সর্বশেষ

  নেত্রকোনা-৪ আসনে বাম জোটের প্রচারণায় হামলা, প্রার্থীসহ আহত ৪   ওয়ানডেতে অভিষিক্ত হচ্ছে সিলেট স্টেডিয়াম   আজ শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস   কুড়ারবাজার ইউপি সদস্য মাছুম গ্রেফতার   ২৪-২৬ ডিসেম্বরের মধ্যে সেনাবাহিনী নামবে   কলচার্জ, কলড্রপ ও বিরক্তিকর মেসেজের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট   আস্থা ভোটে টিকে গেলেন থেরেসা মে   জামায়াত বাদ, সিলেট-৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী ফয়সল চৌধুরী   বিয়ানীবাজার পলাতক আসামী শিবির নেতা রাজ্জাক গ্রেফতার   বিয়ানীবাজার পৌর আ.লীগের সহ সভাপতি যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী খছরুল হক মঙ্গলবার দেশে আসছেন   বিয়ানীবাজার মুড়িয়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান খয়ের গ্রেফতার   বিয়ানীবাজারে ডাকাতিঃ নগদ দুই লক্ষ টাকাসহ ১০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার লুট   বিএড কোর্সে ভর্তির অনলাইন আবেদন শুরু ১৭ ডিসেম্বর   হাঁসের ডিম থেকে বাচ্চা ফোটানোর অভিনব ‘তুষ-হারিকেন’ পদ্ধতি   অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে ফিরছেন সেরেনা উইলিয়ামস, রাফায়েল নাদাল

জাতীয়

কাস্তেটা শাণ দিও, বন্ধু

প্রকাশিত : ২০১৮-১১-২০ ০১:১৭:৫০

রিপোর্ট : মো. কিবরিয়া :



বাংলাদেশে একাদশ সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে মানুষের মধ্যে যে আপাত নিস্পৃহতা ছিলো ক্রিয়াশীল প্রায় সব দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে তা কিছুটা হলেও কাটতে শুরু করেছে। অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য যে পরিবেশ সৃষ্টি করার প্রয়োজন ছিলো, তা সৃষ্টি করার ব্যাপারে ক্ষমতাসীন সরকারের ন্যূনতম উৎসাহ ছিলো না, এখনো নেই। তবে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি না, তা সম্পর্কে জনগণের ব্যাপক অংশের মধ্যে তীব্র সন্দেহ থাকলেও নির্বাচনে তাদের মত প্রকাশের ন্যূনতম সুযোগ পেলে তা সদ্ব্যবহারের জন্য তারা প্রস্তুত হচ্ছে।

নির্বাচনকে সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক এবং অর্থবহ করার উদ্দেশ্যে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ তদারকি সরকার গঠন, সংসদ ভেঙে দেওয়া, নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন, নির্বাচন কালো টাকা-পেশীশক্তি-সাম্প্রদায়িক প্রচারণার প্রভাবমুক্ত করা, সংখ্যানুপাতিক ব্যবস্থা চালুসহ নির্বাচনী ব্যবস্থার আমূল সংস্কারসহ বিভিন্ন দাবিতে বাম গণতান্ত্রিক জোট দীর্ঘদিন ধরে রাজপথে সংগ্রাম করেছে। এই আন্দোলনে সাম্প্রতিক সময়ে বামজোটের নির্বাচন কমিশন ঘেরাও, রাষ্ট্রপতি বরাবর স্মারকলিপি পেশের কর্মসূচিতে পুলিশের আক্রমণ ও বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে, সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সভা সমাবেশে বাধা-নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। আন্দোলনের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে আগ্রহ প্রকাশ করার পর প্রধানমন্ত্রী ও ১৪ দলের সাথে সংলাপেও অংশ নিয়েছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। দীর্ঘ দিন পর বামজোট এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও জোটের সাথে ক্ষমতাসীন দলের সংলাপ প্রক্রিয়া জনমনে কিছুটা আশার সঞ্চার করলেও সেই আশা উবে যেতে সময় লাগেনি। 

প্রধানমন্ত্রীর সাথে সংলাপে বাম গণতান্ত্রিক জোট নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার জন্য বেশ কিছু প্রস্তাব ও দাবি উত্থাপন করে। বামজোটসহ অন্যান্য দল ও জোটের সাথে সংলাপ শেষ হবার পর প্রধানমন্ত্রী তার দল ও জোটের অবস্থান সংবাদ সম্মেলন করে তুলে ধরবেন বলে জানান। সেই সংবাদ সম্মেলন আর হয়নি। সংলাপের কোনো ফল আসার আগেই নির্বাচন কমিশন তড়িঘড়ি করে তফসিল ঘোষণা করে। মনোনয়নপত্র জমা ও তার প্রত্যাহারের জন্য পর্যাপ্ত সময় না রেখেই তফসিল ঘোষণা করা মূলত সরকারের সাজানো ছক বাস্তবায়ন ও আরেকটি একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার ফাঁদ হিসেবেই বিরোধী রাজনৈতিক দল ও সর্বস্তরের জনগণের কাছে প্রতিভাত হয়েছে। পরবর্তীতে অধিকাংশ দলের আপত্তির প্রেক্ষিতে নির্বাচনের তারিখ ৭ দিন পিছিয়ে দিলেও নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি, তৃণমূল থেকে মনোনয়ন নিশ্চিত করা, গণতান্ত্রিকভাবে জোটের শরিক দলগুলোর সাথে আলোচনা করা ইত্যাদির জন্য তা পর্যাপ্ত সময় নয়।


এরই মধ্যে নির্বাচনী আচরণবিধি লংঘন করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ব্যাপক শোডাউনের মধ্য দিয়ে তাদের দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রি করেছে। নির্বাচনী মনোনয়নের লড়াইয়ে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে ইতিমধ্যে রাজধানীতে দুইজন নিহত হয়েছে। ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন সংগ্রহের জন্য হাজার হাজার নেতাকর্মীর জমায়েত করা হয়েছে। সেসময় বামজোটের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও তাতে কর্ণপাত করা হয়নি। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বিক্রি শেষ হয়ে যাওয়ার পর বিএনপি একইভাবে মনোনয়নপত্র বিক্রির সময় শোডাউন করলে, নির্বাচন কমিশনের টনক নড়ে। তখন তারা এ ধরনের শোডাউনকে নির্বাচনী বিধিমালার পরিপন্থি হিসেবে ঘোষণা করে। ১৪ নভেম্বর বিএনপির কার্যালয়ের সামনে এরকম মিছিলে পুলিশ বাধা দিলে সংঘর্ষ শুরু হয়। এই ধরনের পরিস্থিতি নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা ও পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণেরই প্রমাণ।


মহান মুক্তিযুদ্ধের পর অর্জিত সংবিধানের একটি অন্যতম স্তম্ভ হচ্ছে গণতন্ত্র। গণতন্ত্রের জন্য এই দেশের মানুষকে বারবার রক্ত দিতে হয়েছে। ৯০ সালে স্বৈরাচার পতনের পর দেশের মানুষ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে বলে ভেবেছিলো। কিন্তু বিগত ২৮ বছরে যারা ক্ষমতায় থেকেছে, তারা দেশকে একদিকে যেমন স্বৈরাচার ও সামরিক শাসনের দেখানো পথ ধরে লুটপাটের স্বর্গরাজ্য ও সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী রাজনীতির অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে, অপরদিকে গণতান্ত্রিক রীতিনীতিকে অগ্রাহ্য করে প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার স্বৈরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী প্রবণতার চর্চা করেছে। জনগণ এক দুঃশাসন থেকে মুক্তি পেতে ভোট দিয়ে আরেক দুঃশাসনকে ডেকে এনেছে। বর্তমান সরকারও পূর্ববর্তী সরকারগুলোর তুলনায় নতুন নতুন পদ্ধতিতে আরো কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করেছে। শুধু তাই নয়, তারা ২০১৪ সালে একতরফা নির্বাচন করে ১৫৪টি সিটে বিনাভোটে নিজেদেরকে বিজয়ী বলে ঘোষণা করে ৫ বছর ক্ষমতা ভোগ করেছে। তারা বিরুদ্ধ-মতের টুঁটি চেপে ধরেছে, গুম-খুন-ক্রসফায়ারের মাধ্যমে জনমনে ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, বিচারবিভাগসহ সাংবিধানিক অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে নিজের কব্জায় এনেছে। 

