আজ বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ইং

Advertise

মুক্তমত

মুজিব রহমান

১৩ অক্টোবর, ২০২৬ ২১:৫৬

সলিমুল্লাহ কেনো এক বিকারগ্রন্থের নাম?

ঢাকার দোহারে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে একটি পাঠাগারের বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠান শুরুর অনেক আগেই সলিমুল্লাহ খানের সাথে সাক্ষাৎ হয়ে গেল বলে কিছু কথা বলার সুযোগ হল। সম্ভবত আমার হাতে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যারের ‘নতুন দিগন্ত’ পত্রিকাটি দেখেই তিনি কথা বলতে আগ্রহী হলেন। তিনি সুচিপত্র দেখে বললেন, ‘এক যুগ আগে তিনি নতুন দিগন্ত পড়া ছেড়ে দিয়েছেন। এর মধ্যে কোন নতুন চিন্তা নেই। কখনো পাশ্চাত্যের কিছু ধার করা চিন্তা নিয়ে কেউ লিখে। তবে মৌলিক কোন চিন্তা পত্রিকাটিতে থাকে না। এতে এমন একটি লেখাও পাবেন না যা দ্বিতীয়বার পড়তে চাইবেন।’ বলতে চাইলাম, ‘আপনি একযুগ পড়েন না। তাহলে কিভাবে জানলেন পড়ার মতো কোন লেখা নেই?’ কিন্তু তাতে আলাপ তিনি থামিয়ে দিতে পারেন। আবার নতুন দিগন্ত নিয়ে আমার নিজেরও তেমন উচ্ছ্বাস নেই। খান নজরুল ইসলাম হান্নান ভাই ১১টি কপি দিয়েছেন বিভিন্ন পাঠাগার ও পড়ুয়াদের দেয়ার জন্য তাই তিনটি কপি নিয়ে এসেছিলাম। প্রশ্ন না করে বলি, এসময়ে সিরাজ স্যার ‘জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি’ ও ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ বই দুটি লেখেন যা দুই বাংলোতেই সমাদ্রিত হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায় স্যারতো সমাজ নিয়ে গভীর চিন্তা করছেন!
তিনি বললেন, ‘তিনি একই কথা চল্লিশ বছর ধরে বলে যাচ্ছেন। নতুন কিছু আর ভাবতে পারছেন না। কিছু মানুষের নিজের সম্মান বজায় রাখতে লেখালেখি থামানো উচিৎ। উনার বহু বছর আগেই লেখালেখি থামিয়ে দেয়া উচিৎ ছিল।’ এবার প্রশ্ন করি, ‘আপনি লিখেন না কেন?’ ওনি বলেন, ‘একেবারে লিখি না তা নয়। যেমন ‘বেহাত বিপ্লব’ লেখেছি। তবে কম লিখি সেটা সত্য।’ আমি বলি, ‘বেহাত বিপ্লব ’ আপনার সম্পাদিত গ্রন্থ। এখানে আপনার মাত্র একটা লেখা। অন্য লেখাতো অন্যদের। পত্রিকাতেও তেমন লেখা আসে না। আপনি আন্তোনিও গ্রামসিকে নিয়ে কথা বলেন কারণ তিনি অনেক লিখেছেন। প্রিন্টিং লেখা নিয়েইতো মানুষ শেষ পর্যন্ত ক্রিটিক করবে? এতো কমই বা লেখেন কেন?’ ওনি বলেন, ‘সবাইতো লিখে না। সক্রেটিস বা আব্দুর রাজ্জাক তো লিখেননি। সবাই সবকিছু করবে না। আমি লিখি না তবে অন্য ক্ষেত্রে কাজ করছি।’
এরপর অন্য প্রসঙ্গে কথা বলি। ভাগ্যকুল পাঠাগার ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের ‘কথা আঙিনা’ এর অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানালে তিনি থাকবেন কি না। তিনি বলেন, ‘আমিতো জনসভায় বক্তৃতা দিতে পারি না। ছোট আকারের প্রোগ্রামে অংশগ্রহন করি। মুন্সিগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজে এক অনুষ্ঠানে গিয়েছি। অবশ্যই আপনারা আমন্ত্রণ জানালে আসবো।’ হুমায়ুন আজাদ, পিনাকী ভট্টাচার্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা হয়। আগের দিন সম্ভবত পিনাকী ভারতের পণ্য বর্জনের ডাক দিয়েছেন। পিনাকীকে নিয়ে কথা বলতে চাইলাম না। আমি বুঝি কেন সলিমুল্লাহ খান লিখেন না? তিনি যেভাবে বিক্ষিপ্ত কথা বলেন সেভাবে কোন লেখা তৈরি করা যায় না। যেমন আপনি গ্রামসির আধিপত্যবাদ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মূল কথায় না থেকে যদি তার নাতি কোথায় কি করেছেন তা বলেন কিংবা চলে যান আরবের মাদ্রাসা শিক্ষা দেখে কিভাবে পাশ্চাত্যে বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে তার বর্ণনায় তখন সেটা আর গ্রামসির আধিপত্যবাদ নিয়ে লেখা হবে না। এসব বক্তৃতায় চালানো যায়। এতে শ্রোতারা ভিন্ন ধরনের রস পায়। বক্তৃতার অনুষ্ঠানে বিভিন্ন মতাদর্শের লোক থাকে। তারা শুনে মজা পেতে চায়। ফলে ভাল লেখা তার পক্ষে সহজ নয়। হয়তো সে কারণেই তিনি লিখেন না। কথা বলার সময় তিনি কয়েকবারই বললেন, তার অনেক কিছুই মনে থাকে না এখন। হয়তো কিছু বিষয় মনে থাকে না। তবে বক্তব্য রাখার সময় তিনি মুখস্থ বহু রেফারেন্সই দিতে পারেন। আবার আগের বক্তাদের নামও মনে রাখতে পারেন। তার স্মরণ শক্তি বাস্তবিকই অসাধারণ। ফলে তিনি ভাল বক্তা কিন্তু ভাল লেখক হতে পারেননি। সক্রেটিস> প্লেটো> এরিস্টটল এর মতো করে বাংলাদেশে অনেকে আব্দুর রাজ্জাক> আহমদ ছফা> সলিমুল্লাহ খান এর নাম নিতে চান। সক্রেটিসকে লিপিবদ্ধ করলেও প্লেটো সক্রেটিসের দর্শনে আবদ্ধ থাকেননি আবার এরিস্টটলও আবদ্ধ থাকেননি প্লেটোতে। কিন্তু সলিমুল্লাহ খানতো এখনো আহমদ ছফার বন্দনাতেই সীমাবদ্ধ থাকেন। আবার সলিমুল্লাহ খানেরও নতুন কোন দর্শন বা চিন্তা নেই। আহমদ ছফাকে নিয়ে দেশে কিছু মানুষ অতি উচ্ছ্বসিতও এখন। তবে কেন উচ্ছ্বসিত তা হয়তো তারাও জানেন না।
অনুষ্ঠানে যথারীতি তিনি আহমদ ছফা ও আব্দুল রাজ্জাককে নিয়ে কথা বললেন। নতুন দিগন্ত নিয়ে কটাক্ষও করলেন। বললেন, ‘আমি আহমদ ছফার ৬ খণ্ড বারবারই পড়ি। প্রত্যেকবারই নতুন কিছু পাই। এগুলো বারবার পড়া যায়। কিন্তু নতুন দিগন্তের একটি লেখাও পাবেন না যা দ্বিতীয়বার কেউ পড়তে চাইবে।’ তিনি আহমদ ছফার ‘বাঙালি মুসলমানের মন’কে অভ্রান্ত দাবি করে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন। তার বক্তব্য শেষ হলে প্রথম প্রশ্নটিও আমিই করি। জানতে চাই, ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ প্রবন্ধে আহমদ ছফা বলেছেন, ‘বাঙালি মুসলমানের মন গঠনে পুঁথিসাহিত্য ও অবাঙালি মুসলিম নেতাদের সাথে সাধারণ মুসলমানদের সম্পর্কহীনতাই মূল ভূমিকা রেখেছে। এখনতো এ দুটি দিক নেই কিন্তু বাঙালি মুসলমানের মন একই রকম কেন?’ তিনি বললেন, দুটি নয় মূল কারণ তিনটি বলেছেন। তৃতীয় কারণটি না বলে বাঙালি মুসলমানদের নিয়ে বিভিন্ন কথা বললেন। বললেন, ‘মাদ্রাসা অনুকরণ করেই পাশ্চাত্যে বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। মাদ্রাসায় সনদ হিসেবে পাগড়ি দেয়া হতো। সমাবর্তনে কালো গাউন পরা, শিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীরা ব্যয় করবে না—এসব ধারণাও তারা নিয়েছে মুসলিমদের কাছ থেকেই। কিন্তু তারা স্বীকার করতে চান না। ভারত বর্ষেও খানকা, মাদ্রাসা ও মসজিদের জন্য বিপুল সম্পদ ছিল যা মোট জমির ২০%! ইংরেজ শাসকগণ এসব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেন। আজ সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুপুরে খাবার দেয়ার কথা ভাবছে। এটাতো কওমি মাদ্রাসায় এখনো আছে। সেখানে তারা থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করে। তবে মাদ্রাসা শিক্ষার মূল সমস্যা হল তারা রয়ে গেছে সেই আগের অবস্থাতেই। ওখানে শিক্ষার আধুনিকায়ন ঘটেনি।’ তিনি কি জানেন যে, মাদ্রাসায় পড়তে গেলেও শিক্ষার্থীদেরও টাকা দিতে হয়। সবখানেই ফ্রি নয়। আবার মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের দিয়ে রাস্তায় রাস্তায়, বাড়ি বাড়ি বা বাস-গাড়ি থেকে টাকাও তোলানো হয়? তিনি বললেন, আধুনিকায়ন ঘটেনি। তবে কতটা ঘটেনি? কেন রাষ্ট্র কওমি মাদ্রাসার শিক্ষাকে মানসম্মত করার উদ্যোগ নিবে না? কওমী মাদ্রাসার শিক্ষা পেয়ে একজন শিক্ষার্থী কতটা বিকশিত হবেন? এসব বিষয়গুলো তিনি আলোচনায় আনেন না।
