Advertise
২৮ জুন, ২০২৬ ০০:০১
সলিমুল্লাহ খান সাহেবের একটা অসাধারণ প্রতিভা আছে। তিনি ইতিহাসকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেন, যেন ইতিহাস কোনো archival discipline না, বরং তাঁর ব্যক্তিগত টকশোর স্ক্রিপ্ট। যাকে ভালো লাগবে, তাকে প্রথম শ্রেণি। যাকে রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর লাগবে, তাকে তৃতীয় শ্রেণি। আর যেটা তাঁর বয়ানের সঙ্গে মেলে না, সেটা সম্পূর্ণ ফলস।
তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক কৌশলও প্রায় একই রকম। তাঁর মূল কাজ হলো একটা কৃত্রিম binary তৈরি করা, তারপর সেই binary র একপাশকে নৈতিকভাবে উঁচু আর অন্য পাশকে তুচ্ছ প্রমাণ করার চেষ্টা করা। ফলে ইতিহাসের জটিলতা হারিয়ে যায়, জায়গা নেয় রাজনৈতিক নাট্যরূপ।
তিনি চিকন করে কাজী নজরুলকে “পুরুষ জাগরণের” প্রতীক হিসেবে হাজির করবেন বেগম রোকেয়ার “নারী জাগরণের অগ্রদূত” টাইটেলকে devalue করতে। একই ভাবে: রবীন্দ্রনাথকে দুর্বল করতে আহমদ ছফাকে হাজির করানো। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ করতে মুক্তিযুদ্ধকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে ভারতের ভূরাজনৈতিক প্রকল্পে নামিয়ে আনা। আবার রাজাকার রাজনীতির ইসলামপন্থী চরিত্রকে ঝাপসা করতে শহীদুল জহিরের মতো লেখককে “তৃতীয় শ্রেণির” বলে বাতিল করার চেষ্টা করা।
প্রতিবারই লক্ষ্য এক, ইতিহাসের প্রতিষ্ঠিত ব্যাখ্যাকে রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক একটা বিকল্প ন্যারেটিভ তৈরি করা।
শহীদুল জহির সম্পর্কে তিনি বলেছেন, তাঁকে তৃতীয় শ্রেণির লেখকও মনে করেন না। কারণ জহির মুক্তিযুদ্ধে রাজাকারদের মাথায় টুপি দেখিয়েছেন। সাহিত্য সমালোচনার নতুন পদ্ধতি আবিষ্কৃত হলো তাহলে character এর মাথার পোশাক দেখে লেখকের গ্রেড নির্ধারণ।
এই লজিকে তো রবীন্দ্রনাথকে বিচার করতে হবে তাঁর দাড়ির দৈর্ঘ্য দিয়ে, নজরুলকে বিচার করতে হবে তাঁর চুলের স্টাইল দিয়ে, আর মুক্তিযুদ্ধকে বিচার করতে হবে কে কয় ইঞ্চি টুপি পরে ছিল সেই anthropological জরিপ দিয়ে।
বাস্তবতা হলো, একাত্তরের রাজাকারদের মধ্যে দাড়ি-টুপি ছিল, টুপি ছাড়া রাজাকারও ছিল। জামায়াত ছিল, মুসলিম লীগ ছিল, পাকিস্তানপন্থী পীর-মাওলানা ছিল, আবার সুবিধাবাদী secular রাজাকারও ছিল। কিন্তু রাজাকার রাজনীতির ইসলামিস্ট চরিত্র অস্বীকার করতে গিয়ে যদি কেউ টুপির অস্তিত্বকেই সাহিত্যিক মিথ্যা বানিয়ে ফেলে, তাহলে সেটা সাহিত্য সমালোচনা না করে ইতিহাসের ওপর cosmetic surgery বলা ভালো।
সলিমুল্লাহ খানের সমস্যা এখানেই। তিনি অনেক পড়েন, অনেক উদ্ধৃতি দেন, অনেক নাম বলেন, কিন্তু সব পড়াশোনা প্রজ্ঞায় রূপ নেয় না। মুখস্থবিদ্যা আর বিচারবোধ এক জিনিস না। dictionary হওয়া সহজ, intellectual honesty কঠিন।
তিনি আহমদ ছফাকে উদ্ধৃত করে মুক্তিযুদ্ধকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেন, যেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো গণআকাঙ্ক্ষা, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, ভাষাভিত্তিক জাতীয় চেতনা, গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ কিংবা উপনিবেশিক সামরিক দমননীতির বিরুদ্ধে জনযুদ্ধ ছিল না; বরং শেখ মুজিবের “দোদুল্যমান নেতৃত্ব” এবং ভারতের “দায়িত্ব গ্রহণ” এর ফল।
