Advertise
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৬:৪৯
ভাইরাল ভিডিওটা আমার চোখে পড়েছে। প্লেনে বাংলাদেশি দুই যাত্রী মারামারি করছে। বিদেশে থাকা আমরা বাংলাদেশিরা কেমন, আপনারা যারা বাংলাদেশে থাকেন। অনেকেই হয়ত জানেন না।
আমার দুই যুগেরও বেশি অভিজ্ঞতা থেকে বলছি- আমরা বাংলাদেশিরা ইউরোপে থাকি, অ্যামেরিকায় থাকি কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে। আমরা বাস করি এক ভাগাড় মনোজগতে। উদাহরণ দেই।
কোথাও যদি ২০জন বাংলাদেশি থাকে । সেখানে চারটা গ্রুপ। এক গ্রুপ আরেক গ্রুপকে দেখতেই পারে না! একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে বলছে না এমন কিছু নাই। গল্প বানানো তো এক কথা। আমরা তিলকে তাল না, তরমুজ বানিয়ে ছাড়ি।
আমরা সভ্য দেশে এসে মনে করি- বিশাল কিছু হয়ে গেছি! বিশ্বাস করেন, বেশিরভাগ বাংলাদেশি এমনই মনে করে। এরপর আমরা অন্যদের আর মানুষ মনে করতে চাই না। পড়তে গিয়ে সুইডেন আর ইংল্যান্ডে যা দেখেছি! ওটার কথা বাদই দিলাম । ওইসব দেশে তো অনেক বাংলাদেশি থাকে। এস্তোনিয়াতে আমি যখন আসি আজ থেকে ১৫ বছর আগে । তখন এই দেশে সব মিলিয়ে বাংলাদেশি ছিলই হয়ত ১০০ জনের মত।
পারলে এই একশো জনের মাঝে ৫০টা গ্রুপ! এখনও যে খুব বেশি আছে এমন না। আমি ঠিক জানি না, এখন কত আছে। হয়ত ৫০০- এক হাজার হবে। এদের অর্ধেকই হয়ত আমার ছাত্র-ছাত্রী ছিল কিংবা আছে।
এই ছাত্র-ছাত্রীরা পর্যন্ত পাশ করে বের হয়ে একটা ভালো চাকরি পাবার পর, ওদেরই অন্য কোন ক্লাসমেট যদি একটু সাধারণ চাকরি করে। ওদেরকে মানুষ মনে করতে চাইছে না! মানে ভালো একটা চাকরি পাবার সঙ্গে সঙ্গে সে নিজেকে এলিট-বুর্জোয়া ভাবতে শুরু করেছে!
আবার বিদেশে যারা সাধারণ চাকরি করে। আসলে সব চাকরিই ভালো। মানে বুঝানোর জন্য বলছি। ধরুন ইউরোপ-অ্যামেরিকায় যারা হোটেল -রেস্তোরাঁয় কাজ করছে। তাঁরা বাংলাদেশে গিয়ে সেখানকার হোটেল রেস্তোরাঁর কর্মীদের তুই-তকারি করে!
চোখের সামনে আমার ছাত্রকে দেখেছি এই কাজ করতে। যে নিজে এখানে রেস্তোরাঁয় কাজ করে। মরে গেলেও কোন দিন আমার মুখ দিয়ে তুই -তকারি আসবে না। কোন দিন একজন রিকশাওয়ালাকে পর্যন্ত তুই বা তুমি বলি নাই। কারন আমার কাছে সকল কাজের মূল্য আছে। কিন্তু সে ঠিকই এই কাজ করেছে।
৫০০/৬০০ জন বাংলাদেশির মাঝে কত শত গ্রুপ! আর একজন আরেকজকে নিয়ে কত শত গল্প যে আমরা বাংলাদেশিরা বানাই! মানে এতেই মনে হয় জগতের সকল সুখ। আমার কী ধারণা জানেন?
আমরা বাংলাদেশিরা অন্যকে ছোট করে মজা পাই। আমরা ছোট থেকে বড় হতে থাকি এইসব শিখে। বিশ্বাস করেন, এই শহরে আমি একজন বাংলাদেশির সাথেও কথা বলি না। আমার কারও সাথে সম্পর্ক নাই। Not even a single one. প্রথম দিকে কথা বলাতাম। এরপর মনে হয়েছে- অসম্ভব!