অনুষ্ঠান শেষে আমি অন্তত ৮ জনের কাছে জানতে চেয়েছি, আজকের বক্তব্য থেকে কী শিখলেন? তার বক্তব্যের অর্থ ও তাৎপর্য কী? প্রকাশক ও অনলাইনে বই বিক্রেতা এম আর খান জিতু বললেন, ‘কথা শুনতে এসে দুটি দিক প্রত্যাশা করি। হয় বক্তা আমাদের চেতনাকে উদ্বুদ্ধ করবে নয়তো সে এমন নতুন চিন্তা নিয়ে আসবে যা আমাকে আলোড়িত করবে। এ দুটির একটিও ঘটেনি।’ অন্যরাও জানালেন যে, তার আলোচনা থেকে শেখার কিছু নেই। তিনি কিছু তথ্য দিয়েছেন যার বিশ্লেষণ ছিল না। তবে ভাষা সম্পর্কে তিনি কয়েকটি উদাহরণ দিয়েছেন তা ভাল হয়েছে। অনেকের কাছেই আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল, তিনি কি আধুনিক? তিনি নিজে কি নতুন চিন্তা করতে সক্ষম? এ সময় সম্পর্কে তার ধারণা রয়েছে বটে তবে তিনি নিজে আধুনিক চিন্তা ধারণ করেন না। তিনি বিক্ষিপ্ত ও অসংলগ্ন কিন্তু ক্যারিশমেটিক বক্তা যিনি বক্তৃতায় যাকির নায়েক স্টাইলে একটি ধুম্রজাল তৈরি করেন এবং সেখানে শ্রোতারা আটকে যান রেফারেন্সের যাতাকলে। তিনি সব শ্রেণির মানুষের কাছে জনপ্রিয় হতে চান। বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান দিয়ে তিনি কি শেষ পর্যন্ত জনসাধারণকে শাসকদের প্রতি সহানুভূতিশীলই করে তুলতে চান? কারণ অন্ধ বিশ্বাস সবসময়ই শাসকদের প্রতি মানুষদের অনুগত থাকতে অনুপ্রাণিত করে। আবার যদি মানুষ গণআন্দোলনে নেমে আসে তখনও তিনি ভোল পাল্টাবেন। সাম্প্রতিক সময়ে আপদ হিসেবে আবির্ভূত ‘পাশ্চাত্য বিরোধিতা’ করে এক জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগ্রত করার প্রচেষ্টা অনেকের মধ্যেই দেখছি। শাসকগণও পাশ্চাত্য বিরোধিতা করছেন রাজনৈতিক কারণে। ওই বক্তৃতায় তিনি কয়েকবারই রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতাও করলেন। যেমন কি ও কী নিয়ে রবীন্দ্র ভাবনার বিরোধিতা করে বললেন ‘কী’ এর কোন দরকারই নেই। ‘কি’ দিয়েই আমরা বুঝে নিতে সক্ষম। রবীন্দ্রনাথের পিতাও কখনো ‘কী’ লিখেন নি। রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছেন। বারবার রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতারই উদ্দেশ্য কী? রবীন্দ্রনাথের ক্রিটিক হতেই পারে এবং বিপুলভাবেই তা হওয়া দরকার। কিন্তু এমন বিরোধিতার ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে। তার বারবার মাদ্রাসা শিক্ষার প্রশংসা করার ক্ষতিকর দিকটাও ভাবা দরকার। তিনি ধর্ম শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথাও বললেন। তার এহেন বক্তব্য মাদ্রাসা শিক্ষাকে উৎসাহিতই করবে। মাদ্রাসা শিক্ষার প্রাচীন অবস্থার সাথে পাশ্চাত্যের বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনা, মাদ্রাসাকে আধুনিক না-হতেই উৎসাহিত করবে। তিনি সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার বেহাল দশা নিয়েও কথা বললেন। তার কাছে কয়েকজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক গিয়েছিলেন বলে জানালেন। তারা বলেছেন, ‘আমরা অনেকেই মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়ে প্রাইমারীতে এসেছি। আমাদের বেসিক ১১ হাজার টাকা। মোট মিলিয়েও ২০ হাজার হয় না। গার্মেন্টস কর্মীদের বেতন করা হয়েছে ১২৫০০ টাকা।’ এজন্য প্রাথমিক শিক্ষকদের পক্ষে বক্তব্য দিতে অনুরোধ করেছেন। আমিও বলি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখন ভাল শিক্ষক থাকার পরে শিক্ষার্থীরা কমে যাচ্ছে। শিক্ষকদের ভাল বেতন না দিলে কোন শিক্ষানীতিই বাস্তবায়ন করতে পারবে না। সরকার যাই করুক এতো কম বেতনে যখন শিক্ষকরা সংসার চালাতে পারবেন না, তখন তারা প্রাইভেট পড়াবেনই এবং সেজন্য যা প্রয়োজন তাই করবেন। সলিমুল্লাহ খানরা মাদ্রাসা শিক্ষার পক্ষে যে বয়ান তৈরি করছেন তা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ায় ভূমিকা রাখছে বৈকি। সলিমুল্লাহ খান, ফরহাদ মজহার ও পিনাকী ভট্টাচার্যদের বিরাট ভক্তকূল রয়েছে মাদ্রাসাগুলোতে। তারা নিজেরাও চাইবেন না যে, মাদ্রাসার শিক্ষার মান উন্নত হোক; সরকার সেখানেও শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করুক এবং মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদেরও মেধার বিকাশ ঘটাতে পদক্ষেপ নেয়া হোক। মানুষ অশিক্ষিত থেকে গেলে তারা প্রশ্নহীন থেকে যাবে। তিনি বই ছেড়ার অধিকারের কথা বললেন। হাততালি পড়লো খুব। বই ছেড়া অবশ্যই প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে। কিন্তু একজন শিক্ষক না বুঝে মিথ্যা বলে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারেন না। হিজরাদের নিয়ে শিশুদের জানাতে হবে। ট্রান্সজেন্ডার ও সমকামিতাও জানানো দরকার। এই জায়গা নিয়ে তিনি কথা বললেন না। হুমায়ূন আহমেদের লেখার মানহীনতা ও তার পাঠক নিয়ে বললেন। হুমায়ূন আব্দুর রাজ্জাক সম্পর্কে না বুঝে দাবা খেলায় হারার প্রেক্ষিতে কী বাজে কথা বলেছেন তাও বললেন। আমার মনে হল, হুমায়ূনের দুর্বল লেখা যেমন আমাদের পাঠক উপলব্ধি করে না, তেমনি সলিমুল্লাহ খানের সমস্যাও যে একই রকম সেটাও স্রোতারা ধরতে পারেন না। হুমায়ূনের লেখা আর সলিমুল্লার বলার মধ্যে আকর্ষণীয় সম্মোহনী শক্তিটা রয়েছে তবে তা পাঠক বা শ্রোতার বিকাশে তেমন ভূমিকা রাখে না। এটা তাদের মুগ্ধ পাঠক বা শ্রোতারা বুঝতে পারেন না।
আমার খুবই কষ্ট লাগে যে, দেশে সলিমুল্লাহ খানকে থামানোর মতো কেউ নেই দেখে। মনে হল, একজন ছিলেন, তিনি ড. হুমায়ুন আজাদ— যার শাণিত যুক্তিতে সলিমুল্লাহ খানকে ঠাণ্ডা করে, লেজ গুটিয়ে মিউ মিউ করতে বাধ্য করতে পারতেন। সলিমুল্লাহ খানদের অভীষ্ট লক্ষ্যটা আমরা ধরতে পারি। তিনি অস্তিত্ববাদী দর্শনে আকৃষ্ট একজন পশ্চাৎপদ মানুষ। তিনি নিজেও অস্তিত্ববাদ বিভিন্ন কৌশলে প্রসার ঘটাতে চান। বিশ্বব্যাপী অস্তিত্ববাদ পশ্চাৎপদ দেশগুলোতে এখনো জাঁকিয়ে রয়েছে। তাদেরও বুদ্ধিজীবী দরকার হয়, কবি দরকার হয়। আল মাহমুদ মারা যাওয়ার পরে মৌলবাদীরা কবি সংকটে ভূগছেন। কিন্তু তাদের পথ দেখাচ্ছেন সলিমুল্লাহ খান ও ফরহাদ মজহার। তারা কবির স্বাদ মিটাচ্ছেন বুদ্ধিজীবী দিয়ে। তারা একজন ইউটিউবারকেও পেয়েছেন মুফতে। তিনি পিনাকী ভট্টাচার্য! তিন জনেই প্রকাশ্যে রয়েছেন অস্তিত্ববাদে। সলিমুল্লাহ ও মজহার আস্তিক্যবাদে আর পিনাকী নাস্তিক্যবাদে— যা তিনি প্রকাশ করেন না। দুটি বিপরীত ধারা মিলেছে স্বার্থগত কারণেই। মৌলবাদীদের জন্য একজন সাংবাদিক ইলিয়াসও রয়েছেন। ওদিন সলিমুল্লাহ উল্লসিত পিনাকীর ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাকে। আমাকে ফোন নাম্বার দিতে গিয়ে দেখেন সেটাও ভারতীয় ‘০১৬’ দিয়ে! বললেন, একসময় ওয়ারিদ দেশেরই ছিল পরে এয়ারটেলের কাছে বিক্রি হয়েছে। পিনাকী যেহেতু মনে করছেন, ভারত আমাদের গণতন্ত্রের ক্ষতি করছেন তাই ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাক দিতেই পারেন। কিন্তু বিষয়টির কি বাস্তবিক প্রভাব রয়েছে কিংবা এমন আহবানের পরিণতি কী তার আর আলোচনা করা হয়নি। তবে পিনাকী তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে লাগাতার কথা বলে একটা ভাবাদর্শ গঠনের প্রচেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন। সেটাও তার অধিকার। তবে তার কথাবার্তাতেও স্পষ্ট হয় যে, তিনি এখনো নাস্তিক্যবাদী দর্শনেই বিরাজমান আছেন। কিন্তু সরকারের বিরোধিতা করতে গিয়ে তিনি ধরেই নিয়েছিলেন যে, কেবলমাত্র মাদ্রাসার শিক্ষার্থী আর মৌলবাদীরাই সরকার বিরোধী আর সবাই সরকারের লেসপেন্সার! ফলে তিনি কিছু কৌশল নিয়েছেন। যেমন তিনি প্রায়শই বক্তব্য উপস্থাপনের সময় বলেন, ‘আল্লাহর নামে শুরু করলাম’। কেন এমনটা বলেন? এটা ঠিক ভূতের মুখে রাম নামের মতোই বিষয়। তিনি উল্লসিত হয়ে বলেন যে, তার বক্তব্য মাদ্রাসায় প্রজেক্টরের মাধ্যমে দেখানো হয়। নিজের বিভ্রান্তি থেকেই তিনি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের কাছে, একজন ইসলাম বিশ্বাসী মানুষের মতো করেই নিজেকে উপস্থাপন করেন। তাই পিনাকী, মজহার ও সলিমুল্লাহ খান ভাই ভাই অবস্থায় বিরাজ করেন।
সলিমুল্লাহকে অনেকে দার্শনিক ঠাওরান। সলিমুল্লাহ খান যেভাবে বললেন যে, ‘সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী গত ৪০ বছরে নতুন কিছু বলেন নি। তার নতুন দিগন্ত পত্রিকায় নতুন কোন কথা নেই। এতে এমন কোন লেখা নেই যা দ্বিতীয়বার পড়া যায়। বাস্তবিক নতুন কোন চিন্তাও নাই।’ তখন আমরা প্রশ্ন করতে পারি, সলিমুল্লাহ খান কি নতুন কোন চিন্তা তৈরি করেছেন। তিনি আন্তনিও গ্রামসি, জাক লাকাঁ, আলথুসের, মিশেল ফুকো কিংবা জ্যাক দেরিদার কথা বলেন। ফলে ধরে নেই ইউরোপীয়ান দর্শনের ইতিহাসও তিনি ভালই জানেন। তিনি জানেন নাস্তিক্যবাদ কোন বিশ্বাস নয়, এটি যুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। ইউরোপে অষ্টাদশ শতাব্দীতে এই মতাদর্শ বিস্তৃতি লাভ করে। মানবতাবাদ, যুক্তিবাদ, প্রকৃতিবাদ ও বস্তুবাদকেও আমরা এর মধ্যে ফেলতে পারি। নাস্তিক্যবাদীরা কোন ধর্মীয় রিচ্যুয়াল পালন করেন না। তাদের কাছে আধ্যাত্মিকতা ও অলৌকিকতার কোন স্থান নেই। ভলতেয়ার, কার্ল মার্ক্স, জাঁ পল সার্ত্রে, সিমোন দ্য বোভোয়ার, বার্ট্রার্ন্ড রাসেলসহ অসংখ্য দার্শনিক এই দর্শনকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন। বিশেষ করে বিজ্ঞানী ডারউইনের বিবর্তনবাদ আসার পরে দর্শনে এক বিরাট পরিবর্তন চলে আসে। এখন হয় আপনাকে বিবর্তনবাদকে ভুল প্রমাণিত করতে হবে নইলে আস্তিক্যবাদকে ভুল বলে মেনে নিতে হবে। সলিমুল্লাহ খান যদি এসব নাই বুঝেন, তাহলে বলতেই হবে তিনি দর্শনের অন্ধকার যুগেই রয়েছেন এবং মুখস্থ বিদ্যার জোরে গ্রামসি, লাকাঁ, আলথুসের, ফুকো ও দেরিদাকে ব্যাখ্যা করেন। তারা সবাই ডারউইন ও মার্কসের কমবেশি শত বছর পরের মানুষ। ভলতেয়ার ডারউইন ও মার্কসের শত বছর আগে মৃত্যুবরণ করেছেন। এ যুগে এসে আপনি তাদের ধর্মবিশ্বাসের ভিতরে রেখে ব্যাখ্যা করবেন তারচেয়ে হাস্যকর কিছু পৃথিবীতে নেই। এখনতো বিজ্ঞানের যুগ। আস্তিক্যবাদে থাকতে হলেও তা প্রমাণ করেই থাকতে হবে। প্রমাণ ছাড়া আধুনিক সভ্য মানুষ কিছু মেনে নিবে না। কেবল সাময়িকভাবে বিভ্রান্ত করতে পারবে পশ্চাৎপদ কিছু মানুষকে। এটা দার্শনিক দায়িত্ব নয়।
তাহলে কেন মানুষ সলিমুল্লাহ খানদের ভুয়ো দর্শন ব্যাখ্যা এতো মোহিত হয়ে শুনেন? কারণ একটাই সলিমুল্লাহ খান গ্রামসি, লাকাঁ, আলথুসের, ফুকো ও দেরিদার নাম নিলেও তার প্রকৃত ভাবনাটা ব্যাখ্যা করেন না। তিনি ভুল গ্রামসি, ভুল লাকাঁ, ভুল আলথুসের, ভুল ফুকো ও ভুল দেরিদাকে তুলে ধরতে চান। তিনি ভুলভাবে দেখাতে চান যে, এরা নাস্তিক্যবাদী দর্শনের মানুষ নন। তার ভুল ভাবনাকেই তিনি উত্তরাধুনিক ভাবনা বলে চালাতে চান যা বাস্তবতার বিপরীত। ফলে এক শ্রেণির বিশ্বাসী মানুষের কাছে সলিমুল্লাহ খান আদরের মানুষ হয়ে উঠেছেন। এতো চমৎকার করে ভুল দর্শন শেখানোর লোক পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। ফলে বিশ্বাসীরা যখন দেখে এতো এতো জ্ঞানীদের কথা বলে যে লোকটি নিজের অস্তিত্ববাদকে উপস্থাপন করছেন তার চেয়ে গ্রহণীয় জন ও পূজনীয় জন আর কে হবেন? তিনি ভুলভাবে রিচার্ড ডকিন্সকে ব্যাখ্যা দিবেন, ভুল ভাবে উপস্থাপন করবেন কিয়ের্কেগার্ড, ফ্রেডরিক নিৎশে বা আলবেয়ার কামুকে। সেই উদ্দেশ্য একটাই। তিনি ইউরোপের আধুনিক দার্শনিকদের মুখস্থ করে ফেলেছেন কিন্তু তাদের অন্তঃসারটা ধরতে পারেননি। সলিমুল্লাহ খান নিজেকে বিশ্বাসী মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন দুই ভাবে। হয় তিনি নাস্তিক্যবাদী কিন্তু সুবিধা নেয়ার জন্য তিনি আস্তিক্যবাদীর ভাব ধরেছেন। যেমনটা পিনাকী ভাব ধরে আছেন। অথবা তিনি বাস্তবিকই দর্শন না বুঝে আস্তিক্যবাদী হিসেবেই রয়েছেন। তার সাথে কথা বলে এবং আচরণে মনে হল তিনি নিজেকে আস্তিক্যবাদী হিসেবেই দেখাতে চান। যদি ভিতরটা তাই হয় তবে বলতেই হয়, তিনি দর্শনের বইগুলো চিবিয়ে খেয়েছেন। তার ভিতরে কাগজগুলো খসখস করছে কিন্তু তার ভাব তিনি বুঝতে পারেননি।
আহমদ ছফা অবশ্যই একজন মানবিক মানুষ। তাঁর মানবিকতার বহু প্রমাণই আমরা দেখেছি। বিপরীতে তারই শিষ্য (?) সলিমুল্লাহ খানের জীবনভরই দেখেছি অমানবিকতা। তিনি আহমদ ছফাকে বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ লেখক হিসেবে প্রচার দিয়ে থাকেন। এটা যে, আহমদ ছফাকেও ছোট করা হয় এবং বেঁচে থাকলে আহমদ ছফাও লজ্জিত হতেন সে বোধটুকুও সলিমুল্লাহ খানের নেই। তিনি সাম্প্রতিক সময়ে কমিউনিস্ট বিরোধীও। এর বিরোধিতার সাথে অবশ্য রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক রয়েছে। একদিন সলিমুল্লাহ খান আবিষ্কার করলেন, ছফাই বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ লেখক। আবিষ্কার করেই গেলেন, মার্কসবাদী তাত্ত্বিক কমরেড হায়দার আকবর খান রনোর কাছে। গিয়েই বললেন, ‘রনো ভাই, বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের চেয়েও একজন বড় লেখককে আমি আবিষ্কার করেছি। আমি সেটা প্রমাণ করে ছাড়বো।’ রনো ভাই বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘বাংলা সাহিত্যে! বলো কি? কে সে?’ সলিমুল্লাহ খান বললেন, ‘আহমদ ছফা!’ কমরেড হায়দার আকবর খান রনো খুবই ঠাণ্ডা প্রকৃতির মানুষ। তাঁকে রেগে যেতে খুব কম মানুষই দেখেছেন। সলিমুল্লাহর কথা শুনে খুবই রেগে গেলেন। বললেন, ‘এ কথা শুনলে আহমদ ছফাও লজ্জা পেতেন। তুমি বের হও আমার বাসা থেকে। আর কখনো আসবা না।’ সেই রাগ দেখে সলিমুল্লাহ খান বেরিয়ে গেলেন। কিন্তু তারপর থেকে কমিউনিস্টদের বিরোধিতাটাও শুরু করলেন। গল্পটি বলেছিলেন, সেখানে উপস্থিত থাকা একজন লেখক বন্ধু। সলিমুল্লাহ অনবরত রবীন্দ্র বিরোধিতা করতে গিয়ে বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছেন। তার এই বক্তব্যকে অসংখ্যবার চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। তিনি সেদিকে ফিরেও তাকান না। মেজর জেনারেল এম এ মতিনের বইতে বা এসংক্রান্ত দাবিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করার যে কথা বলা হয়েছে। এই দাবিটি সঠিক নয়। ১৯১২ সালের ২৮ মার্চ বা গড়ের মাঠের যে সমাবেশের কথা বলা হয়, সেখানে রবীন্দ্রনাথের উপস্থিত থাকার বা বিরোধিতা করার কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং ওই সময়ে তিনি শিলাইদহে অবস্থান করছিলেন। মিথ্যা তথ্য দিয়ে লেখা বইতো রেফারেন্স হতে পারে না—এটা সলিমুল্লাহ বোঝবেন না!
শেখ তাসলিমা মুনের এখনকার পরিচয়, ‘আমি একটি বাজপাখিকে হত্যা করতে চেয়েছিলাম’ নামের বইটির জন্য। তিনি যখন মাত্র ছয় বছরের শিশু তার চোখ দিয়ে একাত্তরকে যেমন দেখেছেন তা নিয়েই বইটি। তিনি ওই শৈশবেই পরিবারের লোকদের যুদ্ধের বলি হতে দেখেছেন। তাঁর পিতা শহীদ বুদ্ধিজীবী শেখ আবদুল সালাম। তিনি স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক আন্তর্জাতিক আইনে মাস্টার্স করেছেন। শৈশবে খুন করতে চাওয়া বাজপাখিটি ছিল আকাশের একটি বিমান। পরিণত বয়সে তাঁর জীবনেও একটি বাজপাখি হানা দেয়—তার নাম সলিমুল্লাহ খান। এই বাজপাখিটির দানবিক আচরণ তাঁকে হতভম্ব করেছিল।

