Advertise
২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ০১:২৪
স্কুলে যাওয়া, পড়াশোনা, খেলাধূলো কিংবা সহপাঠীদের সঙ্গে হইহুল্লোড়। এ-হেন স্বাভাবিক সামাজিক নিয়মে বেড়ে ওঠার কোনও সুযোগই পাচ্ছে না দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্রের শিশু-কিশোরেরা। উল্টে, সমুদ্রপারের ‘সুপার পাওয়ার’ রাষ্ট্রের কিছু মানুষের লালসার শিকার হচ্ছে তারা। তাঁদের জন্য যৌন উত্তেজক ভিডিয়ো তৈরি করে অপরাধের অন্ধকার দুনিয়ায় তলিয়ে যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ শৈশব!
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় ওই দ্বীপরাষ্ট্রটি হল ফিলিপিন্স। সেখানকার শিশু-কিশোরদের নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদনে বহু বিস্ফোরক দাবি করেছে জনপ্রিয় মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন। তাদের দাবি, অর্থের বিনিময়ে যৌন উত্তেজক বিষয়বস্তু তৈরি করতে বাধ্য হচ্ছে ম্যানিলার প্রায় পাঁচ লক্ষ শিশু ও কিশোর। সেই টাকার বড় অংশটাই আসছে ‘সুপার পাওয়ার’ আমেরিকা থেকে।
সিএনএন-এর দাবি, ২০২০-’২২ সালের মধ্যে শিশু যৌন নিগ্রহের উপাদানের জন্য ফিলিপিন্সে ৭০ লক্ষ ডলার পাঠায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটির মোট জনসংখ্যা ১১ কোটি ৭০ লক্ষের সামান্য বেশি। যদিও সেখানকার অর্থনীতি একেবারেই মজবুত নয়। আর তাই পকেট ভরানোর উদ্দেশ্যে শিশু যৌন নির্যাতনের আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে ম্যানিলা। বিশ্বের দ্রুত বেড়ে চলা অপরাধগুলির মধ্যে এটা অন্যতম।
অতীতে একই কথা বলতে শোনা গিয়েছিল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ‘ইন্টারন্যাশনাল জাস্টিস মিশন’ বা আইজেএম-কেও। তাদের ২০২৩ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, যৌন উত্তেজক বিষয়বস্তু তৈরির জন্য ফিলিপিন্সের প্রতি ১০০ জনে একটি করে শিশু পাচার হচ্ছে । শুধু তা-ই নয়, তাদের যৌন নিগ্রহের লাইভ স্ট্রিমিংও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভুরি ভুরি উদাহরণ রয়েছে। সব জেনেও কড়া পদক্ষেপ করছে না ম্যানিলা।
ফিলিপিন্সের অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিল (এএমএলসি) জানিয়েছে, মূলত বিভিন্ন মেসেজিং অ্যাপে কয়েক ডলারের বিনিময়ে বিক্রি হয়ে থাকে শিশুদের দিয়ে তৈরি যৌন উত্তেজক বিষয়বস্তু বা ভিডিয়ো। এগুলির ক্রেতা পশ্চিমি দুনিয়ার একদল মানুষ। সেই তালিকার শীর্ষে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৫-’২৩ সালের মধ্যে এই ধরনের ভিডিয়ো সবচেয়ে বেশি কিনেছে আমেরিকাবাসীদের একাংশ।
যদিও সংশ্লিষ্ট অপরাধের জন্য শুধুমাত্র পশ্চিমি দুনিয়াকে দোষ দিতে নারাজ ফিলিপিন্স প্রশাসন। সরকারের দাবি, যৌন উত্তেজক বিষয়বস্তু তৈরির দিকে সন্তানকে ঠেলে দিচ্ছেন পরিবারের নারী সদস্যরাই। এ ব্যাপারে ম্যানিলার জাতীয় পুলিশবাহিনীকে উদ্ধৃত করে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে সিএনএন। তাতে ফাঁস হয়েছে ভুক্তভোগীদের মায়েদের কুকীর্তি।
মার্কিন গণমাধ্যমটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর (পড়ুন, ২০২৫ সাল) অনলাইনে শিশুদের যৌন নির্যাতন ও শোষণের অভিযোগে মোট ৫০ জন মহিলাকে গ্রেফতার করে ফিলিপিন্সের জাতীয় পুলিশবাহিনী। এদের মধ্যে ৩২ জনই ছিলেন নির্যাতিতাদের মা। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন আইজেএমের ‘সেন্টার টু এন্ড অনলাইন সেক্সুয়াল এক্সপ্লয়টেশন অফ চিলড্রেন’-এর এগ্জ়িকিউটিভ ডিরেক্টর জন তানাগো।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনটির শীর্ষকর্তার কথায়, ‘‘ফিলিপিন্সের পরিবারের মহিলা সদস্যেরা একটি শিশুকে যে যৌন নির্যাতন এবং লাইভ স্ট্রিমিং করতে দিচ্ছে, তার একমাত্র কারণ হল, যুক্তরাষ্ট্রের কেউ না কেউ তার জন্য ডলার দিতে ইচ্ছুক।’’ বেশ কিছু নির্যাতিতার সঙ্গে কথাও বলেছে সিএনএন। তাদের বেশির ভাগকেই মাত্র পাঁচ বছর বয়সে এই পেশায় আসতে বাধ্য করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
