Advertise
২০ অগাস্ট, ২০২৬ ২১:৪৬
কানাডায় প্রায় ৩০ বছর কাটানোর পর ৫৮ বছর বয়সী রোমান স্লেপসিক এখন বহিষ্কারের মুখে। ১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বরে চেক প্রজাতন্ত্রে রোমা জনগোষ্ঠীর ওপর বাড়তে থাকা সহিংসতা থেকে বাঁচতে তিনি কানাডায় এসে আশ্রয় চান। পরের বছরের আগস্টে তিনি কনভেনশন শরণার্থী (Convention refugee) হিসেবে স্বীকৃতি পান এবং ১৯৯৯ সালের অক্টোবরে কানাডার স্থায়ী বাসিন্দা (permanent resident বা PR) হন।
এরপর দীর্ঘদিন নির্মাণশ্রমিক ও কারিগর হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। একই নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে কাটিয়েছেন প্রায় ২৪ বছর। দুই মেয়েকে কানাডায় এনেছেন, বড় করেছেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ গড়ে দিয়েছেন, নাতি-নাতনির মুখ দেখেছেন, কর দিয়েছেন এবং টরন্টোকেই নিজের ঘর বানিয়েছেন। কিন্তু যে দেশ থেকে নির্যাতনের ভয়ে পালিয়ে এসেছিলেন, সেই দেশে তাঁর যাওয়া-আসাই একদিন কানাডায় গড়ে তোলা জীবনের ভিত্তি কাঁপিয়ে দেবে, তা তিনি কখনও ভাবেননি।
আদালতের নথি বলছে, ২০০১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক প্রয়োজনে তিনি আটবার চেক প্রজাতন্ত্রে গিয়েছিলেন। প্রতিবারই ব্যবহার করেছিলেন চেক পাসপোর্ট। শরণার্থী স্বীকৃতি পাওয়ার পর সেই পাসপোর্ট দুবার নবায়নও করেছিলেন তিনি।
২০২১ সালের জানুয়ারিতে চেক প্রজাতন্ত্র থেকে কানাডায় ফেরার সময় সীমান্ত কর্মকর্তাদের নজরে আসে তাঁর ভ্রমণের ইতিহাস। এরপর সরকার তাঁর শরণার্থী সুরক্ষা প্রত্যাহারের জন্য ইমিগ্রেশন অ্যান্ড রিফিউজি বোর্ডে (Immigration and Refugee Board বা IRB) আবেদন করে। ২০২৩ সালে বোর্ড সিদ্ধান্ত দেয়, বারবার নিজ দেশে যাওয়া এবং চেক পাসপোর্ট ব্যবহার করে স্লেপসিক কার্যত আবার চেক প্রজাতন্ত্রের সুরক্ষা (protection) গ্রহণ করেছেন। কানাডার আইনে একে বলা হয় ‘রিঅ্যাভেইলমেন্ট’ (reavailment)। এই সিদ্ধান্তের ফলেই তাঁর শরণার্থী সুরক্ষার পাশাপাশি স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদাও হারিয়ে যায়।
ঘটনার এই জায়গাটিই কানাডায় বসবাসরত বহু বাংলাদেশির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। বাংলাদেশ থেকে অনেকেই কানাডায় এসে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় চেয়েছেন, পরে সুরক্ষিত ব্যক্তি (protected person) এবং স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদা পেয়েছেন। তাঁদের কেউ কেউ বছরের পর বছর কানাডায় থাকার পর অসুস্থ বাবা-মাকে দেখতে, স্বজনের মৃত্যু, পারিবারিক সংকট, সম্পত্তির জটিলতা কিংবা অন্য জরুরি প্রয়োজনে বাংলাদেশে যাওয়া-আসা করেন। কিন্তু শরণার্থী হিসেবে যে দেশের বিরুদ্ধে সুরক্ষা চাওয়া হয়েছিল, সেই দেশে ফিরে যাওয়া এবং সেই দেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করা কানাডার আইনে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। কানাডায় ফেরার সময় বিমানবন্দর বা স্থলসীমান্তে জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে পারেন; পরিস্থিতিভেদে আটকও হতে পারেন।
কানাডার অভিবাসন ও শরণার্থী সুরক্ষা আইন (Immigration and Refugee Protection Act)-এর ১০৮ ধারায় বলা হয়েছে, একজন শরণার্থী স্বেচ্ছায় আবার নিজের দেশের সুরক্ষা গ্রহণ করলে, পুরোনো নাগরিকত্ব ফিরে নিলে, নতুন কোনো দেশের নাগরিকত্ব নিয়ে সেই দেশের সুরক্ষা গ্রহণ করলে অথবা যে দেশ থেকে পালিয়ে এসেছিলেন সেখানে আবার স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলে তাঁর শরণার্থী সুরক্ষা প্রত্যাহার করা যেতে পারে।
২০১২ সালের আগে এমন সিদ্ধান্ত হলেও স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে যেত না। কিন্তু ওই বছর আইন পরিবর্তনের পর এসব কারণে শরণার্থী সুরক্ষা প্রত্যাহার করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদা হারান এবং কানাডায় অগ্রহণযোগ্য (inadmissible) হয়ে পড়েন।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি নিজের দেশের পাসপোর্ট। ইমিগ্রেশন অ্যান্ড রিফিউজি বোর্ডের আইনি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর কেউ নিজের দেশের পাসপোর্ট নিলে বা নবায়ন করলে প্রাথমিকভাবে প্রশ্ন উঠতে পারে, তিনি আবার সেই দেশের সুরক্ষা নিয়েছেন কি না। অবশ্য ব্যক্তি নিজের পরিস্থিতি ও কারণ ব্যাখ্যা করে সেই ধারণা খণ্ডন করতে পারেন। কিন্তু সেই পাসপোর্ট ব্যবহার করে যে দেশ থেকে সুরক্ষা চাওয়া হয়েছিল, সেখানে ভ্রমণ করলে সরকারের অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে।
পারিবারিক জরুরি প্রয়োজনও সব সময় এই ঝুঁকি থেকে কাউকে রক্ষা করে না। রোমান স্লেপসিক বলেছেন, অসুস্থ স্বজনের দেখাশোনা, পরিবারের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া এবং অন্যান্য প্রয়োজনেই তিনি চেক প্রজাতন্ত্রে গিয়েছিলেন। কিন্তু শুধু সফরের কারণই নয়, কতবার যাওয়া হয়েছে, কতদিন থাকা হয়েছে, কোন পাসপোর্ট ব্যবহার করা হয়েছে এবং সেখানে গিয়ে নিজ দেশের কর্তৃপক্ষের সুরক্ষা নেওয়া হয়েছে কি না, এসব বিষয়ও বিবেচনায় আসে। তাই অসুস্থ বাবা-মাকে দেখতে বা পরিবারের জরুরি প্রয়োজনে নিজ দেশে গেলেই কোনো সমস্যা হবে না, এমন নিশ্চয়তা নেই।
এ ধরনের ঘটনা খুব বেশি না হলেও একেবারে বিচ্ছিন্ন নয়। কানাডা সরকার শরণার্থী হিসেবে সুরক্ষা পাওয়ার পর যারা আবার নিজ দেশে গেছেন, সেই দেশের পাসপোর্ট নিয়েছেন বা নবায়ন করেছেন, কিংবা সেই পাসপোর্ট ব্যবহার করে যাতায়াত করেছেন, এমন ব্যক্তিদের শনাক্ত করে। অনেক ক্ষেত্রে কানাডায় ফেরার সময় বিমানবন্দর বা স্থলসীমান্তে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাঁদের ভ্রমণের ইতিহাস সামনে আসে। আবার পাসপোর্ট, যাতায়াতের রেকর্ড ও ইমিগ্রেশন নথি থেকেও এসব তথ্য পাওয়া যায়। সরকার যখন এমন তথ্যপ্রমাণ পায় যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আবার নিজ দেশের সুরক্ষা গ্রহণ করেছেন, তখন তাঁর শরণার্থী সুরক্ষা প্রত্যাহারের জন্য ইমিগ্রেশন অ্যান্ড রিফিউজি বোর্ডে আবেদন করে। ২০২৫ সালে সরকার এ ধরনের ১৭০টি নতুন আবেদন করেছিল। একই বছরে পুরোনো ও নতুন মিলিয়ে ১৯১টি মামলার নিষ্পত্তি হয়। এর মধ্যে ১২৯টি মামলায় সরকারের আবেদন মঞ্জুর হয় এবং ৩৫টি আবেদন খারিজ হয়।
২০২৫ সালের শেষে এ ধরনের ৩১৪টি মামলা তখনও সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ছিল। ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে আরও ২৭টি নতুন আবেদন জমা পড়ে এবং মার্চের শেষে অপেক্ষমাণ মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ৩১৫। অর্থাৎ বিষয়টি বিচ্ছিন্ন নয়; শরণার্থী সুরক্ষা পাওয়ার পর নিজ দেশে যাতায়াত বা নিজের দেশের পাসপোর্ট ব্যবহারের কারণে এখনও নিয়মিতভাবে এমন মামলা সামনে আসছে।
স্লেপসিক এই আইনকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করেছেন। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ফেডারেল কোর্ট তাঁর আবেদন খারিজ করলেও দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উচ্চ আদালতে আপিলের জন্য অনুমোদন করে। সেই মূল আপিল এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। এরই মধ্যে তাঁর বহিষ্কার স্থগিত রাখার আবেদনও ফেডারেল কোর্ট অব আপিল নাকচ করেছে। ফলে প্রায় তিন দশক কানাডায় কাটানো এই মানুষটিকে আপিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগেই দেশ ছাড়তে হতে পারে। মামলাটির ফল ভবিষ্যতে একই পরিস্থিতিতে পড়া অন্য সাবেক শরণার্থীদের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কানাডার অভিবাসন দপ্তর বলছে, কনভেনশন শরণার্থী বা সুরক্ষিত ব্যক্তির বিদেশ ভ্রমণের জন্য রিফিউজি ট্রাভেল ডকুমেন্ট (Refugee Travel Document) প্রয়োজন। তবে এই নথি নিজের নাগরিকত্বের দেশ বা যে দেশের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দাবি করা হয়েছিল, সেখানে ভ্রমণের জন্য ব্যবহার করা যায় না। অর্থাৎ নিজ দেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এর সম্ভাব্য আইনগত ঝুঁকি পরিষ্কারভাবে বুঝে নেওয়া জরুরি।
তাই শরণার্থী হিসেবে কানাডায় সুরক্ষা পাওয়ার পর যাঁরা স্থায়ী বাসিন্দা হয়েছেন, বাংলাদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁদের শুধু বিমান টিকিট বা পাসপোর্টের মেয়াদ দেখলেই চলবে না। দেখতে হবে, কোন পরিস্থিতিতে তাঁরা শরণার্থী সুরক্ষা পেয়েছিলেন। এখন কোন দেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করছেন, সেটিও দেখতে হবে। একই সঙ্গে ভাবতে হবে, বাংলাদেশে সফর করলে তাঁদের শরণার্থী সুরক্ষা (refugee protection) আইনি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে কি না।