Advertise
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০০:২৫
অপ্রতীমের টিকটক আইডির পোস্ট, ছবি আর কমেন্টগুলো একটু ঘেঁটে দেখলাম। দেখার পর মনে হলো, এইটুকু বয়সেই ও এমন একটা সার্কেলের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছিলো, যা তার বয়সের তুলনায় মোটেও নিরাপদ ছিলো না। ও যাদের সাথে মিশতো তাদেরকে কিশোর গ্যাং এর পোলাপানের মত লাগে।
আমি শুধু একটা কথাই ভাবছি, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সন্তান কীভাবে এমন পরিবেশে বড় হচ্ছিল? ভাবতেও কেমন অবাক লাগে। তাঁর মা সব ব্যাপারে এত বেশি সচেতন কিন্তু নিজের ছেলের দিকে একবারও নজর দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করে নাই! স্ট্রেঞ্জ।
আপনার ছেলে বুইড়া ধামরা মার্কা বস্তিটাইপ পোলাপানের সাথে মিশছে, অশালীন ভাষা ব্যবহার করে গ্যাং টাইপের ভিডিও বানাচ্ছে, নেশাখোর, ছিনতাইকারীর মত দেখতে পোলাপানের সাথে মিশছে, হাইওয়েতে ৮০/৯০ কিমি স্পীডে বাইক চালাচ্ছে, আপনি এসব জানেন না। এই ধরনের সঙ্গ একটা সময় বাচ্চাদেরকে এমন পরিণতির দিকেই ঠেলে দেয়।
কমেন্টে মেয়েদের উদ্দেশে অশালীন, অবমাননাকর ভাষা, বাইকের সঙ্গে ছবি, এমন কিছু মানুষের সঙ্গে ওঠাবসা যাদেরকে আমরা কিশোর গ্যাং বলে চিনি। আর সিসিটিভি ফুটেজেও অন্তত এমনটাই দেখা যাচ্ছে যে, যারা তার কাছে এসেছিল তারা একেবারে অপরিচিত কেউ ছিল না।
ভয়ংকর না ব্যাপারটা? অপ্রতীমের বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর।
এই বয়সে একটা শিশু ভুল করতে পারে। ভুল মানুষকে বন্ধু ভাবতে পারে। কৌতূহল থেকে এমন কিছু দেখতে পারে, যা তার দেখা উচিত নয়। কারও প্রভাবে এমন ভাষা ব্যবহার করতে পারে, এমন আচরণ করতে পারে, যা পরিবারকে অস্বস্তিতে ফেলবে। কিন্তু এসব ভুলের প্রতিটিই সংশোধন করার সুযোগ আছে। একটা হত্যার কোনো সংশোধন নেই।
অপ্রতীম কী করত, কার সঙ্গে মিশত, টিকটকে কী পোস্ট করত এসব নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। কিন্তু এসব ভুল কোন ভাবেই ১৩ বছরের একটি শিশুকে হত্যার লাইসেন্স দেয় না। অপ্রতীম যা-ই করে থাকুক, সে এই মৃত্যু ডিজার্ভ করে না।
যারা তাকে হত্যা করেছে, হত্যার দায় তাদেরই। শুধু তাই না, রাষ্ট্রেরও এমনকি শিশুটির বাবা মায়েরও দায় আছে।
একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের সন্তান যে পরিবেশে বেড়ে উঠে, সেটার স্তর পেরিয়ে একটা শিশু এমন একটি সার্কেলের মধ্যে ঢুকে গেল, কেউ কি সেটা বুঝতে পারেনি?
আমরা সন্তানকে স্কুলে পাঠাই, ফোন কিনে দিই, ইন্টারনেট দিই, বাইক দিই, স্বাধীনতা দিই, কিন্তু তার জীবনে ঢুকে পড়া মানুষগুলোকে চিনি না কেন?