সলিমুল্লাহর দানবিক আচরণের কথা তিনি লিখেছেন ‘যদ্যপি আমার গুরু-পতি’ বইটিতে। তাসলিমা মুন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে প্রথম ক্লাসেই পেয়েছিলেন খ-কালীন শিক্ষক সলিমুল্লাহ খানকে। মানুষকে মুগ্ধ করে দেয়ার ক্ষমতা সলিমুল্লাহর ছিলই। সেই মুগ্ধতার পরিণতিতে ১৮ বছর পরে তারা পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। মুনের আগের সংসারের এক পুত্র ছিল—হৃদম। আর সলিমুল্লার সংসারে আসে এক অটিস্টিক সন্তান অর্থ। হৃদম খুবই মানবিক এক শিশু। তার প্রতি সলিমুল্লাহর নিষ্ঠুর আচরণের কথা আমরা পড়েছি। হৃদমের পড়ার খচর দিতে অস্বীকার করে স্ত্রীকে বলেছিলেন, ‘তোমার মাসে দেড় হাজারের পরিবার আমি চালাতে পারব না। তোমার এ বিলাসবহুল মাসের খরচ আমি চালাতে যাব কী কারণ? আর হৃদমের এ রাজকীয় খরচ আমি কেন দিতে যাব? দুদিন পর পর সে স্টকহোমে যাবে তার খরচ আমি কেন দেব?’ মুন আক্ষেপ করে বলেছে, ‘এমন শান্ত নিরীহ মানুষের জিহ্বায় যে এত বিষাক্ত ক্ষুর কিভাবে থাকে সেটি আমি চেয়ে চেয়ে দেখি আর অবাক হই।’ হৃদমের সাথে বহু জঘন্য আচরণই করে সে। নিজের অটিস্টিক সন্তানটির জন্য হৃদমের প্রতি তার ঈর্ষা আমরা বুঝতে পারি।

