Advertise
২৮ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:৩৫
সিলেট নগরের রায়নগরে প্রবীণ ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও তাদের গৃহকর্মী তাহমিনাকে হত্যার ঘটনার তদন্ত নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এই মামলার বাদি সেলিনা সুলতানা। প্রবাসী সেলিনা সুলতানা নিহত দম্পতি আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগমের মেয়ে।
বুধবার দুপুরে পিতা-মাতা হত্যার সুষ্ঠু বিচার চেয়ে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মাকিলিপি প্রদান করেন সেলিনা ও তার স্বজনরা। এরআগে সিলেট কেন্দ্রিয় শহীদ মিনারে জড়ো হয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে মামলার তদন্ত নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
সেলিনা সুলতানা বলেন, ইম্পালস লিমিটেডের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে জমি নিয়ে আমার বাবার বিরোধ ছিল। ১২ শতাংশ জায়গা নিয়ে বিরোধের কারণে বাবা মামলা করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সিরাজ আমার বাবাকে বাসায় এসে হুমকী দেন। আমার সামনেই হুমকী দেন।
তিনি বলেন, হুমকী পেয়ে বাবা থানায় মামলা ও জিডি করেন। আমার বাবা জীবিত থাকা অবস্থায় মামলা ও জিডি করলেও পুলিশ এখন সেগুলআ আমলে নিচ্ছে না।
সেলিনা সুলতানা প্রশ্ন রেখে বলেন, সিরজেকে কেন এই হত্যা মামলার তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে না। কেন তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে না। বিভিন্ন জায়গায় জিজ্ঞেস করেও এসবের কোন সদুত্তর পাচ্ছি না আমি।
পরে শহীদ মিনার থেকে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মাকলিপি প্রদান করেন সেলিনা সুলতানা ও তার স্বজনরা। জেআ প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন এই স্মরকলিপি গ্রহণ করেন।
১২ আগস্ট সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে নগরীর রায়নগর মিতালি আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসা নিকুঞ্জ ভিলায় তিনজনকে হত্যার ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন- ব্যবসায়ী মো. আব্দুস সাত্তার (৮২), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) এবং গৃহপরিচারিকা তাহমিনা (২৫)।
এ হত্যাকান্ডের পরপরই আলোচনায় উঠে আসে সিরাজুল ইসলাম নামে জামায়াত ঘণিষ্ঠ সিলেটের এক আইনজীবীর নাম।
বিশেষত নিহত আব্দুস সাত্তারের মেয়ে সেলিনা সুলতানা থানায় জমা দেওয়া এজাহারে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অ্যাডভোকেট সিরাজের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেন।
বিশেষত নিহত আব্দুস সাত্তারের মেয়ে সেলিনা সুলতানা শুক্রবার রাতে কোতোয়ালি থানায় জমা দেওয়া এজাহারে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অ্যাডভোকেট সিরাজের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
সিরাজের সঙ্গে আব্দুস সাত্তারের জমিসংক্রান্ত বিরোধ ছিল। আব্দুস সাত্তার খুন হওয়ার পর থেকেই বিরোধের বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে। তখন থেকেই আব্দুস সাত্তারের স্বজনসহ স্থানীয় অনেকে ট্রিপল মার্ডারের সাথে এই বিরোধের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করে আসছেন।
তবে হত্যাকাণ্ডের পরপরই ওই দিন বিকেল আনুমানিক সাড়ে ৩টার দিকে রায়নগর রাজবাড়ী এলাকার একটি কলোনিতে অভিযান চালিয়ে বাবুল মিয়াকে (৪০) গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দাবি, গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছোরা উদ্ধারের অভিযান চালানো হয়। পরে ১৩ আগস্ট সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে বাবুল মিয়ার দেখানো স্থান থেকে ছোরাটি উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ প্রথমে দাবি করেছিল, গৃহপরিচারিকা তাহমিনার সঙ্গে বাবুল মিয়ার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। পূর্বপরিচিত হওয়ায় ঘটনার দিন তিনি ওই বাড়িতে যান। দরজায় নক করলে তাহমিনা দরজা খুলে তাকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেন। পরে একটি কক্ষে গিয়ে বাবুল তাহমিনার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করলে তিনি এতে অমত প্রকাশ করেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়।
একপর্যায়ে বাবুল তাহমিনাকে ছুরি দিয়ে আঘাত করেন বলে পুলিশ জানায়। এ সময় সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে তার সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। এরপর বাবুল বারান্দা দিয়ে পালিয়ে রায়নগর এলাকায় নিজের বাড়িতে ফিরে যান বলে পুলিশের দাবি। পরে পুলিশের বিশেষ টিম সেখানে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে।
হত্যাকান্ডের তিনদিন পর গত ১৪ আগস্ট রাতে সাত্তার-সুরাইয়া দম্পতির প্রবাসী মেয়ে সেলিনা সুলতানা বাদী হয়ে কতোয়ালি থানায় এ মামলা দায়ের করেন। তবে মামলার এজাহারে বাবুল মিয়ার নাম ছিলো না।
১৬ আগস্ট সকালে বাবুল মিয়াকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করে পুলিশ।