এমন একটি স্বৈরাচারী সরকারকে ক্ষমতায় রেখে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন আশা করা কঠিন। নির্বাচন কমিশনও তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তার নিজের স্বাধীন অস্তিত্বের জানান দিতে পারেনি। নির্বাচনে সকল নাগরিকের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের যে দাবি সিপিবিসহ অন্যান্য বামপন্থিরা জানিয়ে আসছে, তা নিশ্চিত করা তো দূরের কথা, অন্ততপক্ষে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়নি, সরকারি দল জনগণের করের টাকায় নিজেদের অনুকূলে বিজ্ঞাপন প্রচার করছে, বিরোধী দলগুলোর সভা-সমাবেশে বাধা দেয়া হচ্ছে, মামলা-হয়রানি করা হচ্ছে। এমতাবস্থায় একটা অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ আছে বলে কোনো সচেতন মানুষ মনে করে না।

বাংলাদেশের মানুষ দেখেছে, দলীয় সরকারের অধীনে এই দেশে কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু হয়নি। বাংলাদেশের লুটপাটনির্ভর অর্থনীতির সাথে রাজনৈতিক ক্ষমতাতন্ত্র একাকার হয়ে যাওয়ায়, ক্ষমতায় টিকে থাকতে কিংবা ক্ষমতায় আসীন হতে শাসকগোষ্ঠীর বৃহৎ দুটি রাজনৈতিক দল এমন কোনো পথ নেই যা তারা অবলম্বন করে না। নীতি-আদর্শের থোড়াই কেয়ার করে তারা একদিকে যেমন বিভিন্ন আদর্শের দলগুলোর সাথে নির্বাচনী জোট করে, অন্যদিকে বিদেশি শক্তিকে ‘ম্যানেজ’ করার অভিপ্রায়ে ধরনা দেয়। এই দেউলিয়া রাজনীতির কারণে এদেশে বারবার রাজাকার, পতিত স্বৈরাচার, দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসীরা রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয়। ক্ষমতায় থাকতে কিংবা ক্ষমতায় যেতে তারা এতটাই মরিয়া যে, এই দেশে গত ৪৭ বছরে একটা সুষ্ঠু নির্বাচনী ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক এই প্রতিহিংসা ও অনাস্থার রাজনীতির কারণে নির্বাচনকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফর্মুলাটি এক সময় গ্রহণ করা হয়েছিলো। কিন্তু সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারকেও দলীয়করণ করার প্রচেষ্টা বাংলাদেশের মানুষ দেখেছে, দেখেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নামে অদৃশ্য সেনাশাসনও। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থাই, প্রকৃত গণতন্ত্র তো দূরের কথা, জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতার নির্বিঘ্ন হস্তান্তর নিশ্চিত করতে পারেনি। নির্বাচনকালীন এবং নির্বাচনপরবর্তী সহিংসতা থেকে দেশের মানুষকে রক্ষা করা যায়নি।   
   এই প্রতিকূলতার মধ্যেও সিপিবিসহ বাম গণতান্ত্রিক জোট তাদের আন্দোলনকে বেগবান করার লক্ষ্যে নির্বাচনী সংগ্রামেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে বাম জোট জানিয়েছে, নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত তাদের অংশগ্রহণের ব্যাপারটি নির্ভর করবে সরকার বা নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের ন্যুনতম পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারছে কিনা তার উপর। এ পরিপ্রেক্ষিতে, ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ না নিয়ে এবার কেন নির্বাচনে বামজোট অংশ নিচ্ছে সে প্রসঙ্গটি নানাভাবে উপস্থাপন করে ক্ষমতাসীন দল একদিকে যেমন ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার দায় এড়াতে চাইছে, অন্যদিকে এবারের নির্বাচনকেও একতরফা নির্বাচনে পরিণত করার সুযোগ খুঁজছে। 

সিপিবিসহ অন্যান্য বাম দল শুধু ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করেছিলো তা নয়। এর আগে ১৯৮৮ সালে এরশাদের আমলের লোকদেখানো নির্বাচন, বিএনপি আমলে ৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে একতরফা নির্বাচন, ইয়াজউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির নির্বাচনও সিপিবিসহ অন্যান্য বাম দল বর্জন করেছিলো। এর মানে এই নয় যে, যেসব নির্বাচনে বাম দলগুলো অংশ নিয়েছিলো, সেসকল নির্বাচন অবাধ-সুষ্ঠু হয়েছে, কালো টাকা-পেশিশক্তিমুক্ত হয়েছে। অবাধ সুষ্ঠু ও অর্থবহ নির্বাচনের জন্য বাম দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রাম করে আসছে। অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি আদায়ের জন্য সংগ্রাম এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ দুটি ভিন্ন প্রশ্ন। মূল লক্ষ্য এবং আন্দোলনকে অগ্রসর করা, শক্তি ভারসাম্য, শ্রেণিসংগ্রাম ও গণআন্দোলনের বাস্তব পরিস্থিতি, জনগণের আকাঙ্ক্ষা ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে কমিউনিস্টরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ বা বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়। 

