Advertise
১৬ অগাস্ট, ২০২৬ ২৩:৪৩
সম্প্রতি দীর্ঘ বিরতির পর কলকাতায় উপস্থিত হয়ে তসলিমা নাসরীন বলেছেন যে তিনি " ১৯ বছর পর আবার ফিরে এসেছেন"। তাঁর বক্তব্য ছিল আবেগঘন, কবিতাময় এবং ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণায় সমৃদ্ধ। তিনি নারী অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। অনেকের কাছে এটি ছিল একজন বিতর্কিত কিন্তু সাহসী লেখকের প্রত্যাবর্তন; আবার অনেকের কাছে এটি নতুন কিছু প্রশ্নেরও জন্ম দিয়েছে।
একসময় তসলিমা নাসরীন ছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার নারীবাদী আন্দোলনের অন্যতম উচ্চকণ্ঠ লেখক। তাঁর কলাম, প্রবন্ধ ও সাহিত্যকর্ম বহু তরুণ পাঠককে আকৃষ্ট করেছিল। বিশেষত নারী নিপীড়ন, পিতৃতন্ত্র এবং ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তাঁর সাহসী অবস্থান তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছিল। কিন্তু আজ প্রশ্ন উঠছে—সেই জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা কি আগের মতো আছে? এবং আরও বড় প্রশ্ন, তাঁর বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান কি সত্যিই সর্বজনীন মানবতাবাদের প্রতিনিধিত্ব করে?
তসলিমা নাসরীনের আন্তর্জাতিক পরিচিতির সবচেয়ে বড় ভিত্তি নিঃসন্দেহে তাঁর উপন্যাস লজ্জা। ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর সংঘটিত হামলার প্রেক্ষাপটে রচিত এই উপন্যাসে দত্ত পরিবারের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার চিত্র তুলে ধরা হয়। সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রশ্নে বইটি গুরুত্বপূর্ণ দলিলস্বরূপ এবং সেই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
কিন্তু সমালোচকদের একটি অংশের প্রশ্ন হলো, লজ্জা-র পর থেকে তসলিমা নাসরীনের লেখালেখি ও জনপরিসরের বক্তব্য কি ক্রমশ একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে? তিনি নিজেকে মৌলবাদবিরোধী বলে পরিচয় দেন, কিন্তু তাঁর সমালোচকেরা মনে করেন যে তাঁর অধিকাংশ বক্তব্য মুসলিম সমাজ ও ইসলামী সংস্কারবিরোধী সমালোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে। কলকাতার সেই বক্তব্যেই তিনি বলেছেন '' তিনি সব ধরনের ধর্মীয় মৌলবাদের বিরোধী। ইসলামী মৌলবাদের বিরুদ্ধে তিনি বেশি সরব।''
সমালোচকদের আরেকটি প্রশ্ন তসলিমা নাসরীনের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থানকে ঘিরে। তিনি কলকাতায় এসে বিজেপি-ঘনিষ্ঠ নেতা শুভেন্দু অধিকারীর কাছ থেকে সংবর্ধনা গ্রহণ করেন এবং এ নিয়ে প্রকাশ্যে সন্তোষও প্রকাশ করেন। এখানে প্রশ্নটি ব্যক্তিগত সৌজন্য গ্রহণের নয়; বরং রাজনৈতিক প্রতীকের। কারণ ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিজেপির উত্থানকে অনেক গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থান হিসেবেই ব্যাখ্যা করেন। এই মত অনুযায়ী, ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের ধারণা ক্রমশ সংখ্যাগুরুবাদী রাজনৈতিক ভাষ্যের দ্বারা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ফলে একজন লেখক যদি মুসলিম মৌলবাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে সোচ্চার হন, কিন্তু একই সময়ে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা সংখ্যাগুরু সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে তুলনামূলকভাবে নীরব থাকেন, তাহলে তাঁর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। সমালোচকদের বক্তব্য হলো, মানবতাবাদ যদি সত্যিই সর্বজনীন হয়, তাহলে তার সমালোচনার তীরও সব ধরনের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উগ্রবাদের দিকে সমানভাবে নