সর্বশেষ

  বিয়ানীবাজার পৌরসভার উদ্যোগে যথাযথ মর্যাদায় জাতীয় শোক দিবস পালন   বিয়ানীবাজার উপজেলা প্রশাসনের জাতীয় শোক দিবস পালন   ঢাকা মেডিকেল এলাকায় এডিস মশার আবাসস্থল ধ্বংস করলো যুব ইউনিয়ন   এডিস মশা পানিতে ডিম পাড়ে না, জানালেন বিশেষজ্ঞ   রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ছাড়া সবাই রাষ্ট্রের চাকর: হাই কোর্ট   মুসলিমদের গরু কুরবানি দিতে নিষেধ করলেন মন্ত্রী!   বিনা পারিশ্রমিকেই খেলবে জিম্বাবুয়ের খেলোয়াড়রা   সিলেটেও ভয়ঙ্কর রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গু, ২৪ ঘন্টায় নতুন করে আক্রান্ত ৫৩ জন   সুপ্রিয় চক্রবর্তী রঞ্জু আর নেই   যার ফোনে ফেরি ছাড়তে দেরি তিনিই করলেন তদন্ত কমিটি!   মুসলিম নির্যাতনের প্রতিবাদ করায় সৌমিত্র-অপর্ণার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের মামলা   মুসলিম নির্যাতনের প্রতিবাদ করায় সৌমিত্র-অপর্ণার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের মামলা   মশক নিবারণ দফতরের গল্প   প্রাণ-আড়ংসহ ১৪ কোম্পানির দুধ উৎপাদন ও বিপণনে নিষেধাজ্ঞা   দুদক টিম দেখে ৮০ লাখ টাকা পাশের বাসার ছাদে ফেলে দেন ডিআইজি পত্নী

জাতীয়

শতাব্দীকাল পরে বাঙালি বুঝবে তাদের স্বীয় সভ্যতায় বহুকাল আগে একজন ‘হুমায়ুন আজাদ’ এসেছিলেন!

প্রকাশিত : ২০১৯-০৪-৩০ ০১:১৮:৩৯

রিপোর্ট : রহমান বর্ণিল


আমাদের অঞ্চলে সৌন্দর্য অশ্লীল, অসৌন্দর্য শ্লীল। রুপসীর একটু নগ্ন বাহু দেখে ওরা হৈ চৈ করে, কিন্তু পথে পথে ভিখিরিনির উলঙ্গ দেহ দেখে ওরা একটুও বিচলিত হয় না।– হুমায়ুন আজাদ।
সত্যের অন্তর্নিহিত ভাব সুন্দর, কিন্তু সত্য শুনতে সুন্দর হয় না। সত্য শ্রুতিকটু! সত্য বলা মানুষগুলো সাধারনের প্রিয়পাত্র হতে পারে না! বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে বলে সবার মনোরঞ্জন করতে পারে না বলেই, “লোকে কি বলবে” এই ভয়ে সত্য বলা থেকে বিরত থাকে না বলেই এরা মস্ত বড় দুর্নামের বোঝা নিয়ে পৃথিবী ছাড়ে! সক্রেটিসেরও মৃত্যুদন্ড হয়েছিলো! পৃথিবীর ইতিহাসে এমন মানুষের সংখ্যা কম নয়, যারা স্বীয় সময়ে শোষকের চক্ষুশূল হয়েছিলো। সাধারনের অপ্রিয় ছিলো। কারণ সে মানুষগুলো তাদের সময়ের আরো কয়েক শতাব্দী অগ্রিম চিন্তা করেছিলো। তাই জীবদ্দশায় তাদের বুঝতে সক্ষম না হলেও জীবনকাল অতিক্রান্তের এক শতাব্দীকাল পরে হলেও মানুষ তাদের মাথার উপর স্থান দিয়েছে।

যে ঘটনা ভবিশ্যতে ঘটবে সেটা বর্তমানে বসে বলে দেয়াকে বলে ‘জ্যেতিষ’! এটা একপ্রকার গুণবাচক বিশেষণ! কিন্তু যে চিন্তা সাধারনে আরো একশো বছর পরে করবে, সেটা কেউ বর্তমানে করে ফেলা আমাদের দেশে কোন যোগ্যতা বলে বিবেচনা করা হয় না। গুণবাচক বিশেষণ তো সুদূরপরাহত, এরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নাস্তেক, মুর্তাদ বা উন্মাদ বলে দুর্নাম কুড়োই। বাঙালির জীবনে হুমায়ুন আজাদ এমনি এক বিরাট দুর্নামের নাম। হুমায়ুন আজাদের দর্শনকে ‘সভ্য’ মানতে বাঙালির আরো একশো বছর সময় লাগবে। আমি ঠিক এই ‘একশো’ বছরের কথাই বলেছিলাম, যেটা হুমায়ুন আজাদ আগাম চিন্তা করতে সক্ষম হয়েছিলেন।


মজার বিষয় হচ্ছে যে সক্রেটিসকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছিলো, সেই সক্রেটিসকে বর্তমান পৃথিবী পৃথিবীর ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক বলে মানে! সারা পৃথিবী খুঁজলেও আজ সক্রেটিসের একজন হেটার্স খুঁজে পাওয়া যাবে না! শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, ভাষাবিদ, ভাষাবিজ্ঞানী, রাজনীতি বিশ্লেষক বাঙালি সমাজে এত অবদান সত্বেও হুমায়ুন আজাদ তাঁর সময়ে হয়তো খুব বেশি হলে দশ শতাংশ মানুষের প্রিয়পাত্র হতে পেরেছিলেন। সংখ্যাটা এখন ক্ষানিকটা বেড়েছে। শিক্ষিত সমাজের হয়তো বিশ শতাংশ মানুষ এখন বুঝতে পারে হুমায়ুন আজাদরা একটা জাতির ইতিহাসে কালে-ভাদ্রেই জন্মায়। এবং এভাবে একদিন এক শতাব্দীকাল পরে বাঙালি বুঝবে তাদের স্বীয় সভ্যতায় বহুকাল আগে একজন ‘হুমায়ুন আজাদ’ এসেছিলেন! এ জন্যই বোধহয় হুমায়ুন আজাদ নিজেই বলে গিয়েছিলেন- “বাঙালি মুসলমান জীবিত প্রতিভাকে লাশে পরিণত করে, আর মৃত প্রতিভার কবরে জ্বলায় আগরবাতি”!

রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের সংবিধান নাগরিককে মতপ্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা দিলেও বাঙালি সমাজে সেই স্বাধীনতা কেবল প্রথাগত মতাদর্শের বেলায়! প্রথাবিরোধী মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাঙালি সমাজে কেবল কেতাবী’ই! প্রথাবিরোধী একটা বাক্য উচ্চারণ করলে এখনে সমাজ টুঁটি চেপে ধরে, অনুভূতিতে আঘাতের চুতোই রাষ্ট্র দন্ডযোগ্য অপরাধ বিবেচনা করে। শত্রু তৈরী হয় সর্বত্র! এমনকি আপন ঘরেও! এমন শ্বাপদসংকুল সমাজের একজন হয়ে প্রথাবিরোধী হয়ে উঠা ভয়ংকর দুঃসাহসের কাজ। হুমায়ুন আজাদ সেই দুঃসাহস দেখাতে পেরেছিলেন। ধর্মের চাদরে জড়িয়ে এখানে একজন মানুষ চরম অধর্ম করে বেড়ালেও সেটা নিয়ে কেউ কথা বলে না, কিন্তু ধর্মান্ধ মুক্ত চিন্তা প্রসূত হয়ে পরম মানবিক কাজেও এখানে শত্রু তৈরী হয়। এ সম্পর্কে হুমায়ুন আজাদের যৌক্তিক একটা উক্তি আছে- “মহামতি সলোমনের নাকি তিন শো পত্নী, আর সাত হাজার উপপত্নী ছিলো। আমার মাত্র একটি পত্নী। তবু সলোমনের চরিত্র সম্পর্কে কারো কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু আমার চরিত্র নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন।” কথাটি হুমায়ুন আজাদের। ভেবে দেখুন তো, কি নিরেট সত্য কথা! ঠিক এরকম ঠোঁটকাটা স্বভাবের কারণেই হুমায়ুন আজাদ সাধারণের চক্ষুশূল হয়েছে! আর এখানেই হুমায়ুন আজাদ অন্য সবার থেকে আলাদা।

সবাইকে তোয়াজ করে, সর্বমহলের মাথায় তেল মর্দন করে, মিনমিনে প্রেমের নাটক-নভেল লিখে সাধারণের বাহবা কুড়িয়ে একটা নির্ঝঞ্চাট জীবন পার করে দেয়া যায়। কিন্তু সেটা ব্যক্তি লেখকের জন্য ভালো হলেও সভ্যতার জন্য হিতকর নয়। সমাজটা নিজের জন্য শ্বাপদসংকুল হবে জেনেও হুমায়ুন আজাদ বাঙালির ঘূণে ধরা সভ্যতা মেরামতের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। প্রথা যখন ভাঙে তখন সর্বমহলে গেলো! গেলো! জাত গেলো! বলে একটা শোরগোল উঠে, কিন্তু সময়ের শেষপ্রান্তে প্রথা ভাঙার সুফল সমাজই ভোগ করে। হুমায়ুন আজাদ নিজের জীবন দিয়ে সমাজ সংস্কারের কাজ করে গেছেন। “স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেস্ত” এই মধ্যযুগীয় পুরুষতান্ত্রিক মতবাদ বিরোধী আজকের নারী প্রজন্ম হুমায়ুন আজাদের কর্মময় জীবনের সুফল! হুমায়ুন আজাদের বলেছিলেন- গত দু-শো বছরে গবাদিপশুর অবস্থার যতোটা উন্নতি ঘটেছে নারীর অবস্থার ততোটা উন্নতি ঘটে নি। কি অসাধারণ মুল্যবোধ আর গভীর উপলব্ধি থাকলে বলতে পারা যায়- “পুরুষতান্ত্রিক সভ্যতার শ্রেষ্ঠ শহীদের নাম মা।”

“বাঙলাদেশ অমরদের দেশ। এ-দেশের প্রতি বর্গমিটার মাটির নিচে পাঁচজন ক’রে অমর ঘুমিয়ে আছেন।” হুমায়ুন আজাদ কথাটি বলেছিলেন বাংলার মুক্তির সংগ্রামের শহীদদের উদ্দেশ্য করে। হুমায়ুন আজাদের কথাটির সাথে যোগ করে বলতে পারি- ৭১এর এই বাংলা প্রগতিশীল বাঙালির দেশ। এখানকার ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল মাটি পরম মমতায় একজন হুমায়ুন আজাদকে বুকে ধারণ করে রেখেছে!

আজ  হুমায়ুন আজাদের জন্মদিন। প্রগতিশীল বাঙালি প্রজন্মের পক্ষ থেকে বাঙালির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানের জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা।

শেয়ার করুন

Print Friendly and PDF


মতামত দিন

Developed By -  IT Lab Solutions Ltd. Helpline - +88 018 4248 5222