অথচ দুই ভাইয়ের মধ্যে খুব ভাব। হৃদম অর্থকে বেশ ভালবাসে কিন্তু সলিমুল্লাহর তা সহ্য হয় না। সে হৃদমকে বলে দেয়, যেন অর্থকে না ধরে। বলে, তোমার সাথে অর্থ থাকলে তোমার মতো খারাপ ছেলে হয়ে যাবে। তুচ্ছ কারণে মুনের সামনেই তার ছেলেটিকে মারধর করে। একদম ঝাপিয়ে পড়ে আক্রমণ করে। কিছু না করেও ছেলেটি বলতে থাকে, ‘স্যরি বাপি স্যরি, আর করব না, আর বলব না। আর বলব না।’ অথচ সে কিছু করেনি। তার মাকে বলতো, ‘আমি কিছু করিনি মা!’ স্টকহোমে থাকতেও ছেলেটিকে নির্দয়ভাবে মারতো। কিন্তু তার মা সলিমুল্লাহকে ভালবেসে বিয়ে করেছে বলে, সে কখনোই মাকে মার খাওয়ার কথা বলতো না। সুযোগ পেলেই এমন একটি মানবিক শিশুকে কী নির্দয়ভাবেই না প্রহার কতো সলিমুল্লাহ খান! দেয়ালে মাথা ঠেসে ধরতো। দুই গালে অনবরত চড় মারতো। মুন একদিন আড়াল থেকেও দেখে। তারপর সলিমুল্লাহকে বাসা থেকে বের করে দেয়।


