Advertise
০৬ জুলাই, ২০২৬ ২৩:০০
রাষ্ট্রের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা যুদ্ধের সময় হয় না; হয় তখন, যখন জনতার ক্রোধ আইনের সীমা অতিক্রম করতে চায়। কারণ একটি সভ্য রাষ্ট্রকে বিচার করা হয় না সে কাদের ভালোবাসে, কাদের পুরস্কৃত করে কিংবা কাদের রাজনৈতিকভাবে গ্রহণ করে—বরং বিচার করা হয়, যাদের প্রতি সমাজের সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ, ঘৃণা কিংবা প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা, তাদের ক্ষেত্রেও সে আইনকে সমানভাবে কার্যকর রাখতে পারে কি না।
এই কারণেই আমি বিশ্বাস করি, কোনো ন্যারেটিভকে আরেকটি কাউন্টার ন্যারেটিভ দিয়েই প্রতিস্থাপন করতে হয়; সহিংসতা দিয়ে নয়। সহিংসতা কখনো কোনো ন্যারেটিভের বিজয় নয়; বরং সেই ন্যারেটিভের বৌদ্ধিক অনিরাপত্তার স্বীকারোক্তি। যে সত্য নিজের শক্তিতে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না, সে শেষ পর্যন্ত ভয়, অপমান ও প্রতিশোধের আশ্রয় নেয়।
এই প্রেক্ষাপটে আমার অবস্থান নিয়ে কিছু বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তাই সেটি স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
প্রথমেই বলি, শাওন জুলাই নিয়ে যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, সেটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একটি জাতির শোক, মানুষের আত্মত্যাগ এবং ইতিহাসকে অবমাননা করার অধিকার কারও নেই। আমি জুলাইয়ের প্রতিটি প্রাণহানির সত্য উদ্ঘাটন চাই। আমি চাই একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত। রাষ্ট্রের যে প্রতিষ্ঠানই হোক—আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তি—যদি তদন্তে দায় প্রমাণিত হয়, তবে তার বিচার অবশ্যই হতে হবে। ন্যায়বিচার বেছে বেছে প্রয়োগ করা যায় না।
কিন্তু এখানেই রাষ্ট্রের আরেকটি নৈতিক দায়িত্ব শুরু হয়।
কোনো ব্যক্তির বক্তব্য যতই আপত্তিকর হোক, তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সহিংসতার আহ্বান, জুতাপেটার ঘোষণা, ধর্ষণের হুমকি কিংবা একজন নারীকে উলঙ্গ করে দেওয়ার ভাষা কখনোই সভ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না। কারণ তখন আমরা একটি ভুল বক্তব্যকে খণ্ডন করি না; বরং আইনের শাসনের পরিবর্তে জনতার প্রতিশোধকে বৈধতা দিতে শুরু করি।
আমার বক্তব্য ছিল এই নীতিগত জায়গা থেকেই। কাউকে নিরাপত্তা দেওয়ার কথা বলা মানে তার বক্তব্যকে সমর্থন করা নয়; বরং এর অর্থ হলো রাষ্ট্রকে তার সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়া। যেকোনো প্রাণের অধিকার রক্ষার নৈতিক দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সে বিচারে মেহেরাজ রোজ শাওন কোন ধরনের আক্রমণের শিকার যেন না হয় একটি দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। বিচার আদালত করবে, জনতা নয়। কারণ রাষ্ট্র যদি তার বৈধ বলপ্রয়োগের কর্তৃত্ব জনতার হাতে ছেড়ে দেয়, তাহলে সেই রাষ্ট্র ধীরে ধীরে আইনের রাষ্ট্র থেকে প্রতিশোধের রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
আরও একটি বিষয় আমাকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে। যখন কোনো নারীকে রাজনৈতিকভাবে পরাজিত করার পরিবর্তে তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়, কিংবা তার শরীরকে অপমানের ভাষায় লক্ষ্যবস্তু করা হয়, তখন সেটি শুধু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে আক্রমণ নয়; সেটি নারীর দেহকে রাজনৈতিক শাস্তির উপকরণে পরিণত করার সংস্কৃতি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে সমাজ এই ভাষাকে স্বাভাবিক করে, সেখানে শেষ পর্যন্ত কোনো নারীই নিরাপদ থাকে না—তার রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক।
আমি তাই একই সঙ্গে দুটি নীতির পক্ষে দাঁড়াই। আমি আমি জুলাইয়ের নিহতদের ন্যায়বিচারের পক্ষে। আবার আমি ধর্ষণের হুমকি, কাউকে রক্তাক্ত করার হুমকি, জনতার বিচার, সহিংসতার আহ্বান এবং লিঙ্গভিত্তিক অপমানের রাজনীতিরও বিরুদ্ধে। কারণ ন্যায়বিচার প্রতিশোধ নয়; ন্যায়বিচার হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে রাষ্ট্র আবেগ নয়, আইন দ্বারা পরিচালিত হয়।
আজ আমাদের সামনে মূল প্রশ্নটি শাওন নন। মূল প্রশ্ন হলো—আমরা কী ধরনের রাষ্ট্র এবং কী ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নির্মাণ করতে চাই? এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে মতের জবাব হবে আরও শক্তিশালী মত, যুক্তির জবাব হবে আরও শক্তিশালী যুক্তি, ইতিহাসের জবাব হবে আরও গভীর ইতিহাস? নাকি এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে মতভেদের জবাব হবে জুতা, ধর্ষণের হুমকি, জনতার বিচার এবং সহিংসতার ভাষা?
আমার বিশ্বাস, একটি জাতি তখনই সত্যিকার অর্থে পরিপক্ব হয়, যখন সে তার সবচেয়ে অপছন্দের মানুষের ক্ষেত্রেও আইনের শাসন থেকে বিচ্যুত হয় না। কারণ রাষ্ট্রের নৈতিক শক্তি প্রতিপক্ষকে দমন করার ক্ষমতায় নয়; বরং যাদের সঙ্গে তার গভীরতম মতভেদ, তাদের ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার সক্ষমতায়।
শেষ পর্যন্ত, ইতিহাস কখনো সহিংসতাকে বিজয়ী হিসেবে মনে রাখে না। ইতিহাস মনে রাখে সেই সমাজকে, যে ক্রোধের মুহূর্তেও আইনের প্রতি অনুগত ছিল; প্রতিশোধের মুহূর্তেও ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল; আর ঘৃণার মুহূর্তেও বলেছিল—একটি ন্যারেটিভকে আরেকটি ন্যারেটিভ দিয়েই প্রতিস্থাপন করতে হয়, সহিংসতা দিয়ে নয়।
অধ্যাপক রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা
নৃবিজ্ঞান বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়