এই ব্যাখ্যা খুব চালাক ব্যাখ্যা, এতে পাকিস্তানি সামরিক হত্যাযজ্ঞ background noise হয়ে যায়, বাঙালির গণআকাঙ্ক্ষা secondary হয়ে যায়, আর স্বাধীনতার নৈতিক কেন্দ্রটা সরিয়ে নেওয়া হয়।
২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন গণহত্যা শুরু করল, তখন কি বাঙালিদের আগে Oxford seminar করে স্বাধীনতার লক্ষ্য আরও পরিষ্কার করা উচিত ছিল? মানুষ যখন বাড়ি থেকে তুলে হত্যা করা হচ্ছে, নারী ধর্ষিত হচ্ছে, গ্রাম জ্বলছে, শহর দখল হচ্ছে, তখন কি জাতির প্রথম কাজ ছিল footnote ঠিক করা?
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বোঝার সবচেয়ে বড় শর্ত হলো, এটাকে কারও ব্যক্তিগত সাহিত্যিক বিরক্তি, রাজনৈতিক ক্ষোভ, অথবা পরবর্তী সময়ের সুবিধাজনক বুদ্ধিবৃত্তিক ভঙ্গি দিয়ে বিচার না করা।
সলিমুল্লাহ খান আহমদ ছফাকে উদ্ধৃত করে যে বয়ান দাঁড় করান, সেখানে মূল সমস্যাটা হলো তিনি মুক্তিযুদ্ধকে আমাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ফল হিসেবে না দেখে প্রায় “দুর্ঘটনাজনিত স্বাধীনতা” হিসেবে হাজির করেন। এই যে তার রাজনৈতিক কৌশল: শেখ মুজিবের নেতৃত্ব অস্পষ্ট ছিল, তিনি পাকিস্তানিদের হাতে ধরা দিলেন স্বাধীনতা ঘোষণা দিতে না পেরে, আওয়ামী লীগের প্রস্তুতি ছিল না, জনগণকে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছিল, তারপর ভারত এসে দায়িত্ব নিল, আর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেল।
এই সব শুনতে খুব radical লাগে, পাকিস্তান লাভারদের কিছু শিহরণ, কিছু উদ্দীপনা দিতে পারে। কিন্তু বিশ্লেষণ হিসেবে খুব দুর্বল, আর রাজনৈতিকভাবে ভয়ংকরভাবে reductionist।
এই সময়ের genz দের জন্য বলে রাখি,
মুক্তিযুদ্ধ ২৫ মার্চ রাতের কোনো হঠাৎ আবেগী বিস্ফোরণ ছিল না। এর পেছনে ছিল ১৯৪৮ ও ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬২ শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ ছয় দফা, ১৯৬৯ গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ গণরায়, এবং শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি সামরিক জান্তার ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি।
(সূত্র: Jahan, Rounaq (1972). Pakistan: Failure in National Integration. Columbia University Press; Van Schendel, Willem (2020). A History of Bangladesh (2nd ed.). Cambridge University Press; Mascarenhas, Anthony (1971). The Rape of Bangladesh.) সলিমুল্লাহদের বয়ানে বিশ্বাসী না হয়ে এই বই গুলো পড়বেন।
এই ধারাবাহিকতা বাদ দিয়ে যদি কেউ বলে স্বাধীনতার লক্ষ্য “অস্পষ্ট” ছিল, তাহলে, ১৯৭০ সালে মানুষ কীসের পক্ষে ভোট দিয়েছিল? ছয় দফা কি শুধু সাহিত্য উৎসবের প্রস্তাব ছিল? গণঅভ্যুত্থান কি কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল? ৭ মার্চের ভাষণে “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”, এই রাজনৈতিক সংকেত কি কেবল কবিতার অলংকার ছিল?