সলিমুল্লাহর সাথে আরেকজন মানে সেই ফরহাদ মজহারের খুব ভাব ছিল। সলিমুল্লাকে মজহারের বউ দুই বছর রান্না করে খাইয়েছেন। কিন্তু সলিমুল্লাহ বিয়ে করার সময় মজহারের বউকে জানায়নি। সলিমুল্লাহ হোট করে একদিন মজহারের বাড়িতে গিয়ে উঠে সস্ত্রীক। সলিমুল্লাহর বউকে দেখেই খেপে যায় মজহারের বউ। মজহারের বউ সলিমুল্লাহর বউকে বলেছিল, ‘দুই বছর এক পরপুরুষকে আরেক জনের বউ রান্না করে কেন খাওয়ায় তা কি তুমি বুঝ?’ সর্বনাশ! আপনারা আবার অন্য কিছু বুঝে নিবেন না। আপনারাতো জানেন যে, ফরহাদ মজহারের সাথে সলিমুল্লাহ খানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই খুব খারাপ। দুজন দুজনকে দেখতে পারেন না। বিশেষ করে ফরহাদ মজহার তো খুবই খ্যাপা। তার কারণ কিন্তু আমাদের অজানা। এখন মজহার আবার দরবেশ সেজেছেন। অর্চনা রানী নামের এক হিন্দু নারী আবার তার যৌনতা হরণের অভিযোগও করেছিল। যে কারণে মজহার লাপাত্তাও হয়ে গিয়ে প্রচার দিয়েছিলেন অপহৃত হওয়ার।


