Advertise
১৮ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:৫৮
সর্বশেষ আপডেট :
১৮ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:৫৯
প্রতিবছর শরতে দেবী দুর্গার আগমন ঘটে। শুরু হয় শারদোৎসব। এটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ও বড় উৎসব। দেবী দুর্গা বিভিন্ন বাহনে আসেন। চলে যানও বিভিন্ন বাহনে। কখনো ঘোড়া, কখনো দোলা বা কখনো হাতিতে চড়ে দেবী দুর্গার আগমন ঘটে। মহালয়ার অমাবস্যা কাটিয়ে যখন শরতে কাশফুল, শিউলি ফুল ফোটে তখন থেকেই শুরু হয় দেবী দুর্গার আরাধনা। মূলত পূজা শুরু হয় ষষ্ঠীর মাধ্যমে। এরপর মহাসপ্তমী, মহাঅষ্টমী ও মহানবমী পেরিয়ে দশমীতে দেবী দুর্গা বিদায় নেন।
দেবীর আগমনেই একটি সুন্দর প্রকৃতি ভেসে ওঠে। এ সময় যেমন নীল আকাশে দেখা যায় সাদা মেঘ, শিউলি ফুলের সুবাসের সাথে সাথে কাশফুলের বাতাসে দোলা দেওয়া যেন এক আলাদা প্রকৃতির কাছে নিয়ে যায় আমাদের। দেবী দুর্গার পূজায় যেসব জিনিস ব্যবহৃত হয় তা এক ভিন্ন পরিবেশগত বার্তা দেয়।
দেবী দুর্গাকে বানানো হয় মাটি দিয়ে। যে মাটিই হলো মা। পরমা প্রকৃতি। এই মাটির সঙ্গে ব্যবহার করা হয় খড়, সুতলি ও আঠা। পূজার পরে আবার তা বিসর্জন দেওয়া হয় জলাশয়ে। মাটির সঙ্গে মাটি মিশে যায়। এসব উপাদানের কোনোটিই পরিবেশের ক্ষতি করে না।
সপ্তমী পূজার পূর্বে দেবীর প্রতীক হিসেবে পূজা করা হয় কলাবউকে। যিনি নবপত্রিকা। দেবীর এই প্রতীক তৈরি করা হয় নয়টি গাছের পাতা ও লতা দিয়ে। যে নয়টি গাছের পাতা ব্যবহার করা হয় তা হলো- কলা, কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, বেদানা, অশোক, মান ও ধান। পূজার এই শুরুটিই প্রকৃতি ও কৃষির গুরুত্বকে বাড়িয়ে দেয়। যে গাছগুলো এখানে ব্যবহার করা হচ্ছে তা ঔষধি গুণসম্পন্ন। এসব গাছ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় উপযোগী। প্রাচীনকাল থেকেই পূজায় এসব গাছের ব্যবহার মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের চিত্রকে। একই সঙ্গে এই আচারের মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণের গুরুত্বও বহন করে।
বাংলায় দুর্গাপূজার শুরু কোথায়, আগে কি শুধু রাজা-জমিদারদের উৎসব ছিল?সেকালের দুর্গাপূজা। সংগৃহীত ছবি
আবার অন্যদিকে দেবী দুর্গার বাহন হলেন সিংহ। যেহেতু মা দুর্গার বাহন সিংহ, মা দুর্গার সঙ্গে কিন্তু সিংহ প্রাণীটিও পূজিত হয়। তাকে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। সিংহকে রক্ষার বিষয়টি এভাবে যেমন তৈরি হয়, আবার নানা জীবজগৎ ও পশুপাখির সঙ্গে শাস্ত্রীয় বিভিন্ন রূপকল্পে দেবী দুর্গার সম্পর্ক রয়েছে। এসব সম্পর্ক জীববৈচিত্র্যকে টিকিয়ে রাখার বার্তা দেয়।
যেহেতু দুর্গাপূজাটি প্রাচীনকাল থেকে এমন বার্তা নিয়ে আসছে যে দুর্গাই প্রকৃতি, আবার দুর্গাই প্রকৃতির রক্ষাকর্ত্রী; সেহেতু দুর্গাপূজায় আমাদের পরিবেশের বিষয়টি সর্বাগ্রে ভাবা উচিত। দুর্গা প্রতিমা তৈরিতে যে রং ব্যবহার করা হয়, লক্ষ্য রাখা দরকার সেই রং পরিবেশবান্ধব কি না। মণ্ডপ সাজানোর ক্ষেত্রে আমাদের খেয়াল রাখা উচিত কোনো ধরনের প্লাস্টিক বা পলিথিন যেন ব্যবহার না হয়।
