আজ শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ইং

Advertise

মুক্তমত

ইমতিয়াজ মাহমুদ

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:৫৮

১৯৭১-এর লড়াই কি এখনো রাজনৈতিকভাবে চলমান?

তরুণ রাজাকাররা যখন 'আমি কে তুমি কে' শ্লোগান দেয় ওরা সেটা একটা নীতিগত অবস্থান থেকেই দেয়। আমরা যখন কাউকে 'তুই রাজাকার বলি' সেটাও একটা রাজনৈতিক আদর্শিক বচন। এগুলি কোনটাই ফালতু কথা নয়। বরং যারা ঐ 'আমি কে তুমি কে' শ্লোগানকে মিথ্যা কথা দিয়ে আড়াল করতে চেয়েছিল পরেরদিন, ঐ যে কয়েকজন লোক এসে বললো যে না না, এটা তো সার্কাস্টিক বা ওরা নাকি আরেকটা লাইন বলেছিল 'কে বলেছে কে বলেছে' ইত্যাদি, এরা হয় মূর্খ বেওকুফ গাধা অথবা চেতনার দিক দিয়ে ওরাও রাজাকার। কেন সেই কথাটা বলি।

নিজেকে প্রশ্ন করেন, বাংলাদেশ কেন স্বাধীন হলো? ইংরেজরা দুইটা দেশ করে দিয়ে গেল ভারত ও পাকিস্তান, আমাদেরকে জুড়ে দিল পাকিস্তানের সাথে। সেটা ছিল দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে বা হিন্দু ও মুসলমান দুইটা আলাদা জাতি এই তত্ত্বের ভিত্তিতে। এই তত্ত্বটা ভ্রান্ত। কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে কখনো একটা জাতি তৈরি হয়না। আমরা সেটা কিছুদিনের মধ্যে অনুধাবন করেছি, আমাদের রাজনৈতিক নেতারা এই সত্যতা উপলব্ধি করার আগেই আমাদের নাগরিকরা, সংস্কৃতিকর্মী, লেখক, অধ্যাপক এরা উপলব্ধি করেছে। নেতাদের মধ্যে একজন তরুণ নেতা এই প্রত্যয়টার ভিত্তিতে রাজনৈতিক কর্মসূচী ভেবেছেন।

পুর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য ছিল, দুঃশাসন ছিল, শোষণ বঞ্চনা ছিল। সেইসবের কারণে বাঙালীর মনে ক্ষোভটা প্রবল ছিল এটাও সত্যি। কিন্তু সেইসব সমস্যার জন্যে পাকিস্তান ভাঙার প্রয়োজন ছিল না। পাকিস্তানের জনসংখ্যার মধ্যে জাতিগতভাবে বাঙালীরাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। একটা স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারলে পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যে থেকেও হয়তো আমরা বৈষম্য ইত্যাদি দূর করে ফেলতে পারতাম। পাকিস্তান ভেঙে আমরা বাঙালীর জন্যে স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র করেছি কারণ আমরা ধর্মের ভিত্তিতে জাতীয় পরিচয় তথা মুসলমানের জন্যে একটা রাষ্ট্র এই ধারণাটা ভেঙে ফেলতে চেয়েছিলাম।
 
ষটের দশকে পাকিস্তানের রাজনীতি- বিশেষ করে আওয়ামী লীগের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি যদি দেখেন তাইলেই এটা স্পষ্ট হয়ে যাবে। তখন আইয়ুব খান ক্ষমতায়, সামরিক শাসন চলছে। সব দল মিলে, সেখানে জামাতও ছিল, সামরিক শাসন উৎখাত করে একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্যে আন্দোলন করছিল। এর মধ্যেও আওয়ামী লীগের অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বললেন সময় এসেছে আওয়ামী লীগের দরকার ঐসব জোট ইত্যাদির বাইরে নিজেদের স্বতন্ত্র কর্মসূচী নিয়ে অগ্রসর হওয়া। সরোয়ার্দি সাহেব এটা চাননি- তিনি মনে করতেন বৈষম্য বঞ্চনা ইত্যাদি পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যেই সমাধান করতে হবে।
শেখ মুজিব কিন্তু থেমে থাকেননি। তিনি ছয় দফা কর্মসুচি তৈরিতে হাত দিলেন। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে বাঙালী চেতনার বিকাশের দিকে মনোযোগ দিলেন। আওয়ামী লীগের সেইসময়ের সিনিয়ার নেতাদের অনেকেই সেই সময় বঙ্গবন্ধুর সাথে ছিলেন না। ঘটনাক্রমে কচিহদিনের মধ্যেই সরোয়ার্দি সাহেব মারা গেলেন। এর মধ্যে ছয় দফা তৈরি হয়ে গেছে, নিজেদের মধ্যে আওয়ামী লীগ সেটা নিয়ে আলোচনা করছে। ছোট একটা বুকলেট আকারে ছয় দফা এবং এর ব্যাখ্যা ইত্যাদি ছাপা হয়েছিল, চট্টগ্রামে এক জনসভায় (সম্ভবত ছেষট্টি সনেই) সেটা বিতরণ করা হয়েছিল। ছয় দফা যে শুকনো অরণ্যে স্ফুলিঙ্গের মতো কাজ করেছে সেই সময়।
না, ছয় দফার মধ্যে স্বাধীনতার কথা ছিল না- যেটা ছিল সেটাকে আপনি সংক্ষেপে বলতে পারেন এমন মাত্রায় স্বাধিকারের দাবী বা আত্মনিয়ন্ত্রনের দাবী যেটাকে বলতে পারেন প্রায় স্বাধীনতা। কিছুদিনের মধ্যেই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ নিয়ে এলো এগারো দফা- এটাও ছয় দফার সাথেই মিলিয়ে করা হয়েছিল। আপনি যদি ছয় দফা ও এগারো দফা মিলিয়ে পড়েন তাইলে আপনি দেখবেন বাঙালী জাতীয়তাবাদের চেতনা, সেই সাথে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা, জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি এই সবকিছুই কোন না কোনোভাবে ছয় দফা ও এগারো দফার মধ্যে।
 