একজন মানবিক মানুষের কিছু গুণাবলি থাকে। আবার একজন নষ্ট মানুষেরও কিছু দোষাবলি থাকে। সলিমুল্লাহ খানকে দেখলে কি একটি অটিস্টিক ভাব দেখতে পান? সলিমুল্লাহর মেধাটাও একপেশে। সেটাতে প্রচুর স্মরণশক্তি রয়েছে কিন্তু তা যে বিকশিত হয়নি, মানবিক হয়নি—তা সহজেই বুঝতে পারি। মাদ্রাসায় ছোট ছোট শিশুদের নিপীড়নের শিকার হতে দেখি। বলাৎকার হতে দেখি অহরহই। সলিমুল্লাহও শিশুদের নির্দয়ভাবে নিপীড়ন করতে ভালবাসেন। নির্দয়তার মিলটা আমরা দেখি এবং বুঝতে পারি কেন দুজন দুজনার। তিনি গুরু আহমদ ছফাকে উঁচুতে তুলতে গিয়ে লজ্জার মধ্যে ফেলে দিচ্ছেন সেই অবিকশিত মেধার কারণেই।

আহমদ ছফাকে হাজার টানলেও কি রবীন্দ্রনাথ হবেন? নাকি সেটা তাঁকে ছোট করে দেয়া হবে? সেই ভুল আবিষ্কার সত্য বানাতে দিনভর রবীন্দ্রনাথের ভুল ধরে বেড়াবেন, সেই অবিকশিত মেধার কারণেই। ভাল বলতে পারা, ভাল মুখস্থ করতে পারা অবশ্যই ভাল গুণ। সেটাকে কিভাবে অপব্যবহার করতে হয় সেটাই দেখাচ্ছেন সলিমুল্লাহ খান। সলিমুল্লাহর এই মানসিক সংকট নিয়ে একটি দুর্দান্ত সিনেমা হতে পারে। যার করুণ পরিণতি ছাড়া সিনেমার সমাপ্তি হবে না। সলিমুল্লাহর পক্ষে এসব বুঝতে পারা কোনদিনই সম্ভব হবে না।


