আজ শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ইং

Advertise

আন্তর্জাতিক

মির মুনহাজ হক

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৭:২২

"কবিরা যখন পা চাটা কুকুর হয়ে যায়, কবির ভাষা আর ক্ষমতার ভাষা যখন এক হয়ে যায় "

"কবিরা যখন পা চাটা কুকুর হয়ে যায়
কবির ভাষা আর ক্ষমতার ভাষা যখন এক হয়ে যায় "
“রবীন্দ্রনাথ যা লিখেছেন, সব বৌদির উদ্দেশ্যে—আর কারও জন্য না।”


বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক এবং কবি রেজাউদ্দিন স্টালিনের নামে প্রচারিত এই বক্তব্যটি দেখে প্রথমে বিস্মিত হয়েছি। তারপর আমি নিজ কানেও শুনেছি এবং বিস্মিত হয়েছি । আরও বিস্মিত হয়েছি যে, এমন একটি মন্তব্য এমন এক অনুষ্ঠানে এসেছে, যেখানে রবীন্দ্রনাথকে এভাবে টেনে আনার প্রাসঙ্গিকতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।


রবীন্দ্রনাথের বিশাল সাহিত্যকর্মকে ‘বৌদি’র উদ্দেশ্যে লেখা—এমন একটি সরলীকৃত বাক্যে নামিয়ে আনা নিছক রসিকতা হলেও তা আমার কাছে রুচিসম্মত মনে হয় না। আর যদি এর সঙ্গে সমকালীন রাজনৈতিক অবস্থান বা কোনো পক্ষকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্য যুক্ত হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি আরও হতাশাজনক।
কারণ রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এই টানাটানি আমাদের নতুন নয়।


কখনো রবীন্দ্রনাথ বনাম নজরুল দাঁড় করানো হয়েছে। কখনো কে বড় কবি—এই অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতা তৈরি করা হয়েছে। কখনো রবীন্দ্রনাথকে ‘হিন্দুদের কবি’, নজরুলকে ‘মুসলমানদের কবি’ বানিয়ে তাঁদের বিশাল সৃষ্টিজগৎকে ধর্মীয় পরিচয়ের ছোট ছোট ঘরে বন্দী করার চেষ্টা হয়েছে।


অথচ রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসতে নজরুলকে ছোট করতে হয় না। নজরুলকে ধারণ করতে রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করতে হয় না।
বড় কবির সবচেয়ে বড় পরিচয়ই হলো—তিনি কোনো দল, ধর্ম, সরকার কিংবা একটি বিশেষ সময়ের সম্পত্তি নন।
আর এখানেই একজন কবির দায়িত্ব একজন রাজনৈতিক কর্মীর চেয়ে আলাদা।


একজন রাজনীতিক তাঁর দলের পক্ষে কথা বলবেন, তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করবেন—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একজন কবি, লেখক কিংবা শিল্পীর কাছ থেকে আমরা আরেকটু বেশি প্রত্যাশা করি। তাঁর কাছে আমরা স্বাধীন চিন্তা চাই, প্রশ্ন করার সাহস চাই, সৌন্দর্যবোধ চাই, অসহিষ্ণুতার বিপরীতে মানবিকতা চাই।
বিশেষ করে সেই কবি যখন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মতো একটি জাতীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকেন, তখন তাঁর বক্তব্য আর শুধু ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁর কথার সঙ্গে একটি প্রতিষ্ঠানের মর্যাদাও এসে যুক্ত হয়।
তাই আমার প্রশ্ন—


শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমির মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কি ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের জায়গা, নাকি সরকার ও রাজনৈতিক পালাবদলের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে ধারণ করার প্রতিষ্ঠান?


সরকার আসবে, সরকার যাবে। রাজনৈতিক মতাদর্শের পরিবর্তন হবে। আজ যাঁরা ক্ষমতায় আছেন, কাল তাঁরা নাও থাকতে পারেন।
কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো থাকবে।


তাই এই ধরনের স্বায়ত্তশাসিত বা জাতীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে এমন মানুষদেরই দেখতে চাই, যাঁদের প্রথম দায়বদ্ধতা কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক বলয়ের প্রতি নয়—শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং মানুষের স্বাধীন সৃজনশীলতার প্রতি।


ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা অপরাধ নয়। কোনো শিল্পীর রাজনৈতিক মত থাকাও অপরাধ নয়। বরং একজন শিল্পীরও পূর্ণ রাজনৈতিক স্বাধীনতা থাকা উচিত।
সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন রাজনৈতিক আনুগত্য শিল্পীর স্বাধীন বিবেচনাবোধকে গ্রাস করে ফেলে; যখন প্রশ্নের জায়গা দখল করে প্রশস্তি, আর বিবেকের জায়গা দখল করে তোষামোদ।


তখন ক্ষতিটা শুধু একজন কবির হয় না।
ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি সমাজের সাংস্কৃতিক পরিসর।


কারণ কবি, লেখক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীরাও যখন ক্ষমতার ভাষায় কথা বলতে শুরু করেন, তখন ক্ষমতাকে প্রশ্ন করবে কে?
একটি সুস্থ সমাজে শিল্পীর কাজ শুধু সুন্দর কবিতা লেখা, অভিনয় করা কিংবা ছবি আঁকা নয়। শিল্প ও সাহিত্য আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়, ভিন্নমতকে জায়গা দিতে শেখায়, মানুষের মধ্যে সহিষ্ণুতা তৈরি করে।