তবে ২০ আগস্ট হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন আসামি বাবুল মিয়া। এতে তিনি জানান, সেদিন সকালে চুরি করতে ওই বাসয় গিয়েছিলেন বাবুল মিয়া। চুরি করার সময় দেখে ফেলায় একেএকে তিনজনকে হত্যা করেন তিনি।
পুলিশের তদন্ত নিয়ে প্রথম থেকেই অসন্তোষ প্রকাশ করে নিহতের পরিবার। এরপর মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই।
পিবিআই বলছে, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং ঘটনায় অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গত ২১ সেপ্টেম্বর বাবুল মিয়াকে দুই দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পিবিআই।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ঘটনার পরপর সিরাজুল ইসলাম বলেছিলেন, বিষয়টি আপনারা সবাই জানেন, এটির তদন্ত হোক। এ বিষয়ে পরে কথা বলব।
সিরাজের বিরুদ্ধে বাদীর যে অভিযোগ
আব্দুস সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম এবং গৃহকর্মী তাহমিনা বেগম হত্যার ঘটনায় শুক্রবার রাতে থানায় লিখিত অভিযোগ দেন আব্দুস সাত্তারের মেয়ে সেলিনা সুলতানা।
এজাহারে জমি সংক্রান্ত পূর্ব বিরোধের জেরেই তারা বাবা-মা ও গৃহকর্মীকে ভাড়াটিয়া লোক দিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
এজাহারে সেলিনা সুলতানা উল্লেখ করেন, ১৯৯৭ সালে তিনি ও তার বাবা পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতি সিলেটের কাছ থেকে রিকাবীবাজারের সরষপুর এলাকায় আনুমানিক ১২ শতক জমি লিজ নিয়ে সেখানে বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছিলেন।
২০০৬ সালে ইম্পালস বিল্ডার্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম তাদের লিজ নেওয়া জমিসহ সমিতির ৮০ শতক জমি ইম্পালস বিল্ডার্সের নামে ১৮৫২২/০৬ নম্বর সাফকবলা দলিল করেন এবং নামজারি করে মালিকানা দাবি করেন।
এ নিয়ে ২০১৬ সালে সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে স্বত্ব মামলা করেন তার বাবা। পরে মামলাটি স্বত্ব-২১১/২০২৩ নম্বরে রূপান্তরিত হয়ে যুগ্ম জেলা জজ অতিরিক্ত আদালতে বিচারাধীন রয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেলিনার দাবি, মামলা প্রত্যাহারের জন্য তাকে ও তার বাবাকে বিভিন্ন সময়ে হুমকি দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০২৩ সালে সিরাজুল ইসলাম সেলিনার বাবা এম এ সাত্তার, মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম, পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির বর্তমান চেয়ারম্যান জমিংথাংগা লুসাইসহ কয়েকজন লিজগ্রহীতার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করেন। মামলাটি অতিরিক্ত জেলা জজ ৫ম আদালতে বিচারাধীন রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এজাহারে সেলিনা অভিযোগ করেন, ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি সিরাজুল ইসলাম আমিন হোসেনসহ কয়েকজনকে নিয়ে তার বাবার বাসায় গিয়ে স্বত্ব মামলা প্রত্যাহারের জন্য হুমকি দেন। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হয়। পরে এ ঘটনায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৮ মে সিলেট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সামনে মামলাসংক্রান্ত বিরোধের জেরে সিরাজুল ইসলাম মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামকে মারধর করে রক্তাক্ত জখম করেন। এ ঘটনায় তৌহিদুল ইসলাম থানায় অভিযোগ করেন। পরে প্রতিকার না পেয়ে ৬ আগস্ট ২০২৫ আদালতে কোতোয়ালি সিআর ১০৫৭/২০২৫ নম্বর মামলা করেন। মামলাটি ডিবি সিলেট তদন্ত করছে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
সেলিনার অভিযোগ, সর্বশেষ গত ২৮ জুলাই মুখ্য জেলা জজ ২য় আদালতে পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির ভূমি-সংক্রান্ত স্বত্ব ৭৩/২৩ মামলার শুনানির সময় তার বাবার নিয়োজিত আইনজীবীকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া হয়। ৩০ জুলাই তার বাবা আদালতে গেলে তাকেও মামলা প্রত্যাহারের জন্য আবার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এজাহারে সেলিনা উল্লেখ করেন, স্বত্ব মামলা থেকে ১৮৫২২/০৬ নম্বর সাফকবলা দলিলটি রক্ষা করার জন্য পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ভাড়াটে খুনিদের দিয়ে গত ১২ আগস্ট সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে রায়নগরের মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলায় তার বাবা আব্দুস সাত্তার, মা সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমকে হত্যা করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাসা থেকে কাগজপত্র, জিডির কপি ও দলিলাদি নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।
থানায় অভিযোগ দেওয়ার পর সেলিনা সুলতানা সাংবাদিকদের বলেন, আমি বিশ্বাস করি না তিনজনকে একা একটা ছেলে হত্যা করেছে। এর পেছনে বড় কোন হাত আছে। আমাদের মা-বাবা যেভাবে খুন হয়েছেন, পরবর্তীতে যেন আর কোনো মা-বাবার এ রকম না হয়। ছেলের কাঁধে যেন আর কোনো মা-বাবার লাশ না ওঠে।