আজ শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ইং

Advertise

ফিচার

নিউজ ডেস্ক

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২১:২৫

মোতাহের হোসেন চৌধুরী ও ক্লাইভ বেলের সভ্যতা-ভাবনা

‘ধর্ম সাধারণ লোকের কালচার, আর কালচার শিক্ষিত, মার্জিত লোকের ধর্ম।’ মোতাহের হোসেন চৌধুরীর এই বাক্য বাংলাভাষী পাঠকের কাছে প্রায় প্রবচনের মর্যাদা পেয়েছে। পাঠ্যবইয়ের পাতা থেকে আলোচনাসভার মঞ্চ পর্যন্ত এত বার এটি উচ্চারিত হয়েছে যে এর ধার অনেকখানি ক্ষয়ে গেছে। কোনো উদ্ধৃতি একবার প্রবচন হয়ে উঠলে তাকে আর কেউ জেরা করে না। শ্রোতা সম্মতিতে মাথা নাড়েন, বক্তা পরের প্রসঙ্গে চলে যান। একটু থেমে পড়লেই কিন্তু বাক্যটির ভেতরে এক অস্বস্তিকর বিভাজনরেখা চোখে পড়ে। এক পাশে ‘সাধারণ লোক’, অপর পাশে ‘শিক্ষিত, মার্জিত লোক’। প্রথম দলের ভাগে ধর্ম, দ্বিতীয় দলের ভাগে কালচার। তাহলে কি সংস্কৃতির অধিকার বিদ্যায়তনের সনদের সঙ্গে বাঁধা?

প্রশ্নটির মীমাংসা খুঁজতে হলে বাক্যটিকে তার উৎসের কাছে ফিরিয়ে নিতে হয়। মোতাহের হোসেন যে চিন্তাপরম্পরার ভেতরে থেকে সংস্কৃতির সংজ্ঞা নির্মাণ করেছেন তার প্রধান এক ধারা এসেছে ইংরেজ শিল্পসমালোচক ক্লাইভ বেলের কাছ থেকে। বেলের ‘সিভিলাইজেশন’ (১৯২৮) তিনি বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন ‘সভ্যতা’ নামে। দুই লেখককে পাশাপাশি রেখে পড়ার প্রবণতা অবশ্য আমাদের সমালোচনাসাহিত্যে বিরল। অথচ এই যুগল-পাঠেই ধরা পড়ে বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের এক মনস্বী প্রতিনিধি লন্ডনের ব্লুমসবেরি গোষ্ঠীর অভিজাত সভ্যতাতত্ত্ব থেকে কী গ্রহণ করলেন, কী বর্জন করলেন, আর কোন বিন্দুতে এসে ‘সংস্কৃতি কার’ প্রশ্নটি অমীমাংসিত থেকে গেল সেই প্রশ্ন।

মোতাহের হোসেন চৌধুরীর জন্ম ১৯০৩ সালের ১ এপ্রিল, তৎকালীন নোয়াখালী (বর্তমান লক্ষ্মীপুর) জেলার রামগঞ্জের কাঞ্চনপুর গ্রামে। কুমিল্লায় বিদ্যালয় ও কলেজে পড়াশোনার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর উপাধি লাভ করেন। জীবিকা ছিল শিক্ষকতা, দেশভাগের আগে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে, দেশভাগের পর চট্টগ্রাম কলেজে। ১৯৫৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামেই তাঁর জীবনাবসান ঘটে। এ বছর সেই প্রয়াণের সাত দশক। বিস্ময়ের বিষয়, জীবদ্দশায় তাঁর একটি গ্রন্থও মুদ্রিত হয়নি। যে ‘সংস্কৃতি কথা’ আজ তাঁর পরিচয়ের প্রধান অবলম্বন, সেটিও মরণোত্তর প্রকাশনা।