বুর্জোয়া দলগুলোর মত যেনতেনভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে কমিউনিস্টরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে না, বরং শ্রেণিসংগ্রামকে অগ্রসর করার লক্ষ্যে, গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামকে অব্যাহত রাখতে নিজস্ব নীতি ও কর্মসূচি জনগণের মাঝে প্রচার করার মাধ্যমে জনগণের সমর্থন আদায় করা হলো কমিউনিস্টদের নির্বাচনী সংগ্রামের বৈশিষ্ট্য। সেই বৈশিষ্ট্যকে সমুন্নত রেখে নিজস্ব নীতি ও কর্মসূচি জনগণের কাছে তুলে ধরার ন্যূনতম গণতান্ত্রিক সুযোগের সদ্ব্যবহার কমিউনিস্টদের করতে হয়। 

কমিউনিস্টরা বুর্জোয়া পার্লামেন্টারি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে জানে। শ্রেণিসংগ্রাম, গণআন্দোলনকে স্থগিত রেখে কমিউনিস্টরা পার্লামেন্টারি মোহে আচ্ছন্ন থাকে না। বুর্জোয়া পার্লামেন্টারি ব্যবস্থাকেই জনগণের প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থার চূড়ান্ত রূপ বলে মনে করা এক ধরণের সুবিধাবাদিতা ও প্রদর্শনবাদের জন্ম দেয়। অপরদিকে শ্রেণিসংগ্রামকে অগ্রসর করতে পার্লামেন্টারি ব্যবস্থা কিংবা তথাকথিত গণতন্ত্রের আইনসিদ্ধ সুবিধাগুলোকে ব্যবহার না করার আহাম্মকি নৈরাজ্যবাদের জন্ম দেয়। মার্কসকে স্বাক্ষী মেনে ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’ গ্রন্থে লেনিন এ বিষয়ে লিখেছেন,

‘মার্কসের কাছে বৈপ্লবিক দ্বন্দ্বতত্ত্ব কখনোই শূণ্যগর্ভ কেতাদুরস্ত বুলি, খেলনার ঝুমঝুমি ছিলো না...বিশেষ করে পরিস্থিতি যখন স্পষ্টতই বৈপ্লবিক নয়, তখন বুর্জোয়া পার্লামেন্ট- প্রথার ‘শুয়োরের খোঁয়াড়টাকেও’ ব্যবহার করতে পারার অসামর্থ্যরে জন্যে নৈরাজ্যবাদীদের সাথে কীভাবে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হয় তা মার্কস জানতেন; কিন্তু একই সময়ে তিনি এটাও জানতেন কিভাবে পার্লামেন্ট প্রথাকে সাচ্চা বৈপ্লবিক সর্বহারা সমালোচনার অধীনস্ত করতে হয়।’

কমরেড লেনিন তার ‘বামপন্থী কমিউনিজম-শিশুসুলভ রোগ’ বইটিতে জনগণের চেতনার বিকাশের স্তরকে অনুধাবন না করে পার্লামেন্টারি সংগ্রামে অনিচ্ছুক জার্মান, সুইডিশ, ওলন্দাজ বামপন্থিদের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। স্বল্প পরিসরে এই বিষয়টি এখানে বিস্তারিত আলোচনা করা সম্ভব নয়। নির্বাচন তথা পার্লামেন্টারি ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ বা বর্জন বিষয়ে বলশেভিক পার্টির অভিজ্ঞতাও আমরা উল্লেখিত বইটিতে দেখতে পাই। ১৯০৫ সালের বিপ্লবের সময় ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ পরিস্থিতিতে বলশেভিক পার্টি দুমা নির্বাচন বয়কট করেছিলো, যা লেনিনের দৃষ্টিতে অত্যন্ত সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল, কেননা নির্বাচনের চাইতে শ্রমিক ও মেহনতি জনগণের আগ্রহ ছিলো ধর্মঘট ও বৈপ্লবিক সংগ্রামে। 


পরবর্তীতে এর ধারবাহিকতায় ১৯০৬ সালের নির্বাচন বয়কটকে লেনিন ‘সংশোধনীয় ভুল’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন এবং ১৯০৭-১৯০৮ ও তৎপরবর্তী নির্বাচন বয়কট করাকে লেনিন বলেছেন ‘সবচাইতে মারাত্মক ভুল’। কেননা সেসময়, ‘সংগ্রামের আইনী ও বে-আইনী রূপের সমন্বয় সাধন ছিলো বাধ্যতামূলক, আর এমনকী সর্বাপেক্ষা প্রতিক্রিয়াশীল পার্লামেন্টে এবং প্রতিক্রিয়াশীল আইন-কানুন দ্বারা পরিবেষ্টিত অন্যান্য বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে (পীড়াজনিত কল্যাণ সমিতি ইত্যাদি) অংশগ্রহণ করা বাধ্যতামূলক-এই মতামতকে কঠোরতম সংগ্রামের মধ্যে ১৯০৮-১৪ সালে যদি বলশেভিকরা ঊর্ধ্বে তুলে না ধরতো, তবে সর্বহারাশ্রেণির বিপ্লবী পার্টির মূলকেন্দ্রটিকে তারা রক্ষা করতেও (শক্তিশালী ও বিকশিত করা দূরের কথা) পারত না’।


যান্ত্রিকভাবে এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগেকার রাশিয়ার পরিস্থিতির সাথে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের পরিস্থিতির তুলনা করা নিঃসন্দেহে অনুচিত, তবে সেই অভিজ্ঞতা নির্বাচনী সংগ্রামে অংশগ্রহণ করা বা না করার কমিউনিস্ট রণকৌশল সম্পর্কে আমাদের ধারণা দেয়। জনগণ যখন নির্বাচনে অংশ নিতে উন্মুখ থাকে, কিংবা নির্বাচনী পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে জনগণের কাছে যাওয়ার সুযোগ যখন সৃষ্টি হয়, যখন সংগ্রামের অন্যান্য রূপগুলো পুরোমাত্রায় বিকশিত নয়, তখন ‘সবচাইতে প্রতিক্রিয়াশীল’ নির্বাচনী ব্যবস্থাতেও কমিউনিস্টদের অংশ নিতে হয় বৃহত্তর লক্ষ্য বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে। সেই সাথে ভাত-কাপড়ের সংগ্রাম ও অন্যান্য আন্দোলন, গণতন্ত্রের আন্দোলনকেও এগিয়ে নিতে হয়। ২০১৪ সালে একদিকে আওয়ামী লীগ ও তার জোট যখন যেনতেনভাবে ক্ষমতা ধরে রাখার আয়োজন করছিলো, অপরদিকে বিএনপি-জামাত যখন আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য চালাচ্ছিল সেই সময় নির্বাচনী সংগ্রামের মাধ্যমে জনগণের কাছে নিজস্ব মতামত ও কর্মসূচি নিয়ে যাওয়ার ন্যূনতম সুযোগ ছিলো না। জনগণের মধ্যে সরকারি সন্ত্রাস ও বিরোধী নৈরাজ্যসঞ্চারিত ভীতি, ভোট প্রদানে অনাগ্রহ এবং অধিকাংশ দলের বর্জনের মুখে সেই নির্বাচনে কমিউনিস্টরা অংশ নিলে তা হতো বড় ভুল। 
২০১৪ সালে কমিউনিস্ট-বামপন্থি দল ও সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষ একদিকে যেমন একতরফা নির্বাচন সমর্থন করেনি, অন্যদিকে আন্দোলনের নামে জ্বালাও-পোড়াও-নৈরাজ্যকেও সমর্থন করেনি। একতরফা নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করে বামপন্থিরা নিজেদের স্বতন্ত্র ও নীতিগত অবস্থান থেকে গণতান্ত্রিক পরিসর সৃষ্টির লক্ষ্যে সংগ্রাম করে গেছে। জনগণের সমর্থনবিহীন এই সরকারের এ পর্যায়ে এসে তাই আরেকটি একতরফা নির্বাচন করার সুযোগ নেই। অপরদিকে বিএনপি-জামাতও বুঝতে পেরেছে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারকে উৎখাতের জন্য জনসমর্থন তারা পাবে না।