এই দুই দলিলের ভিত্তিতেই গণ অভ্যুত্থান হয়েছে, আইয়ুব খান উৎখাত হয়েছে। ৭০এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইশতেহারও তৈরি হয়েছে একই নীতির ভিত্তিতে। মনে রাখবেন, এই নির্বাচন ছিল কনস্টিটিউয়েন্ট এসেম্বলি গঠনের জন্যে। অর্থাৎ, এই নির্বাচনে যারা জয়ী হবেন ওরা পাকিস্তানের জন্যে একটা সংবিধান তৈরি করবেন। তখন পাকিস্তানের কোন সংবিধান ছিল না। এর অর্থ হচ্ছে, আওয়ামী লীগ যদি এই নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় তাইলে কেবল যে ওরা ক্ষমতা গ্রহণ করবে সেটাই মাত্র নয়, ওরা পাকিস্তানের জন্য সংবিধান তৈরি করবেন। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ জিতলে ছয় দফা এগারো দফার ভিত্তিতে সংবিধান হবে।
এইজন্যেই নির্বাচনে যখন আওয়ামী লীগ জিতে এসেছে ভুট্টো, জামাত, মুসলিম লীগ এবং ঐরকম অন্য দলগুলি আঁতকে উঠেছিল কোন অবস্থাতেই এসেম্বলি বসতে দেওয়া হবে না। ইউয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধু ও ভুট্টোকে নিয়ে দেন দরবার শুরু করে দিল। বঙ্গবন্ধুর কাছে ওদের দাবী ছিল ছয় দফা এগারো দফার ভিত্তিতে সংবিধান হতে দেওয়া হবে না। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাবে বা শেখ মুজিব প্রধানমন্ত্রী হবেন সেটা নিয়ে ওদের সেরকম আপত্তি ছিল না। ওদের অনুরোধ ছিল শেখ মুজিব যেন প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি পাকিস্তান ভাঙবেন না, ছয় দফা নিয়ে অনড় থাকবেন না- পাকিস্তান ভাঙবেন না।

বঙ্গবন্ধু ও তাঁর দল অনড় ছিল ছয় দফা ও এগারো দফা প্রশ্নে। তিনি বারবার বলছিলেন এসেম্বলি অধিবেশন ডাকেন, এসেম্বলিতেই আলাপ আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হবে। ৭ই মার্চ যখন বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেন, সেখানে তিনি একটা কথা বলেছিলেন স্মরণ করুন। তিনি বললেন আমি জনগণের সাথে বেইমানী করতে পারবো না, এসেম্বলি অধিবেশনে যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে তিনি যদি একজনও হয় তবু সেটা আমরা বিবেচনা করবো। এটা ছিল ভুট্টো গং এর জন্যে আহ্বান, আপনারা এসেম্বলিতে আসুন। ভুট্টো জানতেন এসেম্বলি অধিবেশন বসলেই পাকিস্তান ভেঙে যাবে, এরা বাঙালী জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে অনড়।
 
উনসত্তর থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত আমরা কি শ্লোগান দিয়েছি, কোন গান গেয়েছি সেগুলি এক জায়গায় জড়ো করেন, দেখবেন একটাই চেতনার প্রকাশ হয় সেইসব শ্লোগানে গানে ও কবিতায়- আমরা বাঙালী। বাঙলার হিন্দু বাঙলার খৃস্টান বাঙলার বৌদ্ধ বাঙলার মুসলমান আমরা সবাই বাঙালী। জাগো জাগো বাঙালী জাগো। পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা। কোন অস্পষ্টতা আছে? নাই। আমরা সত্তরের নির্বাচন করেছি দ্বিজাতিতত্ত্বের বিপরীতে বাঙালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে। আমরা যুদ্ধ করেছিল মুসলিম জাতিসত্তার পরিবর্তে বাঙালী জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য।

