতু রাণী। মানুষ মাত্রই শরৎ কালে প্রকৃতির রূপ-লাবণ্য দেখে মোহিত না হয়ে পারেনা। তাইতো প্রকৃতির এমন রূপের বাহারে কবি-সাহিত্যিকের মনোজগত ‘সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’ মেতে ওঠে। প্রকৃতির অমেয় ধারা সাধারনে সঞ্চারিত করতে সৃষ্টি করেন নতুন নতুন সাহিত্য কর্ম। 



তাই শারদসম্ভার নিয়ে রচিত হয়েছে অসংখ্য কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ। চর্যাপদের পদকর্তা থেকে শুরু করে আজকের তরুণতম কবির রচনায় ও শরৎকাল তার নান্দনিক ব্যঞ্জনা নিয়ে উদ্ভাসিত। বৈষ্ণব সাহিত্যেও তার প্রমাণ পাওয়া যায়। ভাদ্র মাস কে  নিয়ে বৈষ্ণব পদাবলীর এই পদটি সম্ভবত বিদ্যাপতি রচিত রাধা বিরহের সর্বশ্রেষ্ঠ পদ।

বাংলা সাহিত্যের মহীরূহ প্রকৃতি প্রেমিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শরৎ নিয়ে প্রচুর কবিতা-গান রচনার মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ ও সুবাসিত করেছেন। তিনি বলেছেন—


“শরৎ, তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি/ছড়িয়ে গেল ছাড়িয়ে মোহন অঙ্গুলি


 শরৎ,তোমার শিশির-ধোয়া কুন্তলে/বনের পথে লুটিয়ে পড়া অঞ্চলে

 আজ প্রভাতের হৃদয় ওঠে চঞ্চলি”

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বেশির ভাগ রচনায় রয়েছে প্রকৃতির জয়গান। তিনি পদ্মায় নৌকা ভ্রমণকালে শরতের ময়ূরকণ্ঠী নীল নির্মল আকাশে শিমুল তুলার মতো শুভ্রমেঘেদের দল বেঁধে  ছুটে বেড়ানো দেখে লিখেছিলেন—
“অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া/দেখি নাই কভু দেখি নাই এমন তরনী বাওয়া I”


শরৎ বন্দনায় এগিয়ে রয়েছেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি তার অসংখ্য গান ও কবিতায় শরতে বাংলার প্রকৃতির নিখুঁত আল্পনা এঁকেছেন।তার ‘শিউলি ফুলের মালা দোলে শারদ রাতের বুকে ঐ’, ‘এসো শারদ প্রাতের পথিক ’সহ অনেক গানই শরৎ-প্রকৃতির লাবণ্যময় রূপ নিয়ে হাজির রয়েছে।শরতের অসম্ভব চিত্ররূপময়তা ফুটে উঠেছে এ সব রচনায়:

“এসো শারদ প্রাতের পথিক এসো শিউলি বিছানো পথে

এসো ধুইয়া চরণ শিশিরে এসো অরুণ-কিরণ রথে।

দলি শাপলা শালুক শত দল এসো রাঙায়ে তোমার পদতল



নীল লাল ঝরায়ে ঢলঢল এসো অরণ্য পর্বতেi”


বাঙলা সাহিত্য জগতে মহাকবি কালিদাস ‘মেঘদূত’ কাব্যের জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন Iমহাকবি কালিদাস শরৎ বন্দনায় ও ছিলেন অগ্রবর্তী।

তিনি বলেন-“প্রিয়তম আমার, ঐ চেয়ে দেখ, নব বধূর ন্যায় সুসজ্জিত শরৎ কাল সমাগত।’ কবি ‘ঋতুসংহার’ কাব্যে শরৎ কাল বিষয়ে লিখেছেন—‘কাশ ফুলের মতো যার পরিধান, প্রফুল্ল পদ্মের মতো যার মুখ, উন্মত্ত হাঁসের ডাকের মতো রমণীয় যার নূপুরের শব্দ, পাকা শালি ধানের মতো সুন্দর যার ক্ষীণ দেহলতা, অপরূপ যার আকৃতি সেই নব বধূর মতো শরৎকাল আসে I” কবি কল্পনায় শরতের সাথে প্রকৃতি ও নারীর এই উপমা দেখে বিস্ময়াভিভূত না হয়ে উপায় নেই।


শরতের আরেকটি উল্লেখ যোগ্য দিক হলো—এ সময় মাঠ জুড়ে থাকে সবুজ ধানের সমারোহ। ধানের কচিপাতায় জমা হওয়া শিশিরের ওপর প্রভাতের তরুণ আলো মুক্তার মতো দ্যুতি ছড়ায়। আমাদের দেশের কৃষকরা নবান্নের আশায় দিন গোনে। আর বাঙালির সার্বজনীন প্রাণের উৎসব, হিন্দু সম্প্রদায়ের শারদীয় দূর্গাউৎসবের কথা বলাই বাহুল্য। শরৎকাল শারদীয় আরাধনায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের যেমন উৎসব মুখর করে, তেমনি বিজয়ার বেদনায়ও করে তোলে ব্যথিত। শরৎ বাঙলার প্রকৃতিতে আসে শুভেচ্ছা স্মারক হিসেবে, নানা মাত্রিক আনন্দের বারতা নিয়ে।  কবি বিনয় মজুমদার শরতের একটি চিত্র এঁকেছেন—
“শরতের দ্বিপ্রহরে সুধীর সমীর-পরে জল-ঝরা শাদা শাদা মেঘ উড়ে যায় ;
ভাবি,এক দৃষ্টে চেয়ে, যদি ঊর্ধ্ব পথ বেয়ে শুভ্র অনাসক্ত প্রাণ অভ্র ভেদি ধায়!”
তবে শরৎকে কবি গুরু বরাবরই দেখেছেন শান্তি, মঙ্গল ও সমৃদ্ধির ঋতু হিসেবে। তিনি বলেছেন—
‘আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ শেফালী ফুলের মালা

নবীন ধানের মঞ্জুরি দিয়ে সাজিয়ে এনেছি ডালা 

 এসো হে শারদ লক্ষ্মী তোমার শুভ্র মেঘের রথে

 এসো চির নির্মল নীল পথে…’

পরিশেষে বলা যায়, শরত প্রকৃতিকে অপরূপ রূপে সাজিয়ে যায় যার আবেশে অতি সাধারন মানুষ ও ভাবাবেগে আপ্লুত হয়।শরত অবসাদগ্রস্ত মনেও নতুন প্রেরণার সঞ্চার করে।তাই তো আমরা প্রকৃতিতে দেখি, এই ঋতুতে কি অপূর্ব রঙের খেলা, কি অপরূপ রঙিন ভুবন সাজায় প্রকৃতি। শরতে প্রাণবন্ত রূপ নিয়ে হেসে ওঠে গ্রাম বাংলার বিস্তৃত দিগন্ত।
সুহেল ইবনে ইসহাক : কবি ও কলাম লেখক,  টরন্টো, কানাডা I

শেয়ার করুন

Print Friendly and PDF


মতামত দিন

Developed By -  IT Lab Solutions Ltd. Helpline - +88 018 4248 5222