Advertise
০৯ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:০১
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব দুবাইভিত্তিক অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার বিরোধিতাকারীদের লাঠিপেটা করেছে পুলিশ। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার দিকে আগারগাঁওয়ে বিনিয়োগ ভবনের সামনে এ লাঠিপেটায় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের আপত্তি এবং প্রতিবাদের মধ্যেই বিকেল ৩টায় আগারগাঁওয়ের ইনভেস্ট বাংলাদেশ (সাবেক বিডা) মিলনায়তনে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ১৫ বছরের কনসেশন চুক্তির সই হয়।
এদিকে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন এনসিটি বিদেশি অপারেটরের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানিয়েছে। গতকাল চট্টগ্রামে তারা বিক্ষোভ সমাবেশ করে। বুধবার রাতে বের হয় মশাল মিছিল। নগরীতে দুই মাস ধরে নানা প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে আসছে বিভিন্ন সংগঠন। এনসিটির ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনের পর শ্রমিকদের চাকরি ও ভবিষ্যৎ ভূমিকা কী হবে, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শ্রমিক নেতারা।
চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি প্রধান কনটেইনার টার্মিনালের মধ্যে এনসিটি সবচেয়ে বড়। জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর ক্ষেত্রে টার্মিনালটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গতকাল আগারগাঁওয়ে চুক্তি সইয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরুর সময় মিলনায়তনের বাইরে অবস্থান করেন কয়েকটি বামপন্থি রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা বিভিন্ন স্লোগান দেওয়ার পাশাপাশি এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। এক পর্যায়ে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দিতে লাঠিপেটা করে।
অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেয় বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), ডেমোক্রেটিক রেভল্যুশনারি পার্টি, বাংলাদেশ জাসদ, বাসদ (মার্ক্সবাদী), বাংলাদেশ সাম্যবাদী আন্দোলন, সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট, গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট ও গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি।
বিক্ষোভে উপস্থিত সিপিবির সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন বলেন, ‘আমরা আজ সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের সঙ্গে ডিপি ওয়ার্ল্ডের চুক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই বিডা ভবনের সামনে এসেছিলাম। আমরা মনে করি, এ চুক্তি বাংলাদেশকে বিক্রি করার শামিল। ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সম্পৃক্ততা আছে, তাদের ওয়েবসাইটে গেলে বিষয়টি বোঝা যাবে।’
সাজ্জাদ জহির আরও বলেন, ‘ডিপি ওয়ার্ল্ডকে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল দেওয়ার মনে হলো, বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের ওপর আমেরিকা সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারবে। আমাদের নৌবন্দর, বিমানবন্দর–সব ব্যবহার করবে তারা।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশের এক পর্যায়ে পুলিশ বিনা উস্কানিতে লাঠিপেটা করে। যারা বাংলাদেশটাকে আমেরিকার কাছে, ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছেন, তারা আজীবন দেশের বিশ্বাসঘাতক, বেইমান হিসেবে চিহ্নিত হবেন। শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও আমরা দেশের বন্দর ও জাতীয় সম্পদ রক্ষা করব।’
গতকাল বিক্ষোভ কর্মসূচি চলাকালে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের গাড়িবহর আগারগাঁওয়ে বাধার মুখে পড়ে। বিমানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলে যোগ দিতে যাওয়ার সময় বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দিতে থাকেন।
এরই মধ্যে বিমানমন্ত্রীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের বাগ্বিতণ্ডার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, বিমানমন্ত্রীর গাড়িবহরের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন বিক্ষোভকারীরা। সেই সঙ্গে স্লোগান দিচ্ছেন তারা। এ অবস্থায় গাড়ির গ্লাস নামিয়ে বিক্ষোভকারীদের কাছে মন্ত্রী জানতে চান– ‘তোমরা কী করতে চাও?’
বিক্ষোভকারীদের একজন জবাব দেন, ‘আপনি যেই মন্ত্রণালয়ের হন না কেন, আজ এখানে দেশ বিক্রি হচ্ছে। আজ কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেব না। আপনি চলে যান।’ এর পরই স্লোগান দেওয়া হয়, ‘লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে জিততে চাই’। তখনও মন্ত্রীর গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় সেখানে।
এর পর বিক্ষোভকারীদের একজন বলেন, ‘এখানে আর কোনো কথা বলার সুযোগ নাই। কথা বলার জায়গা নাই। আপনারা যদি বাংলাদেশের পক্ষে থাকেনও আজ এখানে আপনারা ঢুকতে পারবেন না।’
এ সময় পাশ থেকে আরেকজন বলেন, ‘আপনি এসেছেন কেন? আপনারা সবার আগে যে বাংলাদেশ বলেন না– আমরা সেই বাংলাদেশের জন্য এখানে দাঁড়াইছি।’ জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘বাবা শোন; তোমরা একজন করে বলো।’ তখন পাশ থেকে একজন বলেন, ‘আপনি বলেন আমরা শুনি।’ তখন মন্ত্রী বলেন, ‘আমি যে কাজে এসেছি, সে কাজ করতে দাও। তোমরা কি আমার কাজ বন্ধ করতে চাও। আমার কাজ বন্ধ করতে চাও নাকি? আমি যে কাজে এসেছি, তা করতে দাও।’ এর জবাবে আরেকজন এগিয়ে গিয়ে বলেন, ‘আপনি যে কাজেই এসেছেন, আজ এখানে ঢুকতে পারবেন না।’ এ নিয়ে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হলে তখন গাড়ি ঘুরিয়ে অন্যদিকে চলে যান বিমানমন্ত্রী।
শেরেবাংলা নগর থানার ওসি মনিরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ‘বিক্ষোভকারীরা মন্ত্রী ও কূটনীতিকদের গাড়ি চলাচলে বাধার সৃষ্টি করে। সড়কের ওপর শুয়ে পড়েছিল। ভবনের সামনে জড়ো হয়ে বিশৃঙ্খলা করছিল। পরে তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
হুঁশিয়ারি দিয়ে নৌ মন্ত্রণালয়ের চিঠি
চট্টগ্রাম বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটানোর চেষ্টা হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি সইয়ের আগে গত বুধবার জারি করা এক জরুরি চিঠিতে এমন হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশও দেওয়া হয় চিঠিতে।
এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি অপারেটরের কাছে হস্তান্তর করা হলে বন্দর অচল করে দেওয়ার পূর্ব ঘোষণা ছিল বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও বন্দর রক্ষা আন্দোলনকারী সংগঠনগুলোর। এ জন্য চুক্তির আগেই এমন সতর্কতা মূলক চিঠি জারি করা হয়।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ কেফায়েত হামিম বলেন, বন্দর জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এটির নিরবচ্ছিন্ন সেবা দেওয়া জরুরি। খালাস কার্যক্রম চালু রাখতে তাই এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক মো. নাসির উদ্দিন স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বন্দরের পরিচালন কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টির চেষ্টা করলে তাৎক্ষণিক ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে এবং আইন ও বিধি অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। জরুরি পরিস্থিতিতে বন্দরের শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সব ধরনের কার্যক্রম নির্বিঘ্নে রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। চিঠিটি সিপিএর সব সদস্য, বিভাগীয় প্রধান এবং বন্দর চেয়ারম্যানের একান্ত সহকারীকে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি হয়ে যাওয়ায় ফের সংগঠিত হচ্ছেন শ্রমিক নেতারা। বিএনপি ও জামায়াতপন্থি সংগঠনগুলো এই চুক্তির বিরোধিতা করছে। চলতি সপ্তাহে এই প্রতিবাদ আরও জোরালো হয়েছে।