Advertise
০৩ নভেম্বর, ২০২৬ ২২:০৩
নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রমে ছয় সন্তানকে বড় করেছেন শামসুল হক মোল্লা। স্বপ্ন দেখেছেন জীবনের শেষ দিনগুলোতে সন্তানদের সান্নিধ্যে কাটাতে পারবেন। কিন্তু সেই বার্ধক্যেই আজ তিনি সন্তানদের কাছে বোঝা হয়ে গেছেন। ছয় সন্তানের কারও ঘরেই তার আশ্রয় মেলেনি। শেষ পর্যন্ত ঠাঁই হয়েছে বাড়ির পাশের একটি গাছতলায়।
শামসুল হক মোল্লার বাড়ি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার উত্তর হিরন গ্রামে। তার দুই ছেলে ও চার মেয়ে। বড় ছেলে আজিজুল মোল্লা পেশায় ফেরিওয়ালা। ছোট ছেলে রিয়াজুল মোল্লা বাসের চালকের সহকারী। চার মেয়ের মধ্যে তিনজনের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট মেয়ে শারীরিক প্রতিবন্ধী। এই বয়সে এসে আপনজনদের কাছ থেকে এমন পরিস্থিতির শিকার হয়ে গাছতলাকেই নিজের শেষ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিতে হয়েছে তাকে।
মঙ্গলবার সকালে দুই ছেলে ও তাদের স্ত্রীরা তাকে বাড়ির অদূরে একটি গাছের নিচে রেখে আসেন। এ ঘটনা জানাজানির পর এলাকায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছয় সন্তানের সবাই মিলে তার জমিজমা লিখে নেওয়ার পর তাকে বাড়ির পাশে একটি গাছের নিচে রেখে দিয়েছেন। সেখানেই এখন মানবেতর কাটছে এই বৃদ্ধের।
বৃদ্ধ শামসুল হকের ছোট মেয়ে কাজুলী বেগম ছাড়া বাকি পাঁচ সন্তানই নিজেদের সংসার ও সন্তানদের নিয়ে ব্যস্ত। কয়েক বছর আগে নিজের জমি বিক্রি করে হজ পালন করতে যান শামসুল হক। এ সময় অবশিষ্ট জমিজমা সন্তানদের মধ্যে ভাগ করে দেন। তবে বর্তমানে বিপত্নীক এই বৃদ্ধের খোঁজখবর সন্তানদের কেউই তেমন রাখেন না বলে জানা গেছে।
গত কয়েক দিন ধরে বড় মেয়ে মায়া বেগমের বাড়িতে ছিলেন শামসুল হক। কিন্তু মঙ্গলবার সকালে মায়া বেগম তার বৃদ্ধ বাবাকে ভাইদের বাড়িতে নিয়ে যান।
সেখানে ভাই ও তাদের স্ত্রীরা মিলে শামসুল হক মোল্লাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। পরে তাকে বাড়ির পাশের একটি গাছের নিচে রেখে আসেন। ৯৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ বাবার প্রতি সন্তানদের এমন আচরণের খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে বৃদ্ধ শামসুল হক বলেন, ‘আমার বয়স এখন ৯৫ বছর। এই বয়সে আমি এখন কোথায় যাবো, কী করবো, কিছুই বুঝতে পারছি না। সারা জীবন কষ্ট করে ওদের (ছেলেমেয়ে) বড় করলাম। তাদের কাছে এখন আমি বোঝা হয়ে গেছি। এখন আল্লাহ যা করেন, তা-ই হবে।’
বৃদ্ধ বাবাকে রাখতে না চাওয়ার কারণ জানতে চাইলে বড় মেয়ে মায়া বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী অসুস্থ। তার ওপর আমার বাড়িতে আবার প্রতিবন্ধী ছোট বোন কাজুলী থাকে। যার কারণে আমার পক্ষে আমার বাবাকে রাখা সম্ভব নয়।’
শামসুল হকের মেজো মেয়ে সাবিনা বেগম বলেন, ‘আমাদের চার বোনকে জমি বিক্রি করে মাত্র চার লাখ টাকা করে দিয়েছে। বাবা দুই ভাইকে নগদ টাকাসহ ৮ কাঠা করে জমি দিয়েছে। এখন আমরা বোনেরা কেন বাবার দেখাশুনা করবো?’
এ বিষয়ে জানার জন্য শামসুল হক মোল্লার দুই ছেলে আজিজুল ও রেয়াজুলের বাড়িতে গিয়ে তাদেরকে পাওয়া যায়নি। তাদের স্ত্রী-রা কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাশের বাড়ির এক গৃহবধূ বলেন, ‘শামসুল হক মোল্লার জমি জমা লিখে নিয়ে এখন তার সন্তানরা তাকে আশ্রয় দিচ্ছে না। তিনি যদি সন্তানদের জমি লিখে না দিতো তা হলে হয় তো এই অবস্থা হতো না। সন্তানরা যেটি করছেন সেটি কোনোভাবেই কোনও বাবার জন্য কাম্য নয়।’
এ বিষয়ে কোটালীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফ-উল-আরেফীন বলেন, ‘বিষয়টি আমি জেনেছি। শামসুল হক সাহেবের সন্তানরা যদি তার দেখাশোনা না করেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে পিতামাতার ভরণপোষণ আইন অনুসারে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। সন্ধ্যায় শামসুল হকের ছেলেমেয়েদের নিয়ে আমার কার্যালয়ে বসেছি। এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’