আজ শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬ ইং

Advertise

মুক্তমত

মঞ্জুরুল হক

২৮ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:১৯

সিপিবির রাজনীতি: আদর্শের দ্বন্দ্ব, ইতিহাসের বিতর্ক

সিপিবি’র সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন-এর সম্পূর্ণ ভিডিও বক্তব্য শুনলাম। বিস্তারিত লিখছি না কারণ, ভিডিওতে সব বলা আছে। তবে চুম্বক অংশ শুনে মনে হলোঃ
▪️
১। ‘জয় বাংলা’ স্লোগান সম্পর্কে বলেছেন―’একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান ছিল জয় বাংলা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তারা কখনও এই স্লোগান দেননি। তাদের স্লোগান―’দুনিয়ার মজদুর এক হও’। হয় তিনি ইতিহাস জানেন না, নয়ত মিথ্যাচার করেছেন।
১৯৭৫ সালের ২৪শে ফেব্রুয়ারি সিপিবি, আওয়ামী লীগ ও ন্যাপ (মোজাফফর) একত্রিত হয়ে বাকশাল গঠন করেছিল। সেই সময় পর্যন্ত নিয়মিত জয় বাংলা স্লোগান দিত সিপিবি।
সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী পাস হওয়ার পর, রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান ২৪শে ফেব্রুয়ারি এক ডিক্রির মাধ্যমে 'বাকশাল' গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিলে সিপিবি ‘সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের অংশ’ হিসেবে নিজেদের দল বিলুপ্ত করে ‘বাকশাল’-এ যোগ দিয়েছিল এবং বাকশালের সাথে একীভূত হয়েছিল।
▪️
২। সিপিবি’র প্রাক্তন সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে একাধিকবার বলেছেন―’বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন একমাত্র সিপিবি-ই বাস্তবায়ন করতে পারে’। তখন সিপিবি আওয়ামী লীগের ‘ঘরের দল’!
সিপিবি ১৯৮৬ সালের তৃতীয় এবং ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ হিসেবে নির্বাচন করেছিল। ১৯৮৬ সালে ৫টি আসন পায় এবং ১৯৯১ সালের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করে ৫টি আসন পেয়েছিল।
‘কমিউনিস্ট পার্টির’ সম্পাদকের এইসব ইতিহাস না জানা গুরুতর বিচ্যুতি অথবা সত্য গোপন করার হিপোক্রেসি।
▪️
৩। সিপিবিকে সাধারণভাবে ‘আওয়ামী লীগের বি-টিম’ বলে বিএনপি-জামাত জোট এবং অন্যান্যরা। এখন ক্বাফী রতন সিপিবিকে ‘তীব্র আওয়ামী বিরোধী’ হিসেবে প্রমাণ করার জন্য বিএনপি-জামাতের ভাষা ব্যবহার করছেন। ভালো। এটা কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা হলো আওয়ামী বিরোধীতার কারণটি তারা বলেন না। আওয়ামী লীগকে তারা ‘বুর্জোয়া’, ‘ফ্যাসিবাদী’, ‘স্বৈরাচারী’ বলতেই পারেন, কিন্তু রাগটা কোথায় সেটি চেপে যান!
▪️
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হওয়ার সময় সিপিবিকে ‘সাথে’ নেয়নি। সেই গোস্বায় সিপিবি বিএনপির মতই ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করেছিল। গোস্বা ভুলে ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। আবার ২০২৪ সালে “হৃদয়হীন স্বৈরাচারী”র অধীনে নির্বাচন বয়কট বলে এই নির্বাচন পুনরায় বর্জন করেছিল। মাও সেতুঙ মধ্যপন্থীদের ব্যঙ্গ করে বলতেন, এরা বুর্জোয়াদের আক্রমণও করে মৃদু ভাষায়-'হৃদয়হীন শাসক!'
