আজ রোববার, ০২ অগাস্ট ২০২৬ ইং

Advertise

ফিচার

নিউজ ডেস্ক

০৮ নভেম্বর, ২০২৫ ২৩:৫২

মাটি, মানুষ ও প্রকৃতির ছোঁয়ায় জীবনের ক্যানভাস

শীতের কুয়াশা মাড়িয়ে কয়েকজন গ্রামীণ পুরুষ হাঁটছেন কাঁচা পথে। রাস্তার দুই ধারে খেজুর গাছের সারি, তাদের কাঁধে বাঁশের দণ্ড, তার দুই পাশে ঝুলছে মাটির হাঁড়ি। হয়তো ভোরের রস সংগ্রহে বেরিয়েছেন তারা। দৃশ্যটি যেন পরিচিত, অথচ সময়ের কোথাও হারিয়ে যাওয়া।
আরেক ফ্রেমে দেখা যায়, সবুজ গাছের মাথায় সাদা দুটি বক। তারা যেন শিকারের প্রতীক্ষায় আছে। আবার কোনো ছবিতে দেখা যায়, একগুচ্ছ ফুল ফুটে আছে গাছে।

এমনই সব চিত্রকল্পে সাজানো হয়েছে শিল্পী কিরীটি রঞ্জন বিশ্বাসের ষষ্ঠ একক চিত্রপ্রদর্শনী ‘স্বপ্নভূমি’। গতকাল শুক্রবার সমকালীন চিত্রশালা শিল্পাঙ্গনের আয়োজনে রাজধানীর লালমাটিয়ায় ভূমি গ্যালারিতে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট লেখক, গবেষক ও মুক্তিযু‌দ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক।
গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুবাদে শিল্পী কিরীটি রঞ্জন বিশ্বাসের শিল্পে সবসময়ই গ্রাম্য পরিবেশ স্থান পায়। শৈশবের স্মৃতি নিয়ে তাঁর অনেক কাজ রয়েছে। সেই সময়ের স্মৃতি, মাঠ-ঘাট, প্রকৃতি, নদী, মাটি ও মানুষ– এসবই যেন তাঁর শিল্পীসত্তার মূল উপজীব্য। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। তিনি শুধু দৃশ্য আঁকেননি, বরং এক ধরনের স্মৃতি ও মমতা এঁকেছেন।

‘স্বপ্নভূমি’ নামটি যেমন কাব্যিক, তেমনি প্রতীকীও। কিরীটি রঞ্জনের ক্যানভাসে এই স্বপ্নভূমি শুধু কোনো স্থান নয়; এটি তাঁর শৈশবের স্মৃতি, মাটির গন্ধ, আর সেই সময়ের মানুষের জীবনবোধের প্রকাশ। বাস্তবধর্মী ছবিতেও তাঁর রঙে মিশে আছে এক অদ্ভুত নরম আবেশ; যেন সময়ের কুয়াশা ভেদ করে উঠে আসে অচেনা অথচ চেনা কোনো সকাল। শিল্পীর তুলিতে বারবার ফিরে এসেছে মাটির মানুষ, তাদের জীবিকা, ঋতুর রূপবদল আর এক অনন্ত প্রত্যাশা।

এগুলো শুধু ছবি নয়, এক আবহ; যা দর্শককে ফিরিয়ে নেয় তার নিজের মাটির গন্ধে ভেজা দিনগুলোয়। এখানে প্রকৃতি কখনও শান্ত, কখনও বিষণ্ন; আবার মানুষের উপস্থিতি সেই প্রকৃতির সঙ্গে অদৃশ্যভাবে মিশে গেছে। সুন্দরবন, চরাঞ্চল, কুষ্টিয়ার বাউল জীবন– এসব তাঁর ক্যানভাসে কেবল দৃশ্য নয়, আবেগও। কিরীটি রঞ্জনের কাছে স্বপ্ন মানে শুধু কল্পনা নয়, বাস্তবের এক কোমল রূপ। সেই রূপ তিনি খুঁজে পান মানুষের মুখে, নদীর ঢেউয়ে বা বাউলের একাকী সুরে। শিল্পীর ভাষায়, ‘স্বপ্নভূমি আমার কাছে কোনো জায়গা নয়, এটি স্মৃতি, ভালো লাগা, ভালোবোধের এক মিলনভূমি।’


প্রদর্শনীর উদ্বোধনীতে মফিদুল হক বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে নানা বাধা-বিপত্তি, ঘাটতি ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সমাজে সৃজনশীলতার যে তাগিদ ও প্রবাহ আমরা দেখি, সেটি কখনও কোনো গোষ্ঠী বা একক পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়। এই প্রবহমানতার ধারাতেই শিল্পী কিরীটি রঞ্জন বিশ্বাসের পথচলা। তিনি বলেন, কিরীটি রঞ্জনের কাজের বিস্তার কেবল ক্যানভাসে নয়– জনসমাগম, প্রতিবাদ কিংবা সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রেও তাঁর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। পাবলিক আর্টে তাঁর কাজ সাময়িক হলেও তা মানুষের মনে স্থায়ী ছাপ ফেলে যায়।

মফিদুল হক আরও বলেন, বাস্তববাদী ধারায় কাজ করতে কিরীটি রঞ্জন স্বচ্ছন্দ। প্রকৃতি, মানুষ ও তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক তাঁর ছবির প্রধান অনুপ্রেরণা। লোকজ সংস্কৃতি, গ্রামীণ জীবন, সংগীত–এসব উপাদান তাঁর শিল্পে প্রাণ সঞ্চার করে। তাই তাকে শুধু ক্যানভাসের ভেতরে খুঁজে পাওয়া যায় না, তাঁকে দেখতে হয় জীবনের অনাবিল ছন্দে, যাত্রাপথের আনন্দগানে। সেখানেই তাঁর শিল্প হয়ে ওঠে আলাদা, প্রাণবন্ত এবং মানবিক।

প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে শিল্পীর ৫২টি সাম্প্রতিক চিত্রকর্ম। অধিকাংশই ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিকে আঁকা। কিছু কাজ রয়েছে পেন স্কেচ ও পোস্টার কালারে। প্রদর্শনী চলবে আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত।

শেয়ার করূন

আপনার মতামত