এইবার আসেন দেখি রাজাকার কারা। রাজাকার অর্থে আমি বলছি রাজাকার আলবদর আল শামস এরাসহ বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে যারা বাংলাদেষের স্বাধীনতার বিরোধ করেছে ওদের সকলের কথা। এদের আদর্শগত অবস্থানটা ছিল বাঙালী জাতীয়তাবাদের বিপক্ষে এবং দ্বিজাতিতত্ত্বের পক্ষে। ওরা সবসমোয়ই ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র চেয়েছে এবং সেই কারণেই ধর্ম নিরপেক্ষতা ও বাঙালী জাতীয়তাবাদের বিরোধ করেছে। এরা রাজনৈতিকভাবেও আমাদের বিরুদ্ধে ছিল, যুদ্ধেও আমাদের বিপক্ষে ছিল। মূল বিরোধটা ছিল ঐটাই- বাঙালী জাতীয়তাবাদ ও দ্বিজাতিতত্ত্ব। আমরা দ্বিজাতিতত্ত্বের মুখে লাঠি মেরে বাঙালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতেই দেশ বানিয়েছি।
এখন, যুদ্ধ তো শেষ হয়েছে ১৯৭১এর ডিসেম্বরের ১৬ তারিখে। সেটা ছিল সামরিক লড়াইটার সমাপ্তি মাত্র। রাজনৈতিক লড়াইটা কিন্তু শেষ হয়নি। দ্বিজাতিতত্ত্বের সমর্থকরা এখনো আছে, এখন ওরা বাংলাদেশকে কেবল মুসলমানদের একটা রাষ্ট্র হিসাবে দেখতে চায়। এরাই সাম্প্রদায়িকতা জিইয়ে রেখেছে, বিস্তৃত করেছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিভাজন মোটাদাগে ঐটাই- বাঙালী জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে ও বিপক্ষে। অন্যভাবে আপনি এটাকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ ও বিপক্ষও বলতে পারেন- অথবা ভালোবেসে আপনি ঐ পক্ষটিকে আদর করে রাজাকারও বলতে পারেন, তাতে খুব একটা ভুল হবেনা।
 
ঐ যে শ্লোগান দেওয়া 'তুমি কে আমি কে' বা আমরা যে টিয়াপাখির সংলাপটা বলি 'তুই রাজাকার' এইগুলি নেহায়েত রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর বা কথার কথা নয়। এইটা একটা যথাযথ রাজনৈতিক ও দার্শনিক বিভাজন- এবং বাস্তব বিভাজন। যারা জিন্নার ছবি ঝুলায়, ওর জন্মদিন করে, ১৯৭২এর সংবিধান নিয়ে কটু কথা বলে, সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা তুলে দিতে চায়- এরা ঐদিকে, ওদেরকে আপনি রাজাকার বলতে দ্বিধা করার কোন কারণ নাই। ওদের কোন আচরণই নিতান্ত কথা কথা বা অর্থহীন ভাবার কোন কারণ নাই। প্রতিটা কাজই রাজনৈতিকভাবে সুচিন্তিত।

এইজন্যেই বলি, আওয়ামী লীগের বিরোধ করেন তাতে আমার কিছু যায় আসেনা। কিন্তু ঐ লাইনটা যেন ক্রস করবেন না। আপনারা কতোটুকু মনে রেখেছেন জানিনা ইউনুসের সময় ১৯৭২এর সংবিধান ঝেড়ে ফেলার জন্যে যে কথিত জুলাই সনদ হয়েছে সিপিবি সেটা স্বাক্ষর করেনি। কেন করেনি? ওরা বলেছে যে কিছু মৌলিক নীতিগত প্রশ্নে ওরা ন্যুনতম আপোষও করতে পারবে না। অর্থাৎ ঐ লাইনটা সিপিবি ক্রস করবে না। সিপিবির সাথে আরও কয়েকটা দল এই কাজ করেছে। ওদেরকে সালাম জানাতেই হয়। নানারক রাজনৈতিক মতভেদ, চাপ কোনকিছুই ওদেরকে আমাদের শত্রুপক্ষ রাজাকারদের কাতারে দাড় করাতে পারেনি।
এই রাজনৈতিক লাইনটা মনে রাখবেন। রাজাকার আপনার মিত্র নয়, এই দেশের মিত্র নয়। বাঙালী জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপক্ষতা হচ্ছে সেই রেডলাইন যেটা ওপারে গেলে আপনি রাজাকারদের কাতারে দাঁড়ালেন।

শেয়ার করূন

আপনার মতামত