Advertise
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০০:৪৫
অন্ধের ছুঁয়ে দেখা কাকে বলে? সে অনুভূতির নাম কি শূন্যতা? একজন অন্ধ মানুষের ছুঁয়ে দেখার প্রতিটি স্পর্শে তীব্র হয়ে থাকে তার অনুভব। সে চিনতে চায় রাত্রির শরীরে ফিসফিস করে কথা বলে যাওয়া হাওয়ার শব্দ, সে ছুঁয়ে ছুঁয়ে বুঝতে চায় তার মনের মধ্যে মরুভূমি অথবা সমুদ্রে বিড়বিড় করে ওঠা হাজার বছরের পুরোনো, মৃত মানুষদের কথামালা।
আমরাই কি তাহলে অন্ধ? একটি শতাব্দী পার হয়ে এসে মনের মধ্যে শূন্যতার কাঠামোতে হাত রাখছি অন্ধ মানুষের মতো?
শূন্যতা কাকে বলে? এক মৃত কুয়ার পাশে দাঁড়িয়ে তলদেশ থেকে তুলে আনা শুধু নৈঃশব্দ্যই কি শূন্যতা নাকি আরও ভারী নৈঃশব্দ্যে জেগে থাকা কারও মুখ, কারও চোখ অথবা সমস্ত শরীর? একটি অবয়ব। অস্পষ্ট অথচ কী প্রবল! শূন্যতাকে আমরা কি দেখতে পাই? পাতা ঝরে পড়া হেমন্তে কোনো অরণ্যে বিশুষ্ক অনুভূতির মতো, গ্রামে শুকিয়ে যাওয়া কোনো পুকুরে ভেসে ওঠা নৌকার শরীরে গত বছর পুরোনো হয়ে যাওয়া নদীর জলের দাগের মতো, কখনও আর চিঠির উত্তর না আসা কোনো পোস্ট অফিসের বারান্দায়?
শূন্যতা কি সেখানে নিমগ্ন এক মৎস্যশিকারির মতো বসে থাকে, সেখানে তার অপেক্ষার জাল ফেলে? সেই জালটাকে দেখা যায়?
না, দেখা যায় না। শুধু তাতে ক্রমশ জড়িয়ে যাওয়া টের পাওয়া যায়। যেন আমি কবে এক রুপালি মাছ হয়েছিলাম ক্লান্তিতে জড়িয়ে যাব বলে।
শূন্য আসলে কী? শূন্যতার অনুভূতি কি মহাকাশে ছড়ানো হাহাকারে মোড়া ছয়টি নক্ষত্র, ভীষণ ব্যর্থ কারও মুখ? জনময়তা থেকে জনশূন্যতার ভিতরে বাঁচা এক অদ্ভুত বোধ; যা আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে ...
বহুকাল আগে জীবনানন্দ দাশ দেখতে পেয়েছিলেন সেই অনুভূতি? তাঁকে কি ক্লান্ত করেছিল সেই বোধ?
তাঁর কবিতার বিবরণ অনুযায়ী লাশকাটা ঘরে একা শুয়ে ঘুমায় শূন্যতা। এটুকু লিখে থমকে গেলাম। এটা কি গভীর এক যতি চিহ্নসহ কোনো বক্তব্য নাকি আরও বড় কোনো প্রশ্নবোধক চিহ্ন; যা বেঁচে থাকে আমাদের জীবনে; ক্লান্ত করে আমাদের?
প্রতিদিন বাস থেকে নামতে নামতে আমাদের বয়স বেড়ে যায়। কোনো এক কবি লিখেছিলেন একদা। এই ভিড়ের ভিতরে, প্রতিদিনের জীবনের মধ্যে লুকিয়ে থাকে শূন্যতা। হঠাৎ একদিন দেখা হয়ে যায় আমাদের। শূন্যতার অনুভূতি কি আসলে মানুষেরই প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী? তার নিজের সত্তার ভিতরে পরাস্ত এক বোধ?
শূন্যতাকে দেখা যায় না। গভীরে তার নড়াচড়া টের পাওয়া যায় শুধু। শূন্যতার অনুভূতি বরাবরই মনে হয় ভীষণ এক মানসিক বিপ্লব। রাজনীতির মতো মনের পাশার দানও পাল্টে যায়। কখনও এক লহমায় পাল্টে যায় আবার কখনও ধীরে সে আসে। একটি শুঁয়োপোকার মৃত্যুর পর কতটা দুঃখ থেকে একটা প্রজাপতির জন্ম হয় তা কি কেউ জানে! ডানা মেলাও কখনও ক্যালেন্ডারে দাগ দেওয়া কোনো দিনের মতো বিষাদ বহন করে।
‘‘অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়”
আরও এক বিপন্ন বিস্ময় ...’’
