সর্বশেষ

  আসামের রাষ্ট্রহীন মানুষ কোথায় যাবে   ঝাড়খন্ড থেকে আমদানি হবে বিদ্যুৎ   বাষট্টির আন্দোলনের স্মৃতিকথা   শিক্ষা দিবসের ৫৭ তম বার্ষিকী আজ   আমাদের বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে: রাব্বানী   নাটোরে যুবলীগ নেতার বিরুদ্ধে অফিসে আটকে শ্রমিককে মারধরের অভিযোগ   ইয়াবাসহ গ্রেফতার সেই ৫ পুলিশ সদস্য রিমান্ডে   নতুন ভিডিও প্রকাশ, মিন্নীই রিফাতকে হাসপাতালে নেন   দেশজুড়ে ছাত্রলীগ ও প্রশাসনের সম্পৃক্ততায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির ঘটনায় প্রগতিশীল ছাত্রজোটের সংবাদ সম্মেলন।   বিয়ানীবাজারে গাছের সাথে এ কেমন শত্রুতা!   ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি ফেরাতে চান নতুন নেতারা   ইমরান এইচ সরকারের ওপর হামলা মামলার প্রতিবেদন ২৩ অক্টোবর   সৌম্য বাদ, ফিরলেন রুবেল-শফিউল   যারা অবৈধভাবে ক্ষমতায় আসে তারা দেশের উন্নতি চায় না: প্রধানমন্ত্রী   ঢাকসু থেকে রাব্বানীর পদত্যাগ করা উচিত: নুর

সিলেট

শেষ বিদায়! কমরেড সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ

প্রকাশিত : ২০১৯-০৬-০২ ০১:৩৩:১৩

রিপোর্ট : মোহাম্মদ মনির উদ্দিন



ঊনত্রিশ জুন গভীররাত একটা দশ মিনিটে হঠাৎ সেলফোনে ক্ষুদে বার্তার শব্দ কানে বাজে।ফোন হাতে নিয়ে পড়তে থাকি।বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি সিলেটের সাধারণ সম্পাদক কমরেড আনোয়ার হোসেন সুমন এই বার্তাটি প্রেরণ করেন।গভীর রাতের বার্তা সাধারণত ভালো হয় না।হলোও তাই।’কমরেড গভীর শোকের সাথে জানাচ্ছি সিপিবি’র সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য আমাদের প্রিয়নেতা ও অভিভাবক কমরেড সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ কিছুক্ষণ পূর্বে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন।’ ঘুম ঘুম ভাবাবস্থায় এই সংবাদ পড়ে মনটা বিষণ খারাপ হয়ে যায়।বড়ো দু:সংবাদ!মেনে নিতে কষ্ট হয়।মৃত্যু!সবারই জীবনাবসান হবে।এই সত্য বড়ো নিষ্ঠুর,নির্মম ও বেদনার।এরপরও মেনে নিতে হয়।একে একে চলে যাচ্ছেন।আজ কমরেড আবু জাফর আহমেদ অন্যদিন হয়তো অন্যকেউ।নিজেকে সামলে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাইন ইন করি।আদর্শিক এই নেতার প্রয়াণে শোক প্রকাশ করেছেন।মৃত্যু সংবাদ নিয়ে যারা লিখেছেন, সেইগুলো পড়তে থাকি।ভাবতে থাকি।আহারে জীবন!এতো কম সময়ের মানবজীবন!জীবন আরও দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ হোক।বিজ্ঞানের অগ্রসরতায় হয়তো একদিন অনেক কিছুই সম্ভব হবে।সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ তাঁর এই স্বল্প জীবন,মানবমুক্তির মহান আদর্শে আজীবন অবিচল থেকে বিলিয়ে দিয়েছেন।এই জীবন কতজনের হয়!আদর্শিক অবস্থান থেকে তিনি সফল এক রাজনীতিক।প্রিয়নেতা তোমাকে লালসালাম!
 শেষ বিদায় ও শ্রদ্ধা জানাতে বাসযোগে সিলেটের নাইওরপুল পয়েন্ট থেকে মৌলভীবাজারে আমরা রওয়ানা দেই।১১টার পূর্বে মৌলভীবাজার পার্টি কার্যালয়ে পৌঁছি।মৃত্যু পরবর্তী আনুষঙ্গিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে সিলেটে ফিরে আসি।দৈহিকভাবে চলে যাওয়া মার্কসবাদী তাত্ত্বিক,সরাসরি গণমানুষের সাথে সম্পৃক্ত এমন নেতা সিলেট অঞ্চল তথা বাংলাদেশেই বর্তমানে একেবারেই কম।তাঁর মতোখাঁটি নেতার আজ বাংলাদেশে খুবই অভাব।বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা বিনির্মাণে কমরেড সৈয়দ আবু জাফর আহমদের মতো সাচ্চা কমিউনিস্ট নেতার বড়ই প্রয়োজন।

সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ ২৮ মে ২০১৯ দিবাগত রাত সাড়ে ১২টায় ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।সকাল ১০টায় কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তাঁর মরদেহ নিয়ে আসা হয়।শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে লাশবাহী গাড়ী মৌলভীবাজার আসে।পরিবারের লোকজন দেশের বাইর থেকে আসবেন বলে লাশ হিমাগারে রাখা হয়।আজ ০১জুন শনিবার সকাল ১০টায় মরদেহ তাঁর বাসভবনে আনা হয়।১১টায় মৌলভীবাজার জেলা কমিউনিস্ট পার্টি অফিসে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন ও শহরে শোকরেলি শেষে বেলা ১১টা -০১টা ৩০মিনিট পর্যন্ত শবদেহ শহীদমিনারে রাখা হয়।মৌলভীবাজার কেন্দ্রীয় শহীদমিনারে সর্বস্তরের জনসাধারণ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। বেলা ০২টায় মৌলভীবাজার শাহ মোস্তফা কেন্দ্রীয় ঈদগাহে জানাযাশেষে,শাহ মোস্তফা মাজার সংলগ্ন কবরস্থানে তাঁর মরদেহ সমাহিত করা হয়।

কমরেড সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ আজীবন সাম্যবাদী আন্দোলনের এক লড়াকু জননেতা।সারাজীবন মানুষের প্রকৃত মুক্তির জন্যে কাজ করেছেন,লড়াই করেছেন।আপস করেন নি,মাথানত করেন নি।ব্যক্তিগত লাভালাভের জন্যে আদর্শচ্যুত হন নি।মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের এই খাঁটিনেতা ১৯৫৪ সালের ১১ জুলাই মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।বাবা সৈয়দ মনোয়ার আলী এবং মা সৈয়দা আমিরুন্নেসা খাতুন।ছাত্রবস্থায় তিনি প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। নেতৃত্ব দেন।তিনি ১৯৭০ সালে মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের সাহিত্য সম্পাদক,পরবর্তীতে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।এছাড়া ছাত্র ইউনিয়ন মৌলভীবাজার জেলা সংসদের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বপালন করেন।দেশমাতৃকার টানে ১৯৭১ সালে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মাত্র ১৬ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।মহান মুক্তিযুদ্ধে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ গেরিলাবাহিনীর একজন সম্মূখসমরের অকুতভয়যোদ্ধা হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

চা-বাগানের শ্রমিক হত্যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে ১৯৭২ সালে তিনি প্রথম কারাভোগ করেন। জেল থেকে মুক্ত হওয়ার পরে ১৯৭৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পুনরায় গ্রেপ্তার হন। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়ে বিনাবিচারে দীর্ঘ ০১ বছর কারাপ্রকোষ্টে থাকেন।

সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ দর্শন শাস্ত্রে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।একই বিষয়ে উচ্চতর পড়াশোনার জন্যে তিনি ১৯৭৯ সালে জার্মানিতে যান।শিক্ষাশেষে যথারীতি জার্মানি থেকে দেশে চলে আসেন।মানবমুক্তির লড়াইয়ে তিনি নিজেকে নিবেদিত করে রাজনীতিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন।শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্যে জীবনভর নিজেকে সমর্পিত রেখেছেন।

স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন।বাংলাদেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে স্বৈরচারবিরোধী গণআন্দোলন-সংগ্রামে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।ফলে স্বৈরচারী সরকারের রোষানলে পড়ে কয়েকবার গ্রেপ্তার হন।কারাবরণ করেন।নির্যাতনের শিকার হন।

ছাত্রবস্থাতেই রাজনীতির পাশাপাশি তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৯০ সাল থেকে মৌলভীবাজারের অধুনালুপ্ত জনপ্রিয় সাপ্তাহিক মনুবার্তার সম্পাদক-প্রকাশক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। গণমানুষের মুক্তি ও চেতনাগত পরিবর্তনের জন্যে আজীবন কাজ করেছেন।অর্থাৎ রাজপথ ও আদর্শিক লেখার মাধ্যমে সমান ক্রিয়াশীল ছিলেন।

তিনি ২০১২ সালের ১১ থেকে ১৩ অক্টোবরে অনুষ্ঠেয় দশম কংগ্রেসে সিপিবি’র সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরে আবারও ২০১৬ সালের ২৮-৩১ অক্টোবরে অনুষ্ঠেয় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি’র একাদশ কংগ্রেসে দ্বিতীয়বারের মতো সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। শারিরীক অসুস্থতার কারণে ২০১৭ সালের ২৬-২৮ মে অনুষ্ঠেয় দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় তার অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব থেকে তাকে অব্যহতি দেয়া হয়। কমরেড সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে যতোদিন ছিলেন,ততোদিন যথাযথভাবেই অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছেন।তিনি আমৃত্যু সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

(লেখক : মোহাম্মদ মনির উদ্দিন, আইনজীবি)

শেয়ার করুন

Print Friendly and PDF


মতামত দিন

Developed By -  IT Lab Solutions Ltd. Helpline - +88 018 4248 5222