আজ মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬ ইং

Advertise

মুক্তমত

নিউজ ডেস্ক

১৯ অক্টোবর, ২০২৬ ০০:১০


সর্বশেষ আপডেট :
১৯ অক্টোবর, ২০২৬ ০০:১১

১৯৭৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য শেখ মুজিবের নাম পাঠিয়েছিলেন তৎকালীন স্পিকার

শেখ মুজিবুর রহমান যেন ১৯৭৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পান, সে লক্ষ্যে উদ্যোগ নিয়েছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। এর অংশ হিসেবে জাতীয় সংসদের স্পিকার ও আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল মালেক উকিল নরওয়ের নোবেল কমিটির কাছে মনোনয়ন হিসেবে শেখ মুজিবের নাম জমা দিয়েছিলেন।

ওই বছর শান্তিতে নোবেল জিতেছিলেন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পদার্থবিদ ও মানবাধিকারকর্মী আন্দ্রেই সাখারভ। এ পুরস্কারের জন্য জমা পড়েছিল মোট ১২১টি মনোনয়ন।

নোবেল পুরস্কারের মনোনয়নসংক্রান্ত নথি ৫০ বছর গোপন রাখা হয়। সেই সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ায় প্রকাশ্যে এসেছে ১৯৭৫ সালের মনোনয়নসংক্রান্ত তথ্য। সম্প্রতি তালিকাটি স্ট্রিমের নজরে এসেছে।

মনোনয়নদাতা মালেক উকিল মনোনয়নপত্রে কী যুক্তি তুলে ধরেছিলেন এবং পরে নোবেল কমিটির সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ হয়েছিল কি না, তা জানার চেষ্টা করছে স্ট্রিম।

১৯৭৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারের মনোনয়ন তালিকায় কারা ছিলেন

নোবেল শান্তি পুরস্কারের ১৯৭৫ সালের মনোনয়ন আর্কাইভের তথ্য অনুযায়ী, সেই বছর ১২১টি মনোনয়ন জমা পড়েছিল। এসব মনোনয়নে ৩৫ জন ব্যক্তি ও ১২টি প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার নাম ছিল। একই ব্যক্তি বা সংস্থা একাধিকবার মনোনীত হওয়ায় মনোনয়নের সংখ্যা ও স্বতন্ত্র ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এক নয়।

ব্যক্তিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৩টি মনোনয়ন পেয়েছিলেন সোভিয়েত পদার্থবিদ ও মানবাধিকারকর্মী আন্দ্রেই সাখারভ। এ ছাড়া এলি ভিজেল ৮টি, ফেলিক্স উফুয়ে-বোয়িনি ৭টি, ভারতের রমেশ চন্দ্র ৬টি এবং ব্রাজিলের ধর্মযাজক হেল্ডার কামারা ৫টি মনোনয়ন পেয়েছিলেন।

তবে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পাওয়া মানেই নোবেল কমিটির স্বীকৃতি পাওয়া নয়। এটি যোগ্য মনোনয়নদাতার দেওয়া প্রস্তাব। তাই ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের মনোনয়নের তথ্য পাওয়া গেলেও, এ থেকে বলা যায় না যে ওই বছর তাঁর নাম সংক্ষিপ্ত তালিকায় ছিল বা তিনি পুরস্কারের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন।
একবার করে মনোনয়ন পাওয়া ২৭ জনের মধ্যে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন, মাদার তেরেসা, শেখ মুজিবুর রহমান, ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট উরহো কেকোনেন, জাম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট কেনেথ কাউন্ডাসহ বিভিন্ন দেশের রাজনীতিবিদ, বিজ্ঞানী, কূটনীতিক, মানবাধিকারকর্মী ও শান্তি আন্দোলনের কর্মীরা।

সংস্থাগুলোর মধ্যে ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশন অব দ্য স্কাউট মুভমেন্ট এবং ওয়ার্ল্ড অ্যাসোসিয়েশন অব গার্ল গাইডস অ্যান্ড গার্ল স্কাউটস ২৫টি করে মনোনয়ন পেয়েছিল।

নোবেল শান্তি পুরস্কারের মনোনয়ন ও বাছাইপ্রক্রিয়া

নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন জমা দিতে হয় নরওয়ের নোবেল কমিটির কাছে। কেবল নির্দিষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিরাই তাঁদের পছন্দের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে কেন ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কারের জন্য বিবেচনা করা উচিত, তার যুক্তিও তুলে ধরতে হয়। সাধারণত মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ সময় সংশ্লিষ্ট বছরের ৩১ জানুয়ারি।

জমা পড়া মনোনয়নগুলো পর্যালোচনা করে নোবেল কমিটি প্রার্থীদের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করে। এরপর কমিটির স্থায়ী উপদেষ্টা এবং নরওয়ের ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় প্রার্থীদের কাজ ও অবদান মূল্যায়ন করা হয়। এই প্রক্রিয়া শেষে কমিটি পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম চূড়ান্ত করে।