কালচার কি শিক্ষিতের একচেটিয়া ধর্ম? উত্তর হলো ‘না’। মোতাহের হোসেনের বাক্যটিকে সংস্কৃতির সংজ্ঞা হিসেবে না পড়ে অসম সমাজের রোগনির্ণয় হিসেবে পড়াই সংগত। যে সমাজে শিক্ষা ও অবকাশ অসমভাবে বণ্টিত সেখানে সংস্কৃতির রূপগুলোও অসমভাবে বণ্টিত হয়। এই সত্য সমাজতাত্ত্বিক কিন্তু শাশ্বত নয়
মোতাহের হোসেন চৌধুরীর মননের ভিত রচিত হয়েছিল ঢাকার মুসলিম সাহিত্য-সমাজের পরিমণ্ডলে। ১৯২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনের বার্ষিক মুখপত্র ‘শিখা’র প্রতিটি সংখ্যায় মুদ্রিত থাকত এই বাক্য— ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’। আবুল হুসেন, কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন প্রমুখের উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনের সঙ্গে মোতাহের হোসেন চৌধুরীও যুক্ত ছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ ও প্রমথ চৌধুরীর গদ্য তাঁর মানসগঠনে যেমন ছাপ রেখেছে তেমনি ছাপ রেখেছেন দুই ব্রিটিশ চিন্তক বার্ট্রান্ড রাসেল ও ক্লাইভ বেল। দুজনের সঙ্গেই তাঁর সম্পর্ক অনুবাদের সূত্রে গাঁথা। রাসেলের ‘দ্য কনকোয়েস্ট অব হ্যাপিনেস’ তাঁর হাতে হয়েছে ‘সুখ’, বেলের ‘সিভিলাইজেশন’ হয়েছে ‘সভ্যতা’।

‘ধর্ম সাধারণ লোকের কালচার, আর কালচার শিক্ষিত, মার্জিত লোকের ধর্ম। কালচার মানে উন্নততর জীবন সম্বন্ধে চেতনা–সৌন্দর্য, আনন্দ ও প্রেম সম্বন্ধে অবহিতি। সাধারণ লোকেরা ধর্মের মারফতেই তা পেয়ে থাকে। তাই তাদের ধর্ম থেকে বঞ্চিত করা আর কালচার থেকে বঞ্চিত করা এক কথা।’

উদ্ধৃতির শেষ বাক্যটি বেশির ভাগ সময় বাদ পড়ে যায় যদিও বক্তব্যের ভারকেন্দ্র সেখানেই। মোতাহের হোসেন এখানে সাধারণ মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে তুচ্ছ করছেন না। যাঁরা বিকল্প কিছু না দিয়েই জনসাধারণের জীবন থেকে ধর্ম সরিয়ে দিতে চান বাক্যটি তাঁদের উদ্দেশে এক ধরনের সতর্কবাণী। ধর্ম এখানে মাধ্যমমাত্র। লেখকের ভাষায় ‘মারফত’। যে গন্তব্যে শিক্ষিত মানুষ পৌঁছান সাহিত্য আর শিল্পের পথ ধরে, সাধারণ মানুষ সেখানে পৌঁছান ধর্মের পথে। এই পাঠে দুই ভিন্ন জনগোষ্ঠীর জীবনে ধর্ম ও কালচারকে একই দায়িত্ব অর্পণ করে। দায়িত্ব অভিন্ন হলেও মর্যাদা কিন্তু অভিন্ন নয়। অন্যত্র মোতাহের হোসেন দুই পথের মধ্যে স্পষ্ট তারতম্য নির্দেশ করেছেন।

‘ধার্মিকের জীবন নিয়ন্ত্রণ করে ভয় আর পুরস্কারের লোভ। সংস্কৃতিবান মানুষের জীবনে ওসবের বালাই নেই। তারা সবকিছু করে ভালোবাসার তাগিদে।’

এই বিচারে ধর্ম পরনির্ভর নৈতিকতার প্রতিরূপ যার চালিকাশক্তি বাইরে থেকে আসা দণ্ডের আশঙ্কা ও প্রাপ্তির প্রলোভন। সংস্কৃতি স্বাধীন নৈতিকতার প্রতিরূপ যার উৎস অন্তরের অনুরাগ। কান্টের পরিভাষা ধার করলে প্রথমটি পরশাসিত আর দ্বিতীয়টি স্বশাসিত। নিচের স্তরে ভয় ও লোভে চালিত ধর্ম ওপরের স্তরে ভালোবাসায় চালিত কালচার। সংস্কৃতির ইতিবাচক সংজ্ঞাও তিনি দিয়েছেন সহজভাবে, ‘সংস্কৃতি মানে সুন্দরভাবে, বিচিত্রভাবে, মহৎভাবে বাঁচা’। সেই বাঁচার ধরন বোঝাতে তিনি উদ্ভিদজগৎ থেকে উপমা এনেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় সংস্কৃতি মানে ‘প্রকৃতি-সংসার ও মানব-সংসারের মধ্যে অসংখ্য অনুভূতির শিকড় চালিয়ে দিয়ে বিচিত্র রস টেনে নিয়ে বাঁচা’।

সভ্যতা ও সংস্কৃতির পার্থক্যও তাঁর এক স্মরণযোগ্য বাক্যে ধরা আছে, ‘এ জীবনে যা না হলে আমরা বাঁচি না, তা–ই আমাদের সভ্যতা, আর যার জন্য বাঁচি তাই সংস্কৃতি’। সভ্যতা এখানে উপায়, সংস্কৃতি উদ্দেশ্য। আবার প্রগতির যে ধারণা ‘প্রকৃতিবিজয়লব্ধ সমৃদ্ধির সার্থক বিতরণ’-এ এসে থেমে যায়, তার পাশে তিনি রেখেছেন আরেকটি বাক্য, ‘সভ্যতা শুধু প্রগতি নয়, আরো কিছু’। সেই আরো কিছুর ব্যাখ্যাও তিনি দিয়েছেন, ‘প্রগতির সঙ্গে সৌন্দর্যের সম্বন্ধ, প্রেমের সম্বন্ধ স্থাপিত না হলে সভ্যতা হয় না’। তাহলে ‘সভ্যতা’ শব্দটি তাঁর লেখায় দুই স্তরে সক্রিয়। কখনো তা জীবনধারণের উপকরণ কখনো সৌন্দর্য ও প্রেমে সিক্ত এক পূর্ণতর অবস্থা।

সভ্যতা-নির্মাতা মুষ্টিমেয়ের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও অবকাশ বহুজনের মূল্য না দিয়ে কীভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব, এই প্রশ্ন তিনি নিজেই তুলেছেন। তাঁর উত্তর—সব সভ্যতার ভিত্তি অসমতা। এথেন্সের ছিল দাস আর যে শ্রেণি ফ্লোরেন্সকে তার সংস্কৃতি দিয়েছিল তাকে প্রতিপালন করেছিল ভোটাধিকারহীন এক শ্রমজীবী জনতা। এই স্পষ্টবাদিতা অস্বস্তিকর কিন্তু শিক্ষণীয়ও।
শব্দের এই দোলাচল কি নিছক আকস্মিক? উত্তর খুঁজতে গেলে ক্লাইভ বেলের দরজায় কড়া নাড়তে হয়। ক্লাইভ বেল (১৮৮১–১৯৬৪) শিল্পসমালোচক হিসেবেই সমধিক পরিচিত। সভ্য সমাজ বোঝার জন্য বেল দুটি লক্ষণ নির্দেশ করেন। যেমন, মূল্যবোধ এবং যুক্তির প্রতিষ্ঠা। প্রথমটি হলো কোন বস্তু স্বতোমূল্যবান আর কোনটি উপায়মাত্র, সে বিষয়ে পরিচ্ছন্ন বোধ। দ্বিতীয়টি হলো সব প্রশ্নকে উন্মুক্ত রেখে যুক্তির আদালতে বিচার করার প্রস্তুতি। যে তিনটি পর্বকে তিনি উচ্চ সভ্যতার আদর্শ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখেন, সেগুলো হলো পেরিক্লিসের এথেন্স, রেনেসাঁর ফ্লোরেন্স এবং বিপ্লবপূর্ব অষ্টাদশ শতকের ফ্রান্স।