মুন্সীগঞ্জে আমার সাথে দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎ হয়। আমাকে দেখেই সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও হুমায়ুন আজাদের বিষেদগার শুরু করলেন। দাবি করলেন, আজাদের সব লেখাই অন্যের কাছ থেকে মেরে দিয়ে লেখা। সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে একই কথা বললেন যা আগে বলেছেন। মনে হলো তিনি কথাগুলো মুখস্থ করে রাখার মতোই বলে যাচ্ছেন। আমি যেসব প্রশ্ন করেছিলাম, সেগুলো আমলে নেননি। সেই একইভাবে মাদ্রাসা শিক্ষাকে মহিমান্বিত করলেন। আমি আবারও কিছু প্রশ্ন করলাম। তিনি উত্তর দিতে গিয়ে চলে গেলেন আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে। এটি নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয়। বাস্তবিক আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় হয় ১৯৬১ সালে। আগে এটি মাদ্রাসা ছিল। মাদ্রাসা ধরলেও প্রাচীন নালন্দা মহাবিহার বা নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় খ্রিস্টীয় ৪২৭ অব্দে (পঞ্চম শতাব্দীতে) গুপ্ত সম্রাট প্রথম কুমারগুপ্তর সময়ে প্রতিষ্ঠা হয় যা ইসলাম আসারও বহু আগের কথা।


তিনি হুমায়ুন আজাদের বিরুদ্ধে ভুয়া কুম্ভিলকবৃত্তির অভিযোগ আনেন। এটা করেন আহমদ ছফার সাথে হুমায়ুন আজাদের বিতর্কের কারণে। হুমায়ুন আজাদ তসলিমা নাসরিন, সৈয়দ শামসুল হক ও হুমায়ূন আহমেদের সাথে বিতর্কে জড়ান। বিষয়টি আমারও পছন্দ ছিল না। আমি হুমায়ুন আজাদ স্যারকেও অনুরোধ করে বলেছিলাম, স্যার আমরা আপনাদের চারজনকেই পছন্দ করি। আপনাদের ঝগড়া আমাদের সমস্যায় ফেলছে। একজন খ্যাতিমান লেখক জানালেন, ‘সলিমুল্লাহ খানের প্রতি করুণা হয়!’ তিনি ইনবক্সে লিখেছেন, ‘আমি আপনাকে দুটো লেখা শেয়ার করবো। প্রথম আলোতে ছাপা হয়েছিল দুটোই। তারপর তিনি আমার লেখার একাংশ পুরাই মেরে দিয়ে একটা চ্যাপটার লিখেছেন তার বইতে। সেটা নিয়েও লিখেছি বিডিনিউজ এ।’ আরো কয়েকজন সম্পাদক ও লেখকের সাথেও কথা হল। তাতে বুঝলাম, ‘এতো ভাল রেজাল্টধারী একজনের প্রতি কেন তারা করুণা করতে চান!’

শেয়ার করূন

আপনার মতামত

সর্বশেষ