এই আরও এক বিপন্ন বিস্ময়-ই কি তাহলে শূন্যতার বোধ; যা আচমকা এসে হাজির হয়? তোমাদের বলা হয়নি কোনোদিন মাঝরাতে একা হেঁটে বাড়ি ফেরার পথে কোনো গাছের আড়াল থেকে অদ্ভুত স্বরে প্যাঁচা ডেকে উঠলে মনের মধ্যে শূন্যতা তৈরি হয়।
প্যান্টের বাম পকেটে রাখা অভ্যস্ত রুমাল হারিয়ে গেলে নিজেকে শূন্য মনে হয়, খুব বৃষ্টির ভিতরে নড়ে উঠে চলে যাওয়া ট্রেনের জানালায় চেনা কারও অস্পষ্ট মুখ জানিয়ে দিয়ে যায়, শূন্যতা একেই বলে। আর কোনোদিন দেখব না তার মুখ, তাই হয়তো শোক দিবস ঘোষণা করে এত বৃষ্টি নামে পৃথিবীতে, আমাদের এই মফস্বল স্টেশনে আবারও। পুরোনো গানের চেনা সুর বারবার কেটে যেতে থাকে ভাঙা পিনে বাজানো জীবনের রেকর্ডে। শূন্যতা অদ্ভুত সব রঙে আঁকা গল্পের জন্ম দেয় মানুষের জীবনে।
যে রঙের ব্যাখ্যা পিকাসোর প্যালেটে গুলিয়ে গিয়ে অন্য কিছু হয়ে ওঠে। ব্যর্থতার রং কোনটা, মানুষ কখনও আবিষ্কার করতে পারেনি। হতাশার রং, দুঃখের রং কেন নীল বলে প্রচারিত হলো, তারও কোনো যথার্থ ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায়নি। আর তা ব্যাখ্যা করা যায়নি বলেই কি শূন্যতার বোধ আমাদের কাছে অচেনা প্রতিবেশীর মতো? যদি ফিরে যাওয়া যায় আলবেয়ার কামুর উপন্যাসে প্লেগ মহামারি আক্রান্ত সেই ওরান শহরে– যেখানে ভয়, একাকিত্ব আটকে পড়ার অনুভূতি ক্লাসট্রোফোবিয়া তৈরি করেছে শূন্যতার বোধ। মারাত্মক প্লেগ রোগ ছড়িয়ে পড়া সেই শহরে কেউ ভয়ের কাছে আত্মসমর্পণ করছে, কেউ অদৃষ্টকে অভিশাপ দিচ্ছে আর গুটিকয় ভয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে। কবি শঙ্খ ঘোষের ‘বলিনি কখনো?’ কবিতাটি লেখার সূত্রপাত কি তাহলে কামুর প্লেগ উপন্যাসের সেই ভয় জাগিয়ে তোলা অদ্ভুত শূন্যতার বোধ থেকেই?
‘‘শূন্যতাই জানো শুধু? শূন্যের ভিতরে এত ঢেউ আছে
সে কথা জানো না?’’
শূন্যের বোধের ভিতরে কবি ঢেউ টের পেলেন? যখন সব শেষ হয়ে যায়, মানুষের চেনা মুখ বদলে যায়, সমাজ, রাজনীতি সব উল্টেপাল্টে গিয়ে ছত্রখান হয় পাশার দান তখন সেই ছত্রভঙ্গ ক্যানভাসে ঢেউয়ের ছবি কোন রঙে আঁকা হয়? কবিতার গভীর থেকে তাই কবি নিঃশব্দের মতো প্রশ্ন ভাসিয়ে দিয়ে জানতে চান, শূন্যের ভিতরে এত ঢেউয়ের কথা তার মতো আর কারা জানে?
ফরাসি কবি জাঁ আরতুর র্যাঁবো তো নিজের কিশোর বয়সে কবিতায় চিৎকার করে বলেছিলেন:
আমি নৈঃশব্দ্যকে লিখেছি, আমি রাত্রিকে লিখেছি। আমি অপ্রকাশ্যকে প্রকাশ করেছি।
সেই কিশোর কবি কি নৈঃশব্দ্যকে লিখে ফেলে ধরতে পেরেছিলেন ক্লান্ত আর ভীতিকর সব শূন্যতার বোধ? কবি স্তেফান মালার্মের মতো কবিও যখন লেখেন, ‘‘হায়, কী বিষণ্ণ মাংস’’! তখন জীবন্ত মানুষকেই তো মৃত বলে মনে হয়। মনে হয় বিষাদে মাথা নিচু করে থাকা সব মৃত আত্মা ভেসে চলেছে মরুভূমির বাতাসে ভর দিয়ে। ঠিক তখন শঙ্খ ঘোষের কবিতার লাইন ছিটকে মাথার ভিতরে ঢুকে পড়ে:
বলিনি কখনও?
আমি তো ভেবেছি বলা হয়ে গেছে কবে।
এভাবে নিথর এসে দাঁড়ানো তোমার সামনে
সেই এক বলা ...
সব কথা বলে ফেলার পরও কিছু অব্যক্ত থেকে যায়। খোলা দরজার চৌকাঠের কাছে এসে নতমুখে দাঁড়িয়ে থাকে কখনও কয়েকটি শব্দ, সামান্য ঘ্রাণ আর দু-একটি দৃশ্য। সেই যে অন্ধের ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখার কথা বলছিলাম শুরুতে? তারই মতো হাতড়ে কিছু একটা কিছুর খোঁজ চলে তখন যা হয়তো এত দিন ধারণারও অতীত ছিল। কামু তার ‘ফার্স্ট ম্যান বইতে শূন্যতার অনুভূতিকে এক ধরনের মৃত্যুর সঙ্গে তুলনা করেছেন। মৃত্যু তো সংযোগহীনতা এই সবকিছুর সঙ্গে। পৃথিবীর সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে, ভিড়ের সঙ্গে কথার সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অন্তহীন অন্ধকার অধ্যায়। শূন্য হয়ে যাওয়ার গল্প মানুষকে এনে দাঁড় করায় এক খাদের কিনারায়। তারপর হাওয়ার রাজত্ব, শূন্যতার সেনাপতি শাসন করে সবটুকু। কিন্তু তার পরেও কি কিছুই থাকে না? ওই যে, শূন্যতার ভিতরে ঢেউ থাকে। জলের কিনারে থাকা নিচু জবা কীভাবে তাকাল এতদিন, তা ফিরে ভাবতে হয়। কোথায় একটা ফিরে আসার গল্প খাদের কিনারায় দাঁড়ানো পতনোন্মুখ মানুষের শরীরের ভারসাম্য ঠিক করে দেয়।
১৯৩০ সালের এপ্রিল মাসে কপালে গুলির রাজটিকা এঁকে মেঝেতে পড়ে আছেন কবি মায়াকভস্কি। একটা চিঠি লিখে রেখে গিয়েছিলেন কবি। ছোট্ট কিন্তু কী ভীষণ ঢেউ আছড়ে পড়েছিল কয়েকটি লাইনে। স্ত্রী আর প্রেমিকা লিলিয়ার উদ্দেশ্যে একটিই কথা লিখেছিলেন: ‘‘আমাকে ভালোবেসো’’।
মায়াকভস্কি আত্মহত্যা করার পর এই টিঠিটাও তো শূন্যতার ভিতরে সেই ঢেউ হয়ে রয়ে গেল। নিজেকে এক বৃহৎ শূন্য ভেবে নিয়ে রিভলবারের ট্রিগার টেনে দেওয়ার পরেও ভালোবাসতে বলার কথাটায় কী ভীষণ এক ঢেউ হয়ে রয়ে গেলেন কবি। একটা ছোট্ট চিঠি ঢেউ ভাঙতে ভাঙতে তাকে নিয়ে ভাসতে শুরু করল কালের সীমানার দিকে। কবিতাটা বহুবার পড়া। আবারও পড়তে পড়তে মনে হলো শঙ্খ ঘোষ কি ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বরের কোনো এক শীত জড়ানো সকালে এটা লিখেছিলেন যখন ঢাকার পিজি হাসপাতালে কবি আবুল হাসানের নিথর মৃতদেহের ওপর কান্নায় ভেঙে পড়ছেন আরেক কবি সুরাইয়া খানম? কবিদের ভালোবাসার গল্প এসে শেষ হয় হাসপাতালের বিছানায়। তখন গভীর শূন্যতার ভিতরে সেই কান্নার ভিতরে বহু ঢেউ জেগে উঠেছিল?
চলে যাওয়ার পর ভাবতে থাকি কতটা ছিল? আবুল হাসান লিখেছিলেন:
চলে গেলে তবু কিছু থাকবে আমার ...
এটুকুই আসলে সেই অদৃশ্য ঢেউ; যা শঙ্খ ঘোষের চেতনায় ফুটে উঠেছিল। জানি না কবিতাটি ডিসেম্বরে লেখা হয়েছিল কি না? তবু হয়তো সব ফেলে চলে যাবার পরেও কিছু মানে থেকে যায় হেমন্তে পাতাঝরা অরণ্যের। অলস জলের ওপর ভেসে ওঠা নৌকার কাঠামো মনে রাখে একটা সম্পূর্ণ বর্ষাকালের স্মৃতি, মরে যাওয়া কুয়া কোনো রাত্রিবেলা নৈঃশব্দ্যকে। তবু দেহহীন উপস্থিতির চেয়ে আর কোনো দীর্ঘতর যবনিকা নেই। জীবনের ঢেউ শূন্যতার মাঝে থাকে; ফেরায় আমাদের ধুধু মাঠের কোনো কৃষকের মতো। আবার আমরা জল ঢালি শেকড়ে। চলে যেতে যেতে বলি, তবু কিছু থাকবে আমার। আমার কোনো আক্ষেপ নেই রাত হয়ে যাবে বলে।
অন্ধ মানুষ কাকে ছুঁয়ে বেঁচে থাকতে চায়? তারা কার দেহ, কার জীবনের স্রোত ছুঁয়ে বাঁচে?