আজ রোববার, ০২ অগাস্ট ২০২৬ ইং

Advertise

ফিচার

নিউজ ডেস্ক

০৪ অক্টোবর, ২০২৫ ০২:০০

ঢাকার প্রদর্শনীতে গাজার নিষ্ঠুরতা

শিল্পের কাজ শুধু সৌন্দর্য নির্মাণ নয়, বরং সময়ের নিষ্ঠুরতা ও মানবতার সংকটকেও ক্যানভাসে ধারণ করা। শিল্পী শেখ আনোয়ার আমজাদ হোসেনের কম্পিউটার গ্রাফিক্স সিরিজ শিল্পকর্ম যেন সেই দায় তুলে ধরে। একদিকে যুদ্ধ ও ধ্বংসের বিভীষিকা, অন্যদিকে জীবনের অবিনশ্বর আকাঙ্ক্ষা।

সিরিজের প্রথম ছবিতে দেখা যায়, যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে আছে এক নারীর অবয়ব। তবে নারীটির মুখ কিংবা চেহারা আঁকা হয়নি। বরং, তার শরীরজুড়ে প্রস্ফুটিত হয়েছে একটি ফুল। এ ফুল জীবন ও আশার প্রতীক, যা ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে নতুন করে বাঁচার সাহস জোগায়। নীল আকাশের নিচে ধ্বংসপ্রাপ্ত নগরীর কালো ধুলা ভেদ করে দাঁড়িয়ে থাকা এ ফুল যেন ঘোষণা দেয়– ধ্বংস যতই হোক, জীবন আবারও ফিরে আসবে রং ও আলো নিয়ে।

অন্য ছবিতে ফুটে উঠেছে যুদ্ধের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী রূপ। একজন মা তাঁর মৃত সন্তানকে বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। পেছনে ধ্বংসস্তূপ, ওপরে রক্তমাখা আকাশ এবং চারদিকে বিস্ফোরণের ছাপ। নীলাভ শরীরের রেখায় আঁকা সেই মায়ের মুখে যন্ত্রণা আর হতাশা স্পষ্ট। আর তাঁর বুকে লাল রঙে ফুটে ওঠা শিশুর নিথর দেহ যেন রক্তক্ষরণে ভেজা পৃথিবীর প্রতীক। এ ছবি শুধু একজন মায়ের ক্ষতি নয়, বরং সমগ্র মানবতার বেদনার দলিল।

দুটি ছবিই রঙের তীব্র বৈপরীত্যে গড়ে উঠেছে— নীল, লাল আর কালোর সংঘাতে। লাল এখানে রক্ত ও ধ্বংসের প্রতীক, নীল হলো মানবদেহ ও বেদনার প্রতিরূপ, আর ধূসর কালো ধ্বংসস্তূপ যুদ্ধের নগ্ন রূপকে প্রকাশ করে। কিন্তু সেই অন্ধকারের মাঝেও প্রথম ছবির ফুল আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানবসভ্যতা ধ্বংস হলেও আশার বীজ কখনো নিঃশেষ হয় না।

এমন ১৯ জন শিল্পীর ৩৬টি শিল্পকর্মে সাজানো এ প্রদর্শনী যেন এক বৈচিত্র্যময় শিল্পভুবন। ক্যানভাসে কখনো ফুটে উঠেছে নারী ও দেবীর রূপ, কখনো প্রকৃতির স্নিগ্ধতা বা প্রাণীর ভঙ্গিমা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের প্রাঙ্গণ যেন সজীব হয়ে উঠেছে রঙ-রেখা আর নান্দনিক আবেগের মেলায়। ১৯৯৭-৯৮ শিক্ষাবর্ষের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের এ শিল্প প্রদর্শনী শুক্রবার শুরু হয়। এ শিক্ষার্থীরা চারুকলার ৫০তম ব্যাচ হিসেবে পরিচিত। পাঁচ দিনব্যাপী এ আয়োজন চলবে ৭ অক্টোবর পর্যন্ত। চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারী এখন তাই হয়ে উঠেছে স্মৃতি, সৃজনশীলতা ও বন্ধুত্বের এক মিলনমঞ্চ।

প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন একুশে পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট শিল্পী অধ্যাপক ড. ফরিদা জামান। উদ্বোধনী আয়োজনে আরও উপস্থিত ছিলেন চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আজহারুল ইসলাম শেখ এবং শিল্পতাত্ত্বিক ও শিল্পী জাহিদ মুস্তাফা।

চারুকলার ৫০তম ব্যাচের এ আয়োজন তাই নিছক একটি প্রদর্শনী নয়, এ যেন জীবনের চলার পথে শিল্প, বন্ধুত্ব ও স্মৃতির অমলিন উদ্যাপন। এখানে দর্শক খুঁজে পাবেন শিল্পের গভীর অনুরণন, আর শিল্পীরা ফিরে পাবেন একসঙ্গে পথচলার অনন্ত আনন্দ।

শিল্পকর্মের ভেতর যেমন প্রতিফলিত হয়েছে শিল্পীর ভেতরের অভিজ্ঞতা ও সময়ের ছাপ, তেমনি গ্যালারির আঙিনায় মিলেছে এক অন্যরকম আবহ। প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা প্রাণখোলা আড্ডায়, স্মৃতিচারণে ও ছবি তোলায় যেন ফিরে গেছেন তাদের যৌবনের সেই দিনগুলোয়। যখন তারা একসাথে ক্লাস করতেন, স্বপ্ন বুনতেন আর শিল্পের ভুবনে নিজেদের যাত্রা শুরু করেছিলেন।

প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে মুহাম্মদ মেহেদী হাসান, মোহাম্মদ আলী সাগর, সুশান্ত কুমার সাহা, দেওয়ান আতিকুর রহমান, নাজিয়া মাসুদ খানসহ আরও অনেকের শিল্পকর্ম। প্রদর্শনী প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

শেয়ার করূন

আপনার মতামত