Advertise
১১ অগাস্ট, ২০২৬ ২২:৫৫
নব্বইর আন্দোলনের মধ্য দিয়েও নেতা হিসেবে আমান উল্লাহ আমান ও খায়রুল কবির খোকনদের উত্থান ঘটে। কিন্তু বিস্ময়কর যে, জুলাই আন্দোলনের দুই বছর পরে এসে বলতেই হয়, এতো আয়োজন করে, এতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসানোর পরেও জুলাইর এতো বড় মাপের গণঅভ্যুত্থান কাউকে নেতা বানাতে পারেনি।
জুলাই ২৪-এর আগেই মেঘমল্লার বসু ছাত্র রাজনীতির খরার মধ্যে বৃষ্টি নামাচ্ছিলেন৷ তাকে জুলাইর ফসল বলা যায় না৷ উমামা ফাতেমার মেধা ছিলো কিন্তু নেতৃত্বে নিজেকে প্রমাণ করতে পারেননি৷ আরেকজন ছাত্রকে আমার মনে হতো কিছু পড়াশোনা আছে তিনি হলেন মাহফুজ আলম (আব্দুল্লাহ)। কিন্তু তিনজনই জাতীয় নেতৃত্ব থেকে হারিয়ে গিয়েছেন বলা যায়। তবে জুলাইর আন্দোলনে ছাত্র নেতৃত্বের বিকাশ না হওয়া বিস্ময়কর নয়৷
জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নেতা হয়েছেন নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ, আসিফ মাহমুদ সজিব ভূইয়া, নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী, ওসমান হাদি, আবু বাকের মজুমদার, আবদুল কাদের, নুসরাত তাবাসসুম প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ। তাদের জন্য রাষ্ট্রীয় যাবতীয় সুযোগ সুবিধা ছিলো; এমনকি কয়েকজন সরকারের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। মিডিয়ার বিপুল ফোকাসও পান। এরপরে তারা ঠিক রাজনৈতিক নেতা হিসেবে প্রভাববিস্তারকারী হয়ে উঠতে পারেননি। যেমন ওসমান হাদিকে যখন হত্যা করা হয় তখনও তার সাথে নির্বাচনী প্রচারে দুজন খুনি ছাড়া তেমন কেউ ছিলেন না। নেতাদের দেখার জন্য কোথাও মানুষের ঢল নামেনি বা জনাকাঙ্ক্ষা তৈরি করতে তারা পারেননি। কেনো এমনটা হলো?
জুলাই আন্দোলন মূলত কোটা সংস্কারের রায়কে ঘিরে দ্রুত ছড়িয়ে পরে এবং পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হয়। এত দ্রুত পরিস্থিতির পরিবর্তনে নেতৃত্বের বিকাশ কঠিন ছিল। শেখ হাসিনার দাম্ভিকতা ও নিষ্ঠুরতার সুযোগে বিএনপি-জামাতের শীর্ষ নেতৃত্ব কৌশলে মাঠ দখলে নেয় আর তাতে ছাত্র নেতারা দুধভাতে পরিণত হয়৷ আন্দোলনটি ছিলো ১৬ থেকে ৩৬ জুলাই মাত্র ২১দিনের৷ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পর্যাপ্ত সমন্বয় ও যোগাযোগের অভাব ছিল৷ মুন্সীগঞ্জসহ বহু জেলাতে কোনো সমন্বায়কও ছিলো না। ফলে, একটি সুসংগঠিত নেতৃত্ব গড়ে উঠেনি।