▪️
সেই থেকে সিপিবির রাজনীতি বিএনপি-জামাতের কর্মসূচির অনুগামী। কীভাবে তারা ২৪-এর এনার্কিতে বিএনপি-জামাত-হিজবুত-হেফাজতকে সঙ্গ দিয়েছে সেসব ক্বাফী রতন সাহেবের ভিডিওতে আছে। রিপিট করছি না। ক্বাফী রতন-এর স্বীকারোক্তি শুনলে মনে হবে তারা এবং তাদের অফিসই রেজিম চেঞ্জের সূতিকাগার। এসব শুনলে জামাতসহ ইসলামিস্টরা দিলে চোট পাবেন নিশ্চিত।
▪️
ক্বাফী রতন-এর বক্তব্যেই আছে তারা রাষ্ট্রদ্রোহিতার 'জুলাই সনদ' প্রক্রিয়ার অংশ হয়েছিল। যদিও তারা সনদে স্বাক্ষর করেনি, কিন্তু সংবিধানবিরোধী জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের ডাকে সাড়া দিয়েছে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত।
▪️
৪। ক্বাফী রতন-এর বক্তবেই পরিষ্কার তারা জাতীয় ঐকমত্য কমিশন নামের রাষ্ট্রদ্রোহিদের সঙ্গে বসেছে, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী জামাতের সঙ্গে বসেছে, এবং দেশ ধ্বংসকারী বিশ্ব বাটপারের সকল অপকর্মে হয় সায় দিয়েছে, নয়ত মৌন থেকেছে। অথচ দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে বিরোধীতা করার জন্য এসবের দরকার করে না। সরাসরি আওয়ামী লীগের বিরোধীতা করা যায় কারণ, সেটা যে কোনো গণতান্ত্রিক দলের গণতান্ত্রিক অধিকার।
▪️
৫। ক্বাফী রতন সর্বশেষ যে সত্য গোপন করেছেন তাও ভিডিওতে আছে। সংক্ষেপে―সিপিবি কার্যালয়ে কারা হামলা করেছে, নেতা-কর্মীদের মারধোর করেছে, ক্বাফী রতন তাদের নাম বলেননি। তিনি হামলাকারীদের চেনেন না, জানেন না বলে এড়িয়ে গিয়েছেন। অথচ সিসি ক্যামেরায় হামলাকারীদের পরিচয় স্পষ্ট। তারা নিজেরাও ঘোষণা দিয়েছে। তারপরও তিনি ‘ভিডিও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বলবেন’ জানিয়েছেন। আবার দুজন মন্ত্রী ও আইজিপিসহ পুলিশ প্রটেকশনের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন!
▪️
এরই মধ্যে সিপিবির দুই নেতা হযরত আলী এবং জলি তালুকদার ঘোষণা করেছেন, ‘বিএনপি ও আমাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আমরা একসাথে লড়াই করেছি।’ এই সিপিবি’রই আরেকটি অংশ একাত্তর পরবর্তী সময়ের মত মুক্তিযুদ্ধকে সামনে রেখে গণমানুষের মুক্তির লড়াই করতে চাচ্ছে। তারা এই ক্বাফি রতনদের দাপটে কোণঠাসা।
▪️
আইরনি হলো ইনুসের আঠারো মাসের ফ্যাসিবাদী মবতন্ত্র, বিএনপি-জামাত সরকারের জেল-জুলুম, দেশ বিক্রি, অবৈধ দেশবিরোধী চুক্তি, বন্দর লিজ দেওয়ার পরও ‘স্বৈরাচার’, ‘ফ্যাসিস্ট’ শব্দগুলো বলতে পারছে না।
▪️
পুনশ্চঃ সিপিবি’র সম্পাদক কী বললেন, কেন বললেন সেসব কোনও ডিসাইসিভ ফ্যাক্টর নয়, এবং সিপিবি-বাসদের নেতৃত্বাধীন ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’-এর এই ধরণের শ্রেণী সংগ্রামবিহীন রাজনীতি সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনও আলোড়নও তোলে না। দুঃখ এখানেই যে, মুক্তিকামী মানুষ এদেরকে বর্জন ও গালমন্দ করার সময় গড়ে সকল বামকেই গালমন্দ করে। সেটা কিছু ছোট ছোট নিবেদিতপ্রাণ দল ও তাদের কর্মীদের ওপরে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হয় যেটা খুব হতাশাজনক।

শেয়ার করূন

আপনার মতামত