আমরা যে শক্তির প্রবাহের কথা বলি, পুষ্টির প্রবাহের কথা বলি; শক্তি এক রূপ থেকে অন্য রূপে রূপান্তরিত হয়। আবার সেই পূর্বের অবস্থানে ফিরে আসে। পুষ্টিও তাই। উদ্ভিদ মাটি থেকে পুষ্টি সংগ্রহ করে। আবার উদ্ভিদকে খেয়ে সেই পুষ্টি পায় প্রাণীজগৎ। আবার প্রাণীজগতের মৃত্যুর পর তা আবার মাটিতে মিশে যায়। দুর্গার মূর্তিটিও তাই। মাটির সঙ্গে মিশে গিয়ে তা আমাদের প্রকৃতির এই চক্রকে সম্পূর্ণ করে।
আবার দেবী দুর্গা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের রক্ষাকর্তা। সমস্ত সৃষ্টিজগৎকে রক্ষার দায়িত্ব তাঁর। শ্রীশ্রীচণ্ডীর একটি শ্লোকের কথা মনে করা যাক।
“যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ॥”
এই কথার অর্থ হলো- যিনি সমস্ত প্রাণীর মধ্যে শক্তিরূপে অবস্থান করেন তাঁকে বারবার নমস্কার। যিনি সমস্ত প্রাণীর মধ্যে অবস্থান করেন মানেই তিনি প্রতিটি জীব, গাছপালা ও প্রকৃতির উপাদানের মাঝে বসবাস করেন। দেবী দুর্গাকে আরাধনা করা মানেই প্রতিটি জীব, গাছপালা ও প্রকৃতিকে আরাধনা করা, তাকে রক্ষা করা।
আবার শান্তি মন্ত্রটি যদি দেখি তাতে দেখা যায়;
“ওঁ দ্যৌঃ শান্তিরন্তরিক্ষং শান্তিঃ
পৃথিবী শান্তিরাপঃ শান্তিরোষধয়ঃ শান্তিঃ।
বনস্পতয়ঃ শান্তির্বিশ্বেদেবাঃ শান্তির্ব্রহ্ম শান্তিঃ
সর্বং শান্তিঃ শান্তিরেব শান্তিঃ সা মা শান্তিরেধি।।”
এটি দিয়ে বোঝায় আকাশ শান্তিপূর্ণ হোক, মহাশূন্য ও অন্তরিক্ষ শান্তিপূর্ণ হোক, পৃথিবী শান্তিপূর্ণ হোক, জল ও ওষধি শান্তিপূর্ণ হোক। বনস্পতি ও গাছপালা আমাদের জন্য শান্তি বয়ে আনুক। সমগ্র পরিবেশের প্রতিটি উপাদান সুস্থ থাকুক।
যেহেতু দুর্গাপূজাটি প্রাচীনকাল থেকে এমন বার্তা নিয়ে আসছে যে দুর্গাই প্রকৃতি, আবার দুর্গাই প্রকৃতির রক্ষাকর্ত্রী; সেহেতু দুর্গাপূজায় আমাদের পরিবেশের বিষয়টি সর্বাগ্রে ভাবা উচিত। দুর্গা প্রতিমা তৈরিতে যে রং ব্যবহার করা হয়, লক্ষ্য রাখা দরকার সেই রং পরিবেশবান্ধব কি না। মণ্ডপ সাজানোর ক্ষেত্রে আমাদের খেয়াল রাখা উচিত কোনো ধরনের প্লাস্টিক বা পলিথিন যেন ব্যবহার না হয়।
ভারতে পূজায় পরিবেশবান্ধব বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। সেখানে মাটির প্রতিমা তৈরি করার ক্ষেত্রে খেয়াল রাখা হচ্ছে কোনো কেমিক্যালযুক্ত রং ব্যবহৃত হচ্ছে কি না। প্লাস্টিক ব্যবহার করছে না। রং ব্যবহারের ক্ষেত্রে খড়িমাটি, হলুদ, পালংশাক ইত্যাদি উজ্জ্বল উপাদান ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছে।
প্রতিমায় যে মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে সেই মাটি যেন সহজেই জলের সঙ্গে মিশে যায় সেই ধরনের মাটি তারা ব্যবহার করছে। অনেক মণ্ডপে প্লাস্টিকের গ্লাস, চামচ, পলিথিন ইত্যাদির ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। বিসর্জনের সময় যে বেল, ফুল বা পাতা ব্যবহার করা হয় তা ব্যবহার করে জৈব সার তৈরি করা হচ্ছে। পূজার থিম হিসেবে প্রকৃতির সুরক্ষা, গ্লোবাল ওয়ার্মিং, গাছ লাগানো ইত্যাদি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
দেবী দুর্গা আমাদেরও রক্ষা করেছিলেন অসুর বধ করে। আজকের দিনের অসুর হলো পরিবেশ দূষণ, গাছ কাটা, নদী দূষণ। আমাদের এই পূজার মাধ্যমে এইসব অসুরদের বধ করতে হবে। ব্রত নিতে হবে অসুরবধের মাধ্যমে নতুন সুন্দর আগামী ভবিষ্যতের।