সরকার কঠোর হস্তে এই আন্দোলন দমন করার চেষ্টা করে, যার ফলে ছাত্র নেতারা ভীত ও সংকুচিত হয়ে পরে এবং প্রকাশ্যে নেতৃত্ব দিতে সাহস পায়নি। ছাত্র দলের মতো সংগঠনেও কোনো নেতৃত্ব তৈরি হয়নি৷ ছাত্রলীগ আন্দোলনকারীদের উপর হামলা চালানো এবং ডিবি-পুলিশের তৎপরতায় আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়াও কঠিন ছিলো। ফলে আন্দোলনটি নেতৃত্বের বাইরেই স্বতস্ফূর্ত আন্দোলনে রূপ নেয়৷ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এই আন্দোলনে সরাসরি যুক্ত না হয়ে বরং পরোক্ষভাবে সমর্থন দেয়, যা একটি শক্তিশালী ছাত্র নেতৃত্ব তৈরিতে বাধা সৃষ্টি করে। যেমন বিএনপির কর্মীরা ছাত্রদল নেতার নেতৃত্বে আন্দোলন করেনি৷ এমন কি ছাত্রনেতাদেরও তারা নেতা মেনে মাঠে আসেনি। তারা এসেছিল বিএনপির আদর্শ নিয়েই এবং পরোক্ষ নির্দেশে মাঠে থেকে আন্দোলনের ফসল ঘরে তুলে নিয়েছে।
দীর্ঘদিন দেশে ছাত্রসংসদ ছিলো না এমনকি বিরোধী ছাত্র নেতৃত্বও ছিলো না৷ ফলে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার মত অভিজ্ঞ ও সাহসী ছাত্র নেতার অভাব ছিল, যারা পরিস্থিতি সামাল দিতে পারতো। তাই হঠাৎ তৈরি নেতৃত্ব ঝরে গিয়েছে লোভ-লালসাসহ বিভিন্ন ফাঁদে৷ যেমন সালাউদ্দিন তানভীরের বিরুদ্ধে বিপুল দুর্নীতির অভিযোগ উঠে। তার কথাবার্তা ও আচরণে কখনওই নেতার ম্যাচুইরিটি উঠে আসেনি। অন্যরাও জনগণকে আকৃষ্ট করতে পারেননি।
ঐক্যবদ্ধ প্যানেল করে উমামা যদি ডাকসুর ভিপি এবং মেঘমল্লার যদি জিএস হতে পারতেন তবে সেটা একটা সুফল হতে পারতো। তবে সেই সম্ভাবনা তৈরির সাথে সাথেই রাজনৈতিক মারপ্যাচে বিলীন হয়ে যায়। মেঘমল্লার বসু জুলাইতে বিস্তর ভূমিকা রেখেছেন৷ তার প্রজ্ঞা, মেধা ও কিছুটা বাকপটুতা রয়েছে এবং জনপ্রিয়তাও পেয়েছেন৷ সম্ভবত মোজাহিদুল ইসলাম সেলিম ভাই ছাড়া রাজনীতিতে এতোটা গুরুত্ব আর কোনো ছাত্র ইউনিয়ন নেতা পায়নি৷ কিন্তু বামদের দ্বিধা-বিভক্তির রাজনীতির বলি হয়ে তাঁকেও হারিয়ে যেতে হলো।
ডাকসুর বর্তমান ভিপি সাদিক কায়েমকে কখনও সম্ভাবনাময় নেতা বলে মনে হয়নি। জিএস ফরহাদকে আর খুঁজেও পাওয়া যায় না। রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ ও জিএস সালাউদ্দিন আম্বারের নাম আসে কেবল অপকর্ম করে। আম্বার বেলচা হাতে এরে পিটাচ্ছেন অমুক শিক্ষকের পদত্যাগে স্বাক্ষর করতে হুমকি দিচ্ছেন। জাকসু ও চকসুর ভিপি-জিএস আর আলোচনাতেই নেই। জকসুর ভিপি-জিএস আলোচনায় আসলেন মারামারী করায়।
জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে বড়ো সফলতা স্বৈরশাসনকে হটিয়ে বহুদিন পরে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন, টাকা পাচার রোধ করা এবং সরকার বিরোধী রাজনীতি করার সুযোগ আসা। আর সবচেয়ে বড়ো ব্যর্থতা হলো মবসন্ত্রাস বন্ধ করতে না পারা আর গ্রহণযোগ্য কোনো নেতা তৈরি না হওয়া।