এইসব এলিট-বুর্জোয়া স্বভাবের বাংলাদেশিরা ঠিক কই থেকে আবির্ভূত হয় আমি ঠিক বুঝতে পারি না। এদের বেশিরভাগই যেই দেশে থাকে, এদের কারও সাথে মিশে না। নিজেরা নিজেরা থাকে। সেখানেও থাকতে গিয়ে হাজার রকম গ্রুপিং! আমার ছাত্র, যে বিদেশে আসছে সেই দিন। কিছুদিন আগে সামার ভ্যাকেশনে দেশে যাচ্ছি। এই ছেলে আমাকে জিজ্ঞেস করেছে
- স্যার , এই গরমের মাঝে দেশে যাবেন? এত গরম তো সহ্য হয় না।
আজব কাণ্ড! মনে হয় সে শীতের দেশে জন্মেছে। তাঁর বাপ-দাদা মনে হয় ইউরোপেরই ছিল। এরা বাংলাদেশ ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে - দেশ নিয়ে এমন কথা বলে, মনে হয়- ওটা আবার কী!
এই যে আমি বাংলাদেশকে সকাল-বিকাল ভাগাড় বলি। এটা কি বাংলাদেশকে ঘৃণা করে বলি? মোটেই না। বরং নিজ দেশকে ভালোবাসি বলে , দেশের অনিয়ম নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বাংলাদেশকে ভাগাড় বলে বেড়াই। থাকি বিদেশে , চাকরি করি বিদেশে । জীবনে কোন দিন কোন রাজনৈতিক দল করি নাই। করবোও নাই। তবুও স্রেফ দেশকে ভালোবেসে লেখালেখি করার জন্য জেলে যেতে হয়েছে। হাওয়া করে দিয়েছে। ভবিষ্যতে হয়ত এমনই হবে। সাথে কত শত সমালোচনা তো শুনতেই হয়।
তবুও বাংলাদেশ নিয়ে লিখি। কারন মনে হয়- অন্তত লেখালেখি করে নিজ মাতৃভূমির প্রতি দায়টুকু মেটাই। আর এরা? এই বুর্জোয়া ছাত্র-ছাত্রী আর বিদেশে থাকা বাংলাদেশিরা? একটা বাক্যও ব্যায় করে না বাংলাদেশ নিয়ে। এরা ভাবে বাংলাদেশ ময়লা। বিশ্বাস করেন- এরা এসবই বলে বেড়ায়। এই যে দুই বাংলাদেশি মারামারি করছে। কেন করছে?
কারন এরা দুইজনই নিজেকে বিশাল কিছু মনে করছে হয়ত। সমাজ ও রাজনীতি নিয়েই তো পড়াশুনা করেছি। তাই আমি বুঝতে পাড়ি ব্যাপারগুলো। আরে, আপনারা যে বিদেশে থাকেন। আপনাদের তো নিজেদের প্রতি করুণা হওয়া উচিত যে, নিজ দেশে আমরা মৌলিক অধিকার টুকুও পাই না। এই জন্য আমাদের বিদেশে থাকতে হয়। অন্য দেশের নাগরিক হতে হয়। আবার এটা নিয়ে আমরা গর্বও করি!
এই যে আমাদের নাক উঁচা স্বভাব তৈরি হয় বিদেশে থাকতে থাকতে। এর প্রতিফলনই হচ্ছে এই মারামারি। ইংল্যান্ডে থাকতে আমি বাঙালি পাড়ায় রাস্তায় রাস্তায় পানের পিক পড়ে থাকতে দেখেছি। নিউইয়র্কের বাঙালি পাড়াতেও আমি একই অবস্থা দেখেছি।
এইসব দেশে রাস্তা এত পরিষ্কার যে, আপনি শুয়ে পড়তে পারবেন। কিন্তু আমরা বাংলাদেশিরা অভ্যাস পরিবর্তন করছি না। থেকে যাচ্ছি ওই ভাগাড় স্বভাব নিয়ে। তবুও এলিট-বুর্জোয়া স্বভাব যায় না।
বাংলাদেশ ছেড়ে বিদেশে আসার সঙ্গে সঙ্গে একেকজন মনে করে- জাতে উঠে গেছে। জাতে উঠলে মানুষ ভদ্র হয়। আর আমরা হই এলিট-বুর্জোয়া। এরপর আমরা মারামারি করি। গ্রুপিং করি। একজন আরেকজনের সম্পর্কে গল্প বানাই। কোন ভালো কিছুতে আমাদের দেখা যায় না!
আমি মনে করি এবং আমৃত্যু মনে করবো- বাংলাদেশে থাকা সাধারণ কৃষক , শ্রমিক এবং চাকরিজীবীরা বিদেশে থাকা এলিট-বুর্জোয়ার ভেক ধরা বাংলাদেশিদের চাইতে অনেক ভদ্র এবং সভ্য। ইন-ফ্যাক্ট, দিনশেষে দেশে-বিদেশে আমরা সবাই ভাগাড়। কারন আমাদের মগজই ভাগাড়! ফুল স্টপ।