Advertise
২৮ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:২৫
আনুশেহ সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা আছে ‘আপনার’? আনুশেহ আনাদিল ঢাকা মহানগরের একটা বাউল। এই মহানাগরিক বাউল কোন ‘যাতনা’ থেকে ‘ওই’ ভিডিওটা পোস্ট করেছেন অনুমান করতে পারবে কেউ? একটা লোকায়ত বাংলাদেশের কাছে একজন বাউল শিল্পীর গভীর প্রত্যাশা যখন মার খায়, তখন কি সে আর মর্মে বাঁচে?
আনুশেহকে মানুষ একজন শিল্পী হিসেবে চেনে। পর্দা থেকে সরে যাওয়ার পর অনেকে ভুলে গেছে, অনেকে মনে রেখেছে, অনেকে তাকে চেনেই না। অথচ ‘ভাইরাল’ শব্দটা আসার আগে তার গানগুলো ভাইরাল হয়েছিল। সেগুলো ছিল সামান্যই। আনুশেহ আরও নানান রকম কাজ করেছেন সমাজ আর মানুষ নিয়ে। সেসবের খবর বেশিরভাগ মানুষ জানেই না। যারা জানে, তারা তাকে পাগলও ভাবে।
আনুশেহর যে তারকাখ্যাতি ছিল, গান করে পয়সা কামিয়ে দিব্যি কাটিয়ে দিতে পারতেন তিনি। কিন্তু ওসবে তেমন আগ্রহ ছিল না তার। রক্তে আছে জনসংলগ্নতা। মানুষের জন্য, মানুষকে নিয়ে কাজ করতে ভালোবাসেন তিনি। বহু মানুষের দিকে তিনি বাড়িয়েছেন ভালোবাসার মানবিক হাত। সেই মানুষের সংখ্যা কিন্তু কম না। তাদের অনেকে এখন সমাজে প্রতিষ্ঠিত, যদিও শুরুতে তারা ছিল হোপলেস।
শিল্পী হিসেবে চলতি-বেলার গান, ব্র্যান্ড ভ্যালু বিক্রি করে বাঁচার চেয়ে আনুশেহ বেছে নিয়েছিলেন লোকগান। একটা আদর্শ, একটা দর্শন ছিল তার গানের, তার কাজের। একটা স্বপ্ন ছিল তার। তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কোকস্টুডিওতে সবাই গাইলো, আপনি কেন গাইলেন না? কোকস্টুডিওর হর্তাকর্তারা তো সব বাড়ির লোক! তিনি বললেন, কোকের সৌজন্যে কেন গান করবো? এটা কি পরিবেশবান্ধব? প্লাস্টিকে দুনিয়া সয়লাব করে ফেলছে।
রিকশা পেইন্টিং বলে একটা আর্ট ঘরানা আছে। এর শিল্পীরা কর্মহীন হয়ে পড়ছিল। একে জনপ্রিয় করার জন্য কাজ শুরু করে যাত্রা। আনুশেহর প্রতিষ্ঠান ওটা, এখন নাম যাত্রা বিরতি। সেখানে চাকরি দেওয়া হয় রিকশা পেইন্টিংয়ের শিল্পীদের। তাদের আঁকা ছবি দিয়ে পোশাক বানানো হতো, সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে গেল সেসব। বাংলাদেশের রিকশা পেইন্টিংকে পৃথিবীকে ছড়িয়ে দিতে, বৈশ্বিক স্বীকৃতি নিয়ে আসতে যদি কারও অবদান থাকে, আনুশেহদের একটা ক্রেডিট দিতে হবে।
যাত্রা বিরতি নামের রেস্তোরাঁটায় প্রাণীর মাংস পাওয়া যায় না। ওখানে সব ভেজিটেবল। ঢাকার মতো একটা মাংশাসী শহরে এটা একটা পাগলামো ছাড়া কী? কিন্তু এখানেও কাজ করেছে একটা দর্শন। ওই রেস্তোরাঁর উঠানে বাউলশিল্পীদের জড়ো করে গানের আয়োজন করা হয়। গ্রামের বাউলরা বনানীতে এসে গান করে সম্মানী নিয়ে যেতেন। মানুষ টিকিট কেটে ওই শো দেখতে যেতেন। এগুলোর পেছনে আনুশেহর শ্রম ছিল।
গান থেকে বিরতি নিয়ে আনুশেহ একটা চমৎকার কাজ শুরু করেছিলেন। প্রথাগত পশ লাইফ থেকে বেরিয়ে মাটির কাছাকাছি গিয়ে বাঁচার চর্চা শুরু করেছিলেন। প্রথাগত স্কুল থেকে বের করে সন্তানদের নিজের মতো করে পড়াতে শুরু করেন, মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট বাজানো শেখাচ্ছিলেন, হাতের কাজ শেখাচ্ছিলেন। হালের টেকজায়ান্টদের সন্তানেরা সেসব করছে এখন।
গত এক বছরে আনুশেহ লিখেছেন দুই হাতে। সমাজ নিয়ে, রাজনীতি নিয়ে গভীর উপলব্ধির সেই কলামগুলো অনেককে ভাবিয়েছে। কিন্তু যে তরুণদের উদ্দেশে তিনি লিখেছিলেন, তারা লেখাগুলোয় তেমন সাড়া দেয়নি। সেটাও তার এক আশ্চর্য হতাশা।
আসলে আনুশেহর স্বপ্নগুলো মার খেয়েছে। একটা সাম্যের সমাজ, একটা ন্যায়-পরায়ন সমাজ, একটা সাংস্কৃতিক আবহে মোড়া মানুষের জন্য কল্যাণকর দেশ চেয়েছিলেন তিনি। কত কত বছর একটা মানুষ অপেক্ষা করতে পারে? একের পর এক সরকার বদলেছে, তার মতো স্বপ্ন যাদের ছিল, তাদের কারও সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বরং দেশ গেছে রসাতলে। এগুলো কতদিন মেনে নেওয়া যায়? পাগল না হয়ে কি পারা যায় এসব কাণ্ড দেখে!
একজন শিল্পীকে নিয়ে কনটেন্ট আপনি বানাতেই পারেন। কিন্তু তার জীবনের খন্ডিত ছবি দিয়ে কনটেন্ট বানালে সেটা তার সার্বিক কাজের প্রতি অন্যায় করা হয়। সম্মান করার সুযোগ থাকতে আমরা কেন একজন মানুষকে অসম্মান করবো, যিনি সম্মান ও ভালোবাসার দাবীদার?