আর সেই জায়গা যখন সংকুচিত হতে থাকে, তখন সমাজে তৈরি হয় বিপজ্জনক শূন্যতা।
অসহিষ্ণুতা কখনো একা আসে না। তখন সেই পরিবেশ হাদিদের মতো অতি বিপ্লবী জঙ্গি তৈরি করে ।


এর সঙ্গে আসে বিভাজন। আসে ‘আমি ঠিক, তুমি ভুল’ মানসিকতা। আসে ভিন্নমতকে শত্রু ভাবার প্রবণতা। আর দীর্ঘদিন এমন পরিবেশ চলতে থাকলে সেই শূন্যতায় ধর্মীয় মৌলবাদ, রাজনৈতিক চরমপন্থা কিংবা অতি-বিপ্লবী সহিংস চিন্তার উত্থানের জন্যও অনুকূল পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বড় সংকটও সম্ভবত এখানে।


যে যখন ক্ষমতায় যায়, তার একাংশ ভাবতে শুরু করে—এই ক্ষমতা বুঝি চিরদিনের।
আর বিরোধী মত মানেই যেন শত্রু।


এক দল ক্ষমতায় এলে অন্য দলকে নিশ্চিহ্ন করতে চাইবে; আবার সময় বদলালে অন্য পক্ষ একই কাজ করবে—এই প্রতিশোধের চক্র চলতে থাকলে রাষ্ট্র হয়তো চলবে, কিন্তু সমাজ ক্রমশ অসুস্থ হতে থাকবে।


এখানে আমাদের মূলধারার লেখক, কবি, বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিকর্মীদের নীরবতার কথাও বলতে হয়।
অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের একটি বড় অংশকে নীরব থাকতে দেখি।
তবে এই নীরবতার বিচার করাও সহজ নয়।


দেশে যাঁরা বসবাস করেন, তাঁদের নিরাপত্তা আছে, পরিবার আছে, পেশা আছে। এমন একটি পরিবেশে যদি সমালোচনা মানেই কারও বিপক্ষে অবস্থান, প্রশ্ন মানেই শত্রুপক্ষ, দ্বিমত মানেই রাজনৈতিক পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়—তাহলে অনেক মানুষই একসময় কথা বলার চেয়ে চুপ থাকাকে নিরাপদ মনে করবেন।
এই ভয়টাও একটি সমাজের জন্য শুভ লক্ষণ নয়।


তাহলে মুক্তির পথ কোথায়?
আমার কাছে পথটি কঠিন, কিন্তু খুব জটিল নয়—
সহিষ্ণু হওয়া।


অন্যের মত প্রকাশের অধিকারকে সম্মান করা। সমালোচনাকে শত্রুতা মনে না করা। ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী সম্পত্তি ভাবা বন্ধ করা।
কখনো কখনো পরাজয় মেনে নেওয়াও গণতন্ত্র।
কেন পরাজিত হলাম—সেটি খুঁজে দেখা। নিজের ভুল স্বীকার করা। ভুলগুলো শুধরে আবার মানুষের কাছে যাওয়া। আবার প্রস্তুতি নেওয়া। আবার জয়ী হওয়ার চেষ্টা করা।


আজকের পরাজয় মানেই চিরদিনের পরাজয় নয়।
আর আজকের ক্ষমতাও চিরদিনের ক্ষমতা নয়।
এই সহজ সত্যটি আমাদের রাজনীতি যত দ্রুত শিখবে, ততই মঙ্গল।
আর কবি-শিল্পীদের কাছে আমার প্রত্যাশাটা একটু বেশি।
আপনাদের রাজনৈতিক মত থাকুক। পছন্দ থাকুক। অপছন্দও থাকুক। কিন্তু ক্ষমতার সঙ্গে সেই সম্পর্ক যেন আপনাদের স্বাধীন শিল্পীসত্তাকে গ্রাস না করে।
রবীন্দ্রনাথকে রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ব্যবহার করবেন না। নজরুলকেও নয়।
তাঁদের নিয়ে আলোচনা করুন, সমালোচনা করুন, নতুন পাঠ তৈরি করুন—কিন্তু তাঁদের বিশাল সৃষ্টিকে আমাদের ক্ষুদ্র রাজনৈতিক বিভাজনের মাপে কাটছাঁট করবেন না।


কারণ পদ সাময়িক।
ক্ষমতা সাময়িক।
সরকারও সাময়িক।
কিন্তু একজন কবির শব্দ থেকে যায়।
একজন শিল্পীর অবস্থানও ইতিহাস মনে রাখে।
তাই শেষ পর্যন্ত আমার চাওয়া খুব সামান্য—
কবির কবিতার ভাষা আর মাঠের রাজনীতিকের ভাষা যেন এক হয়ে না যায়।
শিল্পী ক্ষমতার কাছাকাছি থাকুন বা দূরে—তাঁর বিবেকটা যেন স্বাধীন থাকে।
কবিরা যেন পা চাটা কুকুর না হয়ে যায়
শুভবুদ্ধির উদয় হোক।
সূত্র: সোহেল আজাদ

শেয়ার করূন

আপনার মতামত