আজ সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ইং

Advertise

মুক্তমত

মুজিব রহমান

২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০০:৩৪

লেখক জাফর ইকবালদের হয়রানি করার পরিণতি ভালো হয় না

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পাঁচজন নিহত ও প্রায় ৩০০ জন আহত হওয়ার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় লেখক ও অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালকে হয়রানি করা হলে, তা ইতিহাস ক্ষমা করবে না। ষড়যন্ত্র, উসকানি, প্ররোচনা ও অন্যান্য অমানবিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জাফর ইকবাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নীলক্ষেত, নিউমার্কেট, সায়েন্স ল্যাব ও আজিমপুর এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় জড়িত ছিলেন-এমন কথা কেউ বিশ্বাস করবে না। তিনি একজন বুদ্ধিজীবী ও লেখক হিসেবে কোনো দলকে সমর্থন করতেই পারেন কিন্তু অমন অপরাধ করবেন না তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।


ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট দ্য গল জাঁ পল সার্ত্রকে খুবই অপছন্দ করতেন। নিপীড়ন করেও দেখেছেন সুবিধা নেই। শেষে বাধ্য হয়েছেন তাঁকে নরম সুরে চিঠি লিখতে। বার্ট্রান্ড রাসেলও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। স্পেনের স্বৈরশাসক বহু লেখক, বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীর প্রতিই নিপীড়ন চালিয়েছেন কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। বাংলাদেশেও অন্যায়ভাবেই দাউদ হায়দার ও তসলিমা নাসরিনকে নিপীড়ন করা হয় এবং দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। এসব দেশের জন্য মঙ্গল বয়ে আনেনি।
ফিয়োদর দস্তয়েভস্কিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল কিন্তু শাসকরা শেষ পর্যন্ত ভয় পেয়ে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড় করানোর শেষ মুহূর্তে দণ্ড মওকুফ করে। সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্টালিনের সমালোচনা করায় আরেক সোভিয়েত লেখক আলেকজান্দার সলঝেনিৎসিনকে নিপীড়ন করা হয়। ফরাসি রাজতন্ত্র এবং চার্চের কঠোর সমালোচনা করার কারণে ভলতেয়ারকে বেশ কয়েকবার বাস্তিল দুর্গে কারাবরণ করতে হয়েছিল। স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময় স্বৈরাচারী জেনারেল ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর ফ্যাসিবাদী বাহিনী ১৯৩৬ সালে মহান কবি ও নাট্যকার গার্সিয়া লোরকাকে গুলি করে হত্যা করে। আমরা ফ্রাঙ্কোর পরিণতিটাও জানি।
নাজিম হিকমতের রাজনৈতিক কবিতা ও কমিউনিস্ট মতাদর্শের কারণে তুর্কি সরকারের কোপানলে পড়েন। জীবনের একটি বড় অংশ তাকে কারাগারে কাটাতে হয় এবং পরে তিনি দেশত্যাগে বাধ্য হন। পরে নিপীড়নকারী শাসক মেন্দিরেস এবং তাঁর দলের শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করে সামরিক আদালতের মুখোমুখি করা হয়। আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তাই বলি লেখকদের সাথে ঝামেলা করার সর্বনাশা পথ পরিহার করাই মঙ্গলজনক। জাফর ইকবালের মতো জনপ্রিয় লেখক এদেশে এখন আর কেউ বেঁচে নেই।


মনে রাখবেন জাফর ইকবাল দেশে আসার আগে ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি-তে পোস্ট-ডক্টোরাল গবেষক হিসেবে কাজ করেন এবং বেল কমিউনিকেশনস রিসার্চ-এ রিসার্চ সায়েন্টিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এ দুটি প্রতিষ্ঠানে প্রায় এক যুগ কাজ করার পরে তাঁর মনে হয়েছিল, দেশের জন্য কিছু করা দরকার। তিনি ড. জামাল নজরুল ইসলাম স্যারের নিকট পত্র লিখেন, দেশে আসবেন কি না? জামাল তাঁকে জানান, ‘আমি পারলে তুমি কেন পারবা না।’ দেশে এসে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করার জন্য সুযোগ-সুবিধা পাননি। তিনি সাস্টে পড়িয়েছেন এবং সাস্টের উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। তিনি বই লিখেছেন, কলাম লিখেছেন। আজ যদি তাঁকে ফাঁসির মুখে ঠেলে দেওয়া হয় তাহলে তার দায় কে নিবেন?


নাজিম হিকমতের কথা মনে রাখলে ভালো। নইলে পাবলো নেরুদার কথা মনে রাখেন। কবি পাবলো নেরুদার প্রতি নিপীড়নকারী এবং তার মৃত্যুর পেছনে প্রধান অভিযুক্ত স্বৈরশাসক পিনোচেতের শেষ পরিণতি হয়েছিল অত্যন্ত অসম্মানজনক ও কলঙ্কিত। চিলির মানুষের তীব্র গণ-আন্দোলনে ক্ষমতার পতন ঘটে এই স্বৈরশাসকের। আমি জাফর ইকবালদের গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিসের সাথেই তুলনা করি। সক্রেটিসকে বিষাক্ত হেমলক পানের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তাঁর এই ট্র্যাজিক মৃত্যুর পর, তাঁর বিরুদ্ধে মূল অভিযোগকারী বা নিপীড়নকারীদের জীবনে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছিল। মেলেতুস ছিলেন সক্রেটিসের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনয়নকারী প্রধান ব্যক্তি। সক্রেটিসের মৃত্যুর কিছুদিন পরই এথেন্সের জনগণের ভুল ভাঙে এবং তারা বুঝতে পারে যে তারা একজন মহান ও নিরপরাধ জ্ঞানী মানুষকে হত্যা করেছে। জনগণের এই তীব্র ক্ষোভ ও অনুশোচনার মুখে মেলেতুসকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে আদালতের মাধ্যমে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ধনাঢ্য আনিতুস ছিলেন নেপথ্যের লোক। মানুষজন সক্রেটিসের হত্যাকারী হিসেবে তাকে চিনে ফেলে এবং তাকে পাথর ছুড়ে শহর থেকে তাড়িয়ে দেয়। শেষ জীবনে তিনি চরম অপমান ও অবজ্ঞার মধ্যে নির্বাসিত অবস্থায় মারা যান। লিকন আদালতে সক্রেটিসের বিরুদ্ধে জোরালো বক্তব্য দিয়েছিলেন। সক্রেটিসের মৃত্যুর পর এথেনীয় সমাজ তাকে পুরোপুরি বর্জন করে। তাকে এথেন্স থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয় এবং তিনি চরম দারিদ্র্য ও লোকচক্ষুর অন্তরালে নিঃস্ব হয়ে জীবনাবসান ঘটান। এসব মনে না রেখে, খবর না নিয়ে যদি জাফর ইকবালদের নিপীড়ন করা হয় তবে ইতিহাস কাউকেই ক্ষমা করবে না। সিরাজ উদ দ্দৌলা ও বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পরিণতির কথাও মনে রাখেন। এরপর জাফর ইকবালকে ফাঁসির মঞ্চে উঠান।

শেয়ার করূন

আপনার মতামত