সে কার সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলে, কমেন্টে কেমন ভাষা ব্যবহার করে, কী ধরনের ভিডিও দেখে, কাদেরকে অনুকরণ করে, কাদের জীবনযাপনকে গ্রহণ করতে শুরু করেছে, কোন বন্ধুটি তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, কোন মানুষগুলো তার কাছে ভাই, বন্ধু কিংবা গ্রুপ হয়ে উঠছে ইত্যাদি জানার দরকার আছে। এগুলো অভিভাবকত্বের অংশ।
বিশেষ করে কৈশোরে। কারণ এই বয়সে শিশুর কৌতূহল অনেক বেশি থাকলেও ঝুঁকি বোঝার ক্ষমতা হয় না। এই বয়সের শিশুরা পুরোপুরি পরিণত নয়। একটা ভুল বন্ধুত্ব কখন যে অভ্যাসে পরিণত হয়, একটা অনলাইন পরিচয় কখন যে বাস্তব জীবনের ঝুঁকিতে নিয়ে যায়, শিশু সবসময় সেটা বুঝতে পারে না। আর এখানেই পরিবারের দায়িত্ব।
যে আইফোনটির কথা বলা হচ্ছে, সেটি অপ্রতীমেরই ছিল, তার টিকটক অ্যাকাউন্টে থাকা ছবি ও ভিডিও দেখে অন্তত এটা শিউর হওয়া যায়। ফোন দিয়েছে সেটা দোষের না কিন্থ সন্তানের হাতে থাকা সেই ফোনের ভেতরের পৃথিবী সম্পর্কে পরিবার কতটা জানত? কেন জানতো না? ঠিক এই জায়গাতেই পরিবারের সচেতন হতে হবে।
তবে আরো একটি কথা পরিষ্কার করে বলি, তার অভিভাবকের নজরদারির ঘাটতি কোনোভাবেই হত্যাকারীর দায় কমায় না। একটি শিশু খারাপ সঙ্গের সঙ্গে মিশেছে, এটা তাকে হত্যা করার লাইসেন্স নয়।
একটি শিশু অশালীন ভাষায় কথা বলেছে, এটা তাকে হত্যা করার লাইসেন্স নয়। একটি শিশু ভুল করেছে, এটাও তাকে হত্যা করার লাইসেন্স নয়।
একজন ১৩ বছরের শিশু যদি কিশোর গ্যাং-সদৃশ পরিবেশের মধ্যে ঢুকে পড়ে, যদি অপরাধীচক্র বা সহিংসতার সংস্কৃতি তার চারপাশে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, যদি পরিচিত কিশোরদের মধ্যেই নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়, তাহলে আইনশৃঙ্খলা, কিশোর অপরাধ প্রতিরোধ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল পরিবেশ, সবকিছুর উপরেই দায় বর্তায়।
পরিবারও প্রশ্নের বাইরে নয়। কারণ সন্তানকে জন্ম দেওয়া আর সন্তানকে বড় করা এক জিনিস নয়।
সন্তান কী খাচ্ছে, কী পড়ছে এতটুকু জানলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সন্তান কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে, কী দেখে প্রভাবিত হচ্ছে, কোন আচরণকে স্বাভাবিক ভাবছে, কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে বদলে যাচ্ছে, এসবও জানতে হয়।
অপ্রতীমকে এখন আর ফিরিয়ে আনা যাবে না।
তার ভুলগুলো সংশোধন করার সুযোগও আর নেই। তাই সময় থাকতে সচেতন হন।
(বিঃদ্রঃ আমি কোনোভাবেই হত্যাকে জাস্টিফাই করছি না। হত্যা অপরাধ, এর দায় হত্যাকারীরই। আমি শুধু হত্যার আগে তৈরি হওয়া প্রেক্ষাপটটা বোঝাতে চেয়েছি। প্রতিদিন বহু শিশু নিখোঁজ বা নানা অপরাধের শিকার হয় অপ্রতীমের ঘটনা ভাইরাল হওয়ায় আমরা বেশি জানতে পেরেছি। কিশোর গ্যাংকে ঠেকানো প্রশাসনের দায়িত্ব। পাশাপাশি ১৩ বছরের একটি শিশু কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, কী করছে, সেদিকে নজর রাখাও পরিবারের দায়িত্ব। হ/ত্যার কোনো অজুহাত নেই, কিন্তু ভবিষ্যতের শিশুদের বাঁচাতে ঝুঁকির প্রেক্ষাপটগুলো বোঝা জরুরি।)