হ্যাঁ, ১৯৭১ সালের শুরুতে আন্দোলনের ভাষা কৌশলগতভাবে autonomy থেকে independence এর দিকে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু এই রূপান্তর রাতারাতি জন্ম নেওয়া বিভ্রান্তি ছিল না; এটা ছিল পাকিস্তানি রাষ্ট্রের ধারাবাহিক অস্বীকার, সামরিক দমননীতি এবং গণরায়ের অবমাননার যৌক্তিক রাজনৈতিক পরিণতি।
(সূত্র: Sisson, Richard & Rose, Leo (1990). War and Secession: Pakistan, India, and the Creation of Bangladesh. University of California Press; Van Schendel (2020).)
একটি জনগোষ্ঠী প্রথমে অধিকার চায়। অধিকার অস্বীকার করা হলে স্বায়ত্তশাসন চায়। স্বায়ত্তশাসন অস্বীকার করা হলে আত্মনিয়ন্ত্রণ চায়। আত্মনিয়ন্ত্রণকে ট্যাঙ্ক দিয়ে দমন করা হলে স্বাধীনতা অনিবার্য হয়ে ওঠে।
এটাই ইতিহাসের dialectic। এটা কোনো “দোদুল্যমানতা” না। আর “নিরস্ত্র জনগণকে বলির পাঁঠার মতো দাঁড় করিয়ে দেওয়া”, সলিমুল্লাহর এই কথা রাজনৈতিকভাবে ভীষণ ড্রামাটিক, কিন্তু নৈতিকভাবে ঠিক ততটাই সমস্যাজনক। এই বয়ান দিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যার দায় আড়াল হয়ে যায় এবং victim-blaming শুরু হয়। যেন বাঙালিরা ভুল leadership এর কারণে মরেছে, পাকিস্তানি সামরিক রাষ্ট্রের planned genocide এর কারণে না।
২৫ মার্চ রাতে Operation Searchlight কে কি শেখ মুজিব আয়োজন করেছিলেন? একজন রাজনৈতিক নেতা যদি শত্রুপক্ষের হাতে গ্রেপ্তার হন, সেটাকে কি “আত্মসমর্পণ” বলা হবে, নাকি রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের অংশ বলা হবে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষক হত্যা, রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রমণ, ইপিআর সদর দপ্তরে হামলা, পুরান ঢাকার গণহত্যা, এসব কি বাঙালির “অস্পষ্ট লক্ষ্য” এর ফল, নাকি পাকিস্তানি সামরিক রাষ্ট্রের উপনিবেশিক দখলদারি ও জাতিগত দমননীতির ফল?
(সূত্র: Hamoodur Rahman Commission Report; Bass (2013); Mascarenhas (1971); Van Schendel (2020); Sisson & Rose (1990).)
ভারত শরণার্থী আশ্রয় দিয়েছে, প্রশিক্ষণ দিয়েছে, কূটনৈতিক সমর্থন দিয়েছে, শেষে সামরিকভাবে যুক্ত হয়েছে। হ্যাঁ ভারতের নিজস্ব ভূরাজনৈতিক স্বার্থও ছিল।
কিন্তু ভারত সাহায্য করেছে বলে মুক্তিযুদ্ধের চরিত্র ভারতীয় হয়ে যায় না। যুক্তিটা এমন যে কেউ হাসপাতালের ICU তে অক্সিজেন দিয়েছে, তাই রোগীর বেঁচে থাকার ইচ্ছা তার নিজের ছিল না। এটাই খানদের intellectual tragedy।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালির গণআকাঙ্ক্ষা, রাজনৈতিক ম্যান্ডেট, সশস্ত্র প্রতিরোধ, গণহত্যার বিরুদ্ধে অস্তিত্বের সংগ্রাম, শরণার্থী মানুষের অসীম দুর্ভোগ, মুক্তিযোদ্ধাদের লড়াই, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং ভারতের সামরিক সহায়তার জটিল সমন্বয়। এই বহুমাত্রিক ইতিহাসকে শুধু “ভারত দায়িত্বভার গ্রহণ করল” বলে নামিয়ে আনা ইতিহাস না, এটা রাজনৈতিক shortcut।
(সূত্র: Sisson & Rose (1990); Srinath Raghavan (2013). 1971: A Global History of the Creation of Bangladesh; Bass (2013).)
আর শেখ মুজিব পাকিস্তানের কারাগারে গিয়েছিলেন বলে তাঁর নেতৃত্ব অকার্যকর হয়ে যায়, এই যুক্তিও দুর্বল। উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামে নেতৃত্ব সবসময় battlefield command দিয়ে মাপা হয় না। গান্ধী, নেলসন ম্যান্ডেলা, সুকর্ণো, অনেক নেতাই কারাবন্দি থেকেও রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। শেখ মুজিবের অনুপস্থিতি সামরিক নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছিল, সত্য। কিন্তু তাঁর পূর্ববর্তী রাজনৈতিক সংগঠন, গণরায়, ৭ মার্চের নির্দেশনা, এবং তাঁর প্রতীকী কর্তৃত্ব ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের জাতীয় বৈধতা দাঁড়াত কোনোদিনও?
যুদ্ধের সময় সামরিক নেতৃত্ব ছিল তাজউদ্দীন আহমদ, এম এ জি ওসমানী, সেক্টর কমান্ডার, মুক্তিবাহিনী, মুজিবনগর সরকার এবং অসংখ্য স্থানীয় প্রতিরোধের হাতে। কিন্তু সেই সংগ্রামের political mandate এসেছিল ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং মুজিবের নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলন থেকে। এই দুই স্তরকে আলাদা না করলে বিশ্লেষণ হয় না, শুধু রাগী বয়ান তৈরি হয়।
(সূত্র: Islam, Syed Nazrul (ed.), Bangladesh Documents; Sisson & Rose (1990); Van Schendel (2020); Raghavan (2013).)
সলিমুল্লাহ খানদের সমস্যা হলো, জটিলতাকে বিশ্লেষণ করবেন না কিন্তু জটিলতাকে ব্যবহার করেন। ভারতের ভূমিকা আছে, তাই পুরো মুক্তিযুদ্ধকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া যায়।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সমালোচনা থাকবে। কিন্তু সমালোচনা আর delegitimisation এক জিনিস না।সমালোচনা ইতিহাসকে গভীর করে। Delegitimisation ইতিহাসকে বিকৃত করে। এই বিকৃতি পাকিস্তানি রাষ্ট্রের অপরাধকে কেন্দ্রে না রেখে বাঙালি নেতৃত্বের “ব্যর্থতা”কে কেন্দ্রে রাখে, এই বয়ানের আসল বিপদ এখানেই। ফলে গণহত্যাকারী রাষ্ট্র background এ চলে যায়, আর মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নৈতিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সেই পুরনো কৌশল, মুক্তিযুদ্ধকে স্বাধীনতার নৈতিক সংগ্রাম না বানিয়ে geopolitical accident বানিয়ে দেওয়া।
আর শহীদুল জহিরের প্রসঙ্গে আসি। তিনি ফিকশন লিখেছেন, সামরিক গেজেট না। একজন ঔপন্যাসিক যখন রাজাকার চরিত্রে দাড়ি-টুপি ব্যবহার করেন, তখন তিনি কোনো জনগণনা (census) করছেন না; তিনি historical memory, social perception এবং political symbolism ব্যবহার করছেন।
এটা মনে রাখা দরকার, একাত্তরের পাকিস্তানপন্থী সহযোগী রাজনীতির সঙ্গে ইসলামপন্থী সংগঠনগুলোর সম্পর্ক কোনো সাহিত্যিক কল্পনা না, বরং সুপ্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য। জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগের একটি অংশ, আলবদর, আলশামস এবং অন্যান্য সহযোগী বাহিনী পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে বিভিন্ন মাত্রায় কাজ করেছে। তাদের আদর্শিক ভিত্তি ছিল পাকিস্তানের ইসলামিক জাতীয়তাবাদ এবং অখণ্ড পাকিস্তান রক্ষা।
(সূত্র: Sisson, R. & Rose, L. (1990). War and Secession: Pakistan, India, and the Creation of Bangladesh. University of California Press; Rounaq Jahan (1972). Pakistan: Failure in National Integration. Columbia University Press; Richard Sisson & Leo Rose, Ch. 8.)
অবশ্যই সব রাজাকারের দাড়ি ছিল না, সব রাজাকার টুপি পরতেন না। কিন্তু এটাও সমান সত্য যে পাকিস্তানপন্থী ইসলামপন্থী রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যমান প্রতীক ছিল দাড়ি, টুপি এবং ধর্মীয় পরিচয়ের প্রকাশ্য রাজনৈতিক ব্যবহার। জামায়াতে ইসলামী ও সংশ্লিষ্ট ইসলামপন্থী সংগঠনগুলো তাদের রাজনৈতিক বৈধতা নির্মাণ করেছিল ইসলামি রাষ্ট্রবাদ এবং পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের সমন্বয়ে।
(সূত্র: Ali Riaz (2008). Faithful Education: Madrassahs in South Asia; Ali Riaz (2016). Bangladesh: A Political History Since Independence; Willem van Schendel (2020). A History of Bangladesh, 2nd ed.)
এখানে কেউ টুপিকে অপরাধী বানাচ্ছে না। টুপি নিজে কোনো অপরাধের প্রতীক নয়; কোটি কোটি ধর্মপ্রাণ মুসলমান টুপি পরেন, এবং তার সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু ১৯৭১ সালে পাকিস্তানপন্থী ইসলামপন্থী রাজনীতি ধর্মীয় প্রতীক, ভাষা ও পরিচয়কে রাজনৈতিক বৈধতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল। সেই ইতিহাস মুছে ফেলা যাবে না।
(সূত্র: Rounaq Jahan (1972); Ali Riaz (2016); Bangladesh International Crimes Tribunal Judgments, 2013–2016.)
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের স্থানীয় সহযোগীরা মানুষকে শুধু পোশাক দেখে হত্যা করেনি; তারা বাঙালি জাতীয়তাবাদ, হিন্দু পরিচয়, মুক্তিযুদ্ধের সমর্থন, ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী এবং বহু ক্ষেত্রে তরুণ পুরুষদের সম্ভাব্য মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চিহ্নিত করে টার্গেট করেছিল। বিশেষ করে হিন্দু জনগোষ্ঠী এবং যুদ্ধক্ষম বয়সী পুরুষদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞের অসংখ্য দলিল রয়েছে।
(সূত্র: The Blood Telegram (2013); The Rape of Bangladesh (1971); A History of Bangladesh (2020); Genocide in Bangladesh, 1971 (2013)
তাই শহীদুল জহিরের লেখায় দাড়ি-টুপিওয়ালা রাজাকার দেখে যদি কারও প্রধান সমস্যা তৈরি হয়, তাহলে প্রশ্নটা শহীদুল জহিরের সাহিত্যিক কল্পনাকে নয়, বরং নিজের রাজনৈতিক অস্বস্তিকেই করা উচিত।
মুখস্থ উদ্ধৃতি দিয়ে ইতিহাস লেখা যায় না। ইতিহাস লিখতে লাগে দলিল, প্রেক্ষাপট, নৈতিক সততা এবং জনগণের সংগ্রামের প্রতি সম্মান।
সলিমুল্লাহ খানদের একটা পুরনো অভ্যাস আছে। প্রতিষ্ঠিত চিন্তক, লেখক, সাহিত্যিকদের “গাধা”, “গবেট”, “তৃতীয় শ্রেণি”, “বাংলা জানে না”, এসব বলে বাতিল করা। এতে শ্রোতারা আনন্দ পায়, কারণ বাঙালি সমাজে পরনিন্দা এখন almost public pedagogy। কিন্তু কাউকে ছোট করতে পারা আর তাকে বিশ্লেষণ করতে পারা এক জিনিস না।
সমালোচনার মানে হচ্ছে জটিলতা বোঝা। কিন্তু সলিমুল্লাহীয় পদ্ধতিতে জটিলতা নেই, আছে verdict। বিচার নেই, আছে সার্টিফিকেট। যুক্তি নেই, আছে মঞ্চের নাটকীয় হাতুড়ি।
সলিমুল্লাহ খান অনেক বইয়ের নাম জানেন। কিন্তু বইয়ের নাম জানা আর ইতিহাসের নৈতিক দায় বোঝা এক জিনিস না। তাঁর বিশ্লেষণ দেখতে খুব বুদ্ধিদীপ্ত, কিন্তু ভেতরে থাকে পুরনো রাজনৈতিক পক্ষপাতের refurbished furniture।
নীলক্ষেতের পুরনো dictionary ও অনেক শব্দ জানত। কিন্তু তাকে কেউ দার্শনিক বলত না।