Advertise
১৯ জুলাই, ২০২৬ ০০:১৭
শত শত মানুষ দাঁড়িয়ে দেখছিল। সেখানে পুলিশও ছিল। কিন্তু ১৭ বছর বয়সী দুয়া খলিল আসওয়াদকে বাঁচাতে কেউ এগিয়ে আসেনি!
দুয়া খলিল আসওয়াদের জন্ম ১৯৮৯ সালের দিকে, উত্তর ইরাকের বাশিকার কাছে বাহজান গ্রামের একটি ইয়াজিদি পরিবারে।
ইয়াজিদি ধর্ম একটি প্রাচীন একেশ্বরবাদী ধর্ম। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নি*তনের শিকার হওয়া এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ে নিজেদের ধর্মের বাইরে বিয়ে করার বিরুদ্ধে কঠোর সামাজিক নিয়ম প্রচলিত ছিল।
সেই নিয়ম ভাঙাকে শুধু পারিবারিক নয়, পুরো সম্প্রদায়ের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখা হতো।
২০০৭ সালের এপ্রিল মাসে গুজব ছড়ায়, দুয়ার সঙ্গে এক সুন্নি মুসলিম তরুণের সম্পর্ক রয়েছে। কেউ দাবি করেন, তিনি ওই তরুণের জন্য ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। আবার কেউ বলেন, এক রাতে বাড়ি না ফেরায় তার পরিবার নিজেদের অসম্মানিত মনে করেছিল। তবে এই ঘটনাগুলোর কোনটি সত্য, তা আজও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
যা জানা যায়, নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা করে দুয়া আশ্রয় খুঁজেছিলেন। কোনো কোনো সূত্র বলছে, তাকে এক ইয়াজিদি গোত্রপ্রধান আশ্রয় দিয়েছিলেন। আবার অন্য সূত্রে বলা হয়, একজন মুসলিম নেতা তাকে আশ্রয় দেন।
পরে তার পরিবার তাকে জানায়, তার অতীতের সবকিছু ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। তিনি যেন বাড়ি ফিরে আসেন।
দুয়া সরল মনে পরিবারের মানুষদের সেই কথায় বিশ্বাস করেছিলেন।
২০০৭ সালের ৭ এপ্রিল তিনি বাড়ি ফেরেন। সেদিন শহরের চত্বরে জড়ো হয় একদল জনতা, যাদের বেশিরভাগই ছিল তার নিজের আত্মীয়স্বজন।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে জনসমাগমের সংখ্যা কয়েকশ থেকে দুই হাজার পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ইউনিফর্ম পরা পুলিশ সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু কেউই হস্তক্ষেপ করেননি।
দুয়াকে কোমরের নিচের অংশের পোশাক খুলে দেওয়া হয়, যা পরিবারের কথিত অসম্মান প্রকাশের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, উপস্থিত কয়েকজন তাকে ঢেকে রাখার চেষ্টা করেছিলেন।
এরপর সবার সামনে তাকে পাথর ছু/ড়ে হ* করা হয়। প্রায় ৩০ মিনিট ধরে হা*লা চলতে থাকে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুয়া বারবার উঠে বসার চেষ্টা করছিলেন। আর জনতা তাকে উপহাস করতে করতে মাথার দিকে পাথর ও কংক্রিটের টুকরা ছু*ড়ে মারছিল। উপস্থিত কয়েকজন পুরো ঘটনাটি মোবাইল ফোনে ধারণও করেন।
ঘটনার পর কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত বাশিকার বাইরে প্রায় কেউই দুয়ার নাম জানত না। ওই অঞ্চলে তথাকথিত ‘পরিবারের সম্মান রক্ষার’ নামে হ*কা/ণ্ড এতটাই পরিচিত ছিল যে ঘটনাটি প্রথমে বড় কোনো শিরোনাম হয়নি। কিন্তু ২০০৭ সালের মে মাসে হ*র ভিডিওটি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে তা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে।
ভিডিও প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো, যার মধ্যে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও ছিল, এই হ*কা/ণ্ডের তীব্র নিন্দা জানায়। তারা শুধু হা*লাকারীদের নয়, উপস্থিত থেকেও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধেও জবাবদিহির দাবি তোলে।
পরে অন্তত তিনজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়। তাদের চাকরিচ্যুত করার আলোচনা হয় এবং শহরের শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তাকেও বদলি করা হয়।
তদন্তের পর দুয়ার দুই চাচাতো ভাইসহ মোট চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০১০ সালে আদালত তাদের সবাইকে হ*র দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে মৃ*দ/ণ্ড দেন।
কিন্তু দুয়ার মৃ*র পরও স/হিং/স/তা থামেনি।
একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার কারণেই তাকে হ* করা হয়েছে। কিছু গোষ্ঠী সেই গুজবকে প্রতিশোধের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই মসুলের কাছে একটি বাস থেকে ২৩ জন ইয়াজিদি কারখানাশ্রমিককে নামিয়ে হ* করা হয়। এর কয়েক মাস পর ইয়াজিদি অধ্যুষিত দুটি গ্রামে সমন্বিত বো* হা*লায় শত শত মানুষ নি*ত হন।
দুয়া খলিল আসওয়াদ কখনোই নিজের বক্তব্য জানানোর সুযোগ পাননি। তিনি আর বড় হতে পারেননি, পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি কিংবা স্বাধীনভাবে নিজের জীবন বেছে নেওয়ার সুযোগও পাননি।
তার মৃত্যুর ঘটনা শুধু একটি নির্মম হ*কা/ণ্ড হিসেবেই নয়, পরবর্তী সময়ে আরও বড় সহিংসতার এক মর্মান্তিক সূচনা হিসেবেও ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।