সর্বশেষ

  সরকারি ১০১ খাতে দুর্নীতি চিহ্নিত করেছে দুদক   জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের চিন্তাধারা কেন ‘বিপজ্জনক’?   তাসকিনের চোখে জল   রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলে ধর্মঘট শ্রমিকদের নামে মামলা   সব ব্যাংকের চোখ ৭৫ হাজার কোটি টাকায়   গ্রামবাসীর অর্থায়নে শহিদটিল্লা থেকে বড়দেশ রাস্তা সংস্কা্রের কাজ চলছে   শ্রীহট্টের চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয়: এক অনন্য নিদর্শন   ‘ভাত দে, কাজ দে, না হয় হকারদের ফুটপাতে বসতে দে’   উচ্ছেদ করা হবে বিয়ানীবাজারের অস্থায়ী মাছ বাজার   ধারাবাহিক গেলদের চান লারা   বিয়ানীবাজার থেকে ৬ লাখ টাকা ছিনতাই   প্রাথমিকে নারী শিক্ষক প্রার্থীদেরও সর্বনিম্ন যোগ্যতা স্নাতক   কৃষিকাজ ছাড়তে চায় ৬৫ শতাংশ কৃষক   সিলেটসহ সারা দেশে বয়ে যাচ্ছে কালবৈশাখী   ধর্মঘট, হরতাল ও অনশন প্রসঙ্গে সংক্ষিপ্ত কিছু কথা

সাহিত্য-সংস্কৃতি

শ্রীহট্টের চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয়: এক অনন্য নিদর্শন

প্রকাশিত : ২০১৯-০৪-১৫ ১৩:৫৬:৪০

রিপোর্ট : অমিতাভ পাল চৌধুরী


শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে সমগ্র ভারতবর্ষে শ্রীহট্ট একটি উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। প্রাচীনকাল থেকে প্রচলিত গুুুুরুগৃহ কেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্তা মঠভিত্তিক শিক্ষায় রুপান্তর ঘটে । আর সেই ধারায় শ্রীহট্টে দশম শতকের প্রথম ভাগে একটি উচ্চতর বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠে । ভাবতে ভাল লাগে পৃথিবীর খ্যাতনামা অক্সফোর্ড (১০৯৬খ্রি ), ক্যামব্রিজ (১২০৯ খ্রি ) , বলোগনার ( ১০৮৮ খ্রি ) মত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অনেক আগে শ্রীহট্টে জ্ঞানচর্চার এই অনন্য কীর্তিরচিত হয় ।


১৯৬১ সালে মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার পশ্চিমভাগ গ্রাম থেকে একটি তা¤্রশাসন আবিষ্কৃত হয় । উল্লেখ্য যে, প্রাচীনকালে রাজারা তামার পাতে রাজকীয় ঘোষণা ও আনুশাসন খোদাই করে রাখতেন । তামার পাতে খোদিত এসব দলিল তাম্রশাসন নামে পরিচিত । চন্দ্রবংশীয় বৌদ্ধ রাজা শ্রীচন্দ্র এই তাম্রশাসন প্রদান করেছিলেন । শ্রীচন্দ্রের সা্ম্রাজ্যভুক্ত এলাকার মধ্যে মানিকগঞ্জ, ঢাকা ফরিদপুরের পদ্মা তীরবর্তী এলাকা, শ্রীহট্ট অঞল ও কুমিল্লা, নোয়াখালীর সমতট অঞল ছিল। বিক্রমপুর তাঁর রাজধানী ছিল । ড.রমেশ চন্দ্র মজুমদার তার বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রাচীন যুগ) গ্রস্তে’ শ্রীচন্দ্রের শাসনকাল উল্লেখ করেছেন ৯০৫-৯৫৫ সাল।


পশ্চিমভাগ তাম্রশাসনের ভাষ্যানুযায়ী খৃস্টীয় দশম শতকের প্রথম ভাগে (আনুমানিক ৯৩৫ খ্রি:) শ্রীহট্টে একটি উচ্চতর বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে। চন্দ্রবংশীয় বৌদ্ধ রাজা শ্রীচন্দ্র এই চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয়প্রতিষ্ঠা করেন। সম্পূর্ণ রাজকীয় অনুকূল্য ও পৃষ্ঠপোষকতায় বিশাল এই বিদ্যাপীঠটি গড়ে উঠেছিল। প্রতিষ্ঠাতা শ্রীচন্দ্র প্রতিষ্ঠানটিস্থায়ীভাবে সংরক্ষণ কল্পে ৪০০ পাটক জমি ( ১ পাঠক= ৫০ একর বা ১৫০ বিঘা) বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বরাদ্দ করেছিলেন।অত্যন্ত দুঃখের বিষয় কালের করাল গ্রাসে পতিত হয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত এই বিদ্যাপীঠের কথা প্রায় সকলের অজানা বিদ্যাপীঠটির ইতিহাস রচনার উপকরণও সীমিত।


প্রখ্যাত প্রত্নতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ কমলাকান্ত গুপ্ত চৌধুরী তার বিখ্যাত 'Copper plates of sylhet” গ্রস্থে’ পশ্চিমভাগ তা্ম্রশাসনের বক্তব্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এবং তাম্রশাসন সর্ম্পকিত তার রচিত কিছু প্রবন্ধে এই বিশ্ববিদ্যালয় সর্ম্পকে আলোকপাত করেছেন। সুজিত চৌধুরী তার শ্রীহট্ট কাছাড়ের প্রাচীন ইতিহাস এবং নীহার রঞ্জন রায় তার বাঙ্গালীর ইতিহাস (আদিপর্ব) গ্রšে’ চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে কিছু তথ্য সংযোজন করেছেন । এছাড়াও মো: জহিরুল হক ও বায়োজিত আলম প্রাচীন সিলেটের চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয় ঃ একটি ইতিহাসভিত্তিক পর্যালোচনা শিরোনামে একটি গবেষনা প্রবন্ধ রচনা করেছেন।


চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসাবশেষ আজও অনাবিষ্কৃত। তবে পশ্চিমভাগ তাম্রশাসনের সূত্রানুযায়ী খ্রিস্টীয় দশ শতকের প্রথম ভাগে উত্তরে কুশিয়ারা নদী, দক্ষিণ ও পশ্চিমে মনু নদী এবং পূর্বে ইন্দেশ^রের পাহাড়ি অঞ্চল বা পাথরিয়া অঞ্চল এই সীমানার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ছিল। এ প্রসঙ্গে কেউ কেউ মৌলভীবাজার জেলার জুড়ি উপজেলার সাগরনাল ইউনিয়নের দীড়িপাড় এলাকার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। এই ইঙ্গিতের পেছনেও কিছু যুক্তি রয়েছে যেমন দীঘিরপাড় এলাকায়কোনো এককালে বড় শিক্ষাঙ্গন ছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে, এছাড়াও দীঘিরপাড় এলাকায় মাটির নিচে এখনও প্রাচীনকালের তৈরী বড় বড় ইট পাওয়া যায়।


চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামো সম্পর্কে যা জানা যায় তাহল নয়টি মঠ (একটি ব্রহ্মার মঠ, চারটি বঙ্গাল মঠ ও চারটি দেশান্তরীয়মঠ) নিয়ে চন্দ্রপুর বিশ^বিদ্যালয় গড়ে উঠেছিল। ব্রহ্মার মঠের যাবতীয় কার্য নির্বাহের জন্য বরাদ্দ ছিল ১২০ পাটক জমি। বাকি আটটি মঠের জন্য (৩৫৮=২৮০) ২৮০ পাটক জমি বরাদ্দ ছিল। দুই ধরণের ৪টি করে মোট৮টি মঠের প্রতিটি ছিল বড় বড় ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। নি:সন্দেহে চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয় ছিল হিন্দু শাস্ত্রবিদ্যা অধ্যয়নের বিশাল কেন্দ্র।


চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয়টি ছিল অতীব মনোরম এবং নির্মাণশৈলী কারুকার্যে সুশোভিত। বিশ্ববিদ্যালয় নিয়মিত সংস্কার ব্যয়নির্বাহের জন্য ৪৭ পাটক জমি বরাদ্দ ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়টি ছিল সম্পূর্ণ আবাসিক। শিক্ষার্থীদের থাকা খাওয়া ও পড়ার খরচ কর্তৃপক্ষ বহন করতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক ও অতিথিদের থাকার জন্য অতিথিশালা ছিল। প্রতিদিন ৫ জন অতিথি সেবার জন্য ৫ পাটক জমি বরাদ্দ ছিল। তাম্রশাসন অনুযায়ী ব্রাহ্মণগণ চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনারদায়িত্ব প্রাপ্ত ছিলেন। এর জন্য বরাদ্দ ছিল তাদের প্রত্যকের নাম এক পাটক জমি। পশ্চিম ভাগ তাম্রশাসনে ৩৬ জন ব্রাহ্মণের নাম পাওয়া যায়।


চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত বিভিন্ন পদের দায়িত্ব প্রাপ্তরা সকলেই নিজ নিজ দায়িত্ব প্রতিপালনের বিনিময়ে বেতনের পরিবর্তে জমির উপস্বত্ব ভোগ করতেন। বিভিন্ন ধরনের পদবীধারীরা তাদের কাজের বিনিময়ে কতটুকু জমির অধিকার পেয়েছিলেন তা সংক্ষিপ্ত ভাবে একটি সারণির মাধ্যমে তুলে ধরা হল:


চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে অস্থ‘র্ভূক্ত ছিল চতুর্বেদ অর্থাৎ ঋক, সাম, যজু ও অর্ধববেদ এবং সপ্তম শতকের বৌদ্ধ ব্যাকরণবিদ চান্দ্রগোমীর চান্দ্র ব্যাকরণ। গবেষকরা অনুমান করেন যে, চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দু শাস্ত্রবিদ্যা অধ্যয়নের পাশাপাশি চিকিৎসা শাস্ত্র, জ্যোতিষবিদ্যা, শল্যবিদ্যা, ধাতু বিদ্যা, হেতু বিদ্যা, শব্দবিদ্যা সহ আরো অনেক বিষয় পড়ানো হত। দশম শতকে শ্রীহট্টে চন্দপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মত বৃহৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ত একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ।


দুঃখের বিষয় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা দীক্ষার যে বিপুল আয়োজন ছিল পরবর্তীতে তার সামান্য উত্তরাধিকারী পর্যন্ত রইল না। ইখতেখার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি বিখ্যাত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করেছিলেন। শ্রীহট্টের এই চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয় কোন শাসকের রোষানলে পড়ে না অন্য কোন ভাবে ধ্বংস হয়েছিল তা জানা যায় না। ভারতের বিহারের পাটনা জেলায় প্রত্মতাত্ত্বিক খননের ফলেই নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে ঠিক এই ভাবে ব্যাপক খনন কার্য চালিয়ে অনুসন্ধান করলে চন্দ্রপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যেতে পারে।

 লেখকঃ অমিতাভ পাল চৌধুরী, ব্যাংকার

শেয়ার করুন

Print Friendly and PDF


মতামত দিন

Developed By -  IT Lab Solutions Ltd. Helpline - +88 018 4248 5222