 এই রকম একটা পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু নির্বাচনের শর্তগুলো অনুপস্থিত থাকলেও নিদেনপক্ষে একটা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের বস্তুগত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এই অবস্থায় জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে কি না, কিংবা ঘোষিত ফলাফলে জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থাকলেও এই পরিস্থিতিতে কমিউনিস্টদের নির্বাচনকে কাজে লাগিয়ে অন্তত বিকল্প কর্মসূচি নিয়ে জনগণের কাছে যাওয়া এবং সংগঠন গড়ে তোলার কাজটিকে অগ্রসর করার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, যার সম্ভাবনা ২০১৪ সালে ছিলো না। একথাও বিবেচনায় নিতে হবে যে, জনগণ এই ভারসাম্যহীন স্বৈরতান্ত্রিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে মুখিয়ে আছে, এবং এর জন্য তারা ন্যূনতম সুযোগ পেলেও ব্যালটের মাধ্যমে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটাবে। একথা স্বীকার করতে হবে যে, এই সময়ে বামপন্থিরা এককভাবে জোরালো গণআন্দোলন বা গণঅভ্যূত্থান গড়ে তোলার মত যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। কালো টাকা-পেশিশক্তির দৌরাত্ম্যে নির্বাচনের মাঠেও বামপন্থিরা অনেকটা প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন হয়। সাংগঠনিক কাঠামো ও দেশব্যাপী তার বিস্তারের জায়গা থেকে, এমনকী ঘাঁটি অঞ্চল তৈরির দিক থেকেও বামপন্থিরা এখনো বেশ দুর্বল অবস্থায় আছে। কিন্তু স্বতন্ত্র অবস্থানে থেকে দ্বি-দলীয় ধারার বিপরীতে বিকল্প গড়ার নীতিনিষ্ঠ রাজনীতির প্রতি এইসময়ে মানুষের শ্রদ্ধা বেড়েছে।


 সিপিবিসহ ৮টি বামপন্থি দল মিলে গঠিত ‘বাম গণতান্ত্রিক জোট’ এসময়ে রাজনীতিতে তার স্বতন্ত্র স্বকীয় অবস্থানকে পূর্বের সময়কার তুলনায় কিছুটা হলেও জনগণের কাছে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য আন্দোলন এবং নির্বাচনী সংগ্রামের পাশাপাশি, বিকল্প কর্মসূচিকে জনগণের কাছে নিয়ে গিয়ে জনগণের আস্থা অর্জনের কাজটিই এখন কমিউনিস্টদের জন্য কর্তব্য। জনগণের আস্থা অর্জনের পাশাপাশি তাদের সমর্থনকে ভোটে রূপান্তর করতে কমিউনিস্টদের নীতিনিষ্ঠ থেকেই যথেষ্ট সৃজনশীল ভূমিকা নিতে হবে।

শুধুমাত্র নির্বাচনে অংশ নিলে, নির্বাচনের ক্যাম্পেইন করলেই বাক্সে ভোট জমা পড়বে না। বাক্সে নিজেদের ভোট জমা করা, কেন্দ্রে কেন্দ্রে ভোটারদের নিরাপত্তা দেয়া, ফলাফল পর্যন্ত ভোট পাহারা দেওয়া কঠিন নির্বাচনী সংগ্রামের অংশ। নির্বাচন সংগঠন সৃষ্টির সুযোগ সৃষ্টি করলেও, সংগঠন আপনা আপনি তৈরি হবে না। নির্বাচনী এলাকায় লেগে পড়ে থেকে সংগঠন গড়ে তুলতে হবে, জনগণকে সংগঠিত করতে হবে। নির্বাচনী ডামাডোলে পুরোপুরি ডুবে না গিয়ে আন্দোলনের বৃহত্তর লক্ষ্যের কথা মাথায় যেমন রাখতে হবে, আবার প্রতিটি ভোটকে অর্জন ও রক্ষা করতে জানকবুল করে নামতে হবে। মনে রাখতে হবে, এইসময়ে দ্বিদলীয় ধারার বিপরীতে বামপন্থি বিকল্পের পক্ষে প্রতিটি ভোট আগামী দিনের সংগ্রামের জন্য সঞ্চিত বারুদের স্তুপ হয়ে ব্যালটবাক্সে জমা হবে।

সময় যতই প্রতিকূলে থাকুক, দীনেশ দাসের ভাষায় জনগণের কাছে বার্তা নিয়ে যেতে হবে-‘বেয়নেট হোক যত ধারালো–/ কাস্তেটা ধার দিও বন্ধু! / শেল আর বম হোক ভারালো / কাস্তেটা শান দিও, বন্ধু।’

শেয়ার করুন

Print Friendly and PDF


মতামত দিন

Developed By -  IT Lab Solutions Ltd. Helpline - +88 018 4248 5222