১৯৭৫ সালের আর্কাইভে তৎকালীন জাতীয় সংসদের স্পিকার আবদুল মালেক উকিলের নাম মনোনয়নদাতা হিসেবে রয়েছে। ছবি: নোবেল আর্কাইভ থেকে নেওয়া স্ক্রিনশট
১৯৭৫ সালের আর্কাইভে তৎকালীন জাতীয় সংসদের স্পিকার আবদুল মালেক উকিলের নাম মনোনয়নদাতা হিসেবে রয়েছে। ছবি: নোবেল আর্কাইভ থেকে নেওয়া স্ক্রিনশট

তবে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পাওয়া মানেই নোবেল কমিটির স্বীকৃতি পাওয়া নয়। এটি যোগ্য মনোনয়নদাতার দেওয়া একটি প্রস্তাব। তাই ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের মনোনয়নের তথ্য পাওয়া গেলেও, এ থেকে বলা যায় না যে ওই বছর তাঁর নাম সংক্ষিপ্ত তালিকায় ছিল বা তিনি পুরস্কারের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন। বিষয়টি সম্পর্কে আরও তথ্য জানতে নোবেল কমিটির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছে স্ট্রিম।

নোবেল শান্তি পুরস্কারে মনোনয়নদাতার যোগ্যতা কী?
নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য কাউকে মনোনয়ন দিতে নরওয়ের নোবেল কমিটির আলাদা আমন্ত্রণের প্রয়োজন হয় না। তবে যে কেউ চাইলেই এই পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দিতে পারেন না। মনোনয়নদাতাকে নির্দিষ্ট যোগ্যতার আওতায় পড়তে হয়।

নোবেল শান্তি পুরস্কারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নিয়ম অনুযায়ী, স্বাধীন দেশের জাতীয় সংসদের সদস্য, সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য এবং দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রপ্রধানেরা মনোনয়ন দিতে পারেন। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ও স্থায়ী সালিশি আদালতের সদস্য, আন্তর্জাতিক আইনবিষয়ক ইনস্টিটিউটের সদস্য এবং উইমেনস ইন্টারন্যাশনাল লীগ ফর পিস অ্যান্ড ফ্রিডমের আন্তর্জাতিক পর্ষদের সদস্যরাও এই যোগ্যতার আওতায় পড়েন। ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, আইন, দর্শন ও ধর্মতত্ত্বের নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর ও পরিচালক এবং শান্তি গবেষণা ও পররাষ্ট্রনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালকেরাও মনোনয়ন দিতে পারেন।

নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য কাউকে মনোনয়ন দিতে নরওয়ের নোবেল কমিটির আলাদা আমন্ত্রণের প্রয়োজন হয় না। তবে যে কেউ চাইলেই এই পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দিতে পারেন না। মনোনয়নদাতাকে নির্দিষ্ট যোগ্যতার আওতায় পড়তে হয়।
এ ছাড়া আগের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী, পুরস্কার পাওয়া প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার পরিচালনা পর্ষদের সদস্য, নরওয়ের নোবেল কমিটির বর্তমান ও সাবেক সদস্য এবং কমিটির সাবেক উপদেষ্টারাও মনোনয়ন দিতে পারেন।

১৯৭৫ সালের নোবেল আর্কাইভে সংসদ সদস্যদের মনোনয়ন দেওয়ার নজির রয়েছে। সোভিয়েত পদার্থবিদ ও মানবাধিকারকর্মী আন্দ্রেই সাখারভকে নরওয়ের সংসদের ১৩ সদস্য মনোনয়ন দিয়েছিলেন। তাঁদের মনোনয়নে মৌলিক মানবাধিকার রক্ষায় সাখারভের ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়। একই বছর ইসরায়েল সরকারের ও সংসদের কয়েকজন সদস্যও তাঁকে মনোনয়ন দিয়েছিলেন।

১৯৭৫ সালের আর্কাইভে আবদুল মালেক উকিলের নামও মনোনয়নদাতা হিসেবে রয়েছে। সে সময় তিনি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার ছিলেন।


কে এই মালেক উকিল
আবদুল মালেক উকিল ছিলেন আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা, শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রিসভার সদস্য এবং জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন তিনি। ইস্ট বেঙ্গল মুসলিম ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন ছিলেন। ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়ে মিছিল ও পিকেটিংয়ে যুক্ত হন তিনি। পরে ছয় দফা আন্দোলনেও সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

১৯৫৩ সালে নোয়াখালী সদর মহকুমা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন মালেক উকিল। পরে নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রিসভায় স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৪ সালের ২৮ জানুয়ারি জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হন মালেক উকিল। ১৯৭৫ সালের ৫ নভেম্বর পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন। ফলে শেখ মুজিবুর রহমানের নোবেল শান্তি পুরস্কারের মনোনয়নের বছর তিনি সংসদের স্পিকার ছিলেন।

শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখেন মালেক উকিল। ১৯৭৮ সালে আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। তাঁর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩৯টি আসনে জয়ী হয়। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা দলের সভাপতি নির্বাচিত হলে মালেক উকিল সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হন। ১৯৮৬ সালে আবারও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮৭ সালের ১৭ অক্টোবর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

শেয়ার করূন

আপনার মতামত

সর্বশেষ