মোতাহের হোসেন চৌধুরীর একটি প্রবন্ধের নাম ‘মূল্যবোধ ও যুক্তিবিচার’। বেলের দুই লক্ষণের সঙ্গে এই শিরোনামের সাযুজ্য সহজেই ধরা পড়ে। এটি সচেতন ঋণ কি না তা প্রবন্ধের পাঠ মিলিয়ে বিচার্য। তবে দুই লেখকের চিন্তা যে একই অক্ষকে কেন্দ্র করে আবর্তিত, সে কথা বলা চলে। বেলের গ্রন্থের সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ অবশ্য অন্যত্র। সভ্যতার বস্তুগত শর্ত নিয়ে তিনি কোনো রাখঢাক করেননি।

‘সভ্যতার জন্য একটি অবকাশভোগী শ্রেণির অস্তিত্ব আবশ্যক, আর অবকাশভোগী শ্রেণির জন্য আবশ্যক দাসের অস্তিত্ব— দাস বলতে আমি সেই মানুষদের বোঝাচ্ছি, যাঁরা নিজেদের উদ্বৃত্ত সময় ও শক্তির একাংশ অন্যের ভরণপোষণে ব্যয় করেন। ক্লাইভ বেল, ‘সিভিলাইজেশন’ (১৯২৮)

বেলের যুক্তি সরল। উৎকৃষ্ট মনোদশার চর্চার জন্য প্রয়োজন অবকাশ ও নিরাপত্তা। অবকাশ আকাশ থেকে নামে না, কাউকে না কাউকে শ্রম দিয়ে তা জোগাতে হয়। সভ্যতা-নির্মাতা মুষ্টিমেয়ের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও অবকাশ বহুজনের মূল্য না দিয়ে কীভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব, এই প্রশ্ন তিনি নিজেই তুলেছেন। তাঁর উত্তর—সব সভ্যতার ভিত্তি অসমতা। এথেন্সের ছিল দাস আর যে শ্রেণি ফ্লোরেন্সকে তার সংস্কৃতি দিয়েছিল তাকে প্রতিপালন করেছিল ভোটাধিকারহীন এক শ্রমজীবী জনতা। এই স্পষ্টবাদিতা অস্বস্তিকর কিন্তু শিক্ষণীয়ও। সভ্য ব্যক্তির যে আদর্শ সচরাচর বায়বীয় উচ্চতায় ভেসে বেড়ায়, বেল তাকে মাটিতে নামিয়ে দেখিয়েছেন, তার পায়ের নিচে কারা আছে।

মনে রাখা দরকার, বেলের পারিবারিক বিত্ত এসেছিল ওয়েলসের মার্থার টিডফিলের কয়লাখনি থেকে। তাঁর নিজের সংজ্ঞা মানলে ভূগর্ভে যে শ্রমিকেরা কয়লা কেটেছেন, তাঁরাই ছিলেন বেলের অবকাশের জোগানদার। বেলের প্রায় ষাট বছর আগে ১৮৬৯ সালে ম্যাথু আর্নল্ড ‘কালচার অ্যান্ড অ্যানার্কি’ গ্রন্থে সংস্কৃতিকে বলেছিলেন ‘পূর্ণতার অন্বেষণ’। তাঁর ঘোষণা ছিল সংস্কৃতি শ্রেণিভেদ বিলুপ্ত করতে চায়, পৃথিবীতে যা কিছু শ্রেষ্ঠ চিন্তা ও জ্ঞান, তাকে সব জায়গায় ছড়িয়ে দিতে চায়। আর্নল্ডের সংস্কৃতি অন্তত আকাঙ্ক্ষায় সম্প্রসারণশীল। বেলের সভ্যতা আত্মসংকোচী। সে জানে তার পরিধি সংকীর্ণ এবং সেই সংকীর্ণতাকেই সভ্যতার শর্ত বলে মেনে নেয়। মোতাহের হোসেনের সূত্রের অবস্থান এই দুইয়ের মধ্যবর্তী। আর্নল্ডের মতো তিনি সংস্কৃতিকে প্রায় ধর্মের আসনে বসিয়েছেন আবার বেলের মতো স্বীকার করেছেন যে সমাজের সবাই সেই আসনের নাগাল পায় না।

শেয়ার করূন

আপনার মতামত