প্রতিবেদনে কেট (নাম পরিবর্তিত) নামের এক নির্যাতিতার অসহায়তার কথা লিখেছে সিএনএন। তাঁর দাবি, মাত্র ১৩ বছর বয়সে নিজের দিদিই ক্যামেরার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় তাঁকে। ওই সময় চরমে ছিল কোভিড অতিমারির প্রকোপ। তার মধ্যে চাকরি হারান তাঁদের বাবা। ফলে, মারাত্মক আর্থিক সঙ্কটের মধ্যে পড়ে পরিবার। সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে ওই রাস্তা ছাড়া দ্বিতীয় বিকল্প খোলা ছিল না।
সিএনএনকে কেট জানিয়েছেন, অনলাইন যৌনকর্মীর জীবন বেছে নিয়েছে তার বড় দিদি। কোভিডের সময় মূলত তাঁর টাকাতেই চলত সংসার। একদিন কেটকে বেশ কিছু খদ্দেরের দায়িত্ব নিতে বলেন তিনি। ব্যস্ততার কারণে তাঁদের সঙ্গে কিছুতেই ভার্চুয়াল সাক্ষাৎ হচ্ছিল না তাঁর। পরবর্তী সময়ে দুই প্রতিবেশীর থেকেও একই ধরনের প্রস্তাব পেতেন কেট। খদ্দেররা কমবয়সি কাউকে চাইলে কেটকে পাঠানো রেওয়াজ হয়ে যায়।
কেটের বয়ান অনুযায়ী, গোড়ার দিকে অনলাইনে প্রেমিকার ভূমিকায় অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে শুরু হত যৌন নির্যাতন। পরে যৌন-খেলনা ব্যবহারের নির্দেশ পেতেন তিনি। কেউ কেউ তো শ্বাসরোধ করে খুন এবং চাবুক মারার ব্যাপারে তাঁদের কল্পনার কথাও বলতেন। শুধু তা-ই নয়, আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে কী ভাবে তাঁর উপর অত্যাচার করার ইচ্ছা রয়েছে, এক মার্কিন নাগরিকের মুখে তারও বিস্তারিত বিবরণ শুনতে হয়েছে তাঁকে।
অনলাইন যৌন নিগ্রহের শিকার ইশার (নাম পরিবর্তিত) কাহিনি আরও করুণ। তাঁর অভিযোগ, নিজের মাসি-পিসিরাই সরাসরি সম্প্রচার করত যৌন নির্যাতনের ভিডিয়ো। এর জন্য বিবস্ত্র অবস্থায় ওই কিশোরীর ছবি তোলেন তাঁরা। বানানো হয় স্নানের ভিডিয়ো। ওই বয়সে সেটার কারণ বোঝা ইশার পক্ষে সম্ভব ছিল না। পরে তুতো ভাই-বোনদের সঙ্গে তাকে একটি আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠায় স্থানীয় প্রশাসন।
তদন্তমূলক প্রতিবেদনে সিএনএন বেশ কিছু হোয়াটস্অ্যাপ গ্রুপের কথা উল্লেখ করেছে। সেখানে যৌন উত্তেজক বিষয়বস্তু তৈরির সঙ্গে জড়িত শিশু-কিশোরদের ছদ্মনাম ব্যবহার করতে দেখা গিয়েছে। তার মধ্যে ‘রোজ়ি’ অন্যতম। ফিলিপিন্সের বহু পরিবারের বিরুদ্ধে পাঁচ-ছ’বছরের সন্তানকেও এই পেশায় ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ইশার বয়ান অনুযায়ী, মাঝরাতে বিছানা থেকে তুলে আত্মীয়েরা তাকে গান গাইতে বাধ্য করত। অনেক সময় বিদেশিরা ফোনে তার সঙ্গে কথা বলতেন। মাসি-পিসিরা তাকে ও তার তুতো ভাই-বোনদের এই নির্যাতনের কথা গোপন রাখার নির্দেশ দেন। ফলে কাজটা যে অন্যায় সেটা বুঝতে তাদের বেশি সময় লাগেনি।
শিশুদের তৈরি করা যৌন বিষয়বস্তু দেখার উপর বিশ্বব্যাপী নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তাদের উপর অনলাইন নির্যাতনও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু, তার পরেও ওয়েবসাইট থেকে মেসেজিং অ্যাপ, সর্বত্র খুব সহজেই ওই ধরনের বিষয়গুলি পাওয়া যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আবার উঠছে এতে উৎসাহ দেওয়ার অভিযোগও।
সিএনএন জানিয়েছে, বেশ কিছু টেলিগ্রাম গ্রুপে আবার শিশু-কিশোরদের তৈরি করা যৌন উত্তেজক বিষয়বস্তুর বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। সেখানে ঢুকে যে কেউ বিদ্যমান ভিডিয়ো দেখতে পারেন। এমনকি নতুন কিছুর জন্য সুনির্দিষ্ট অনুরোধও করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে অ্যাডমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে তাঁকে।
সিএনএনকে ধন্যবাদ এমন একটি রিপোর্ট করার জন্য। বাংলাদেশে আরও বেশি সংখ্যক শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। বিশেষ করে মাদ্রাসাগুলোতে লক্ষ লক্ষ ছেলে শিশু বলাৎকারের শিকার হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন দরকার। বাংলাদেশের সরকার এবং মিডিয়া উভয়ই ব্যর্থ হয়েছে। সিএনএন বা বিবিসি একটা উদ্যোগ নিতে পারে। তাতে আমাদের লক্ষ লক্ষ শিশু লালসার শিকার হওয়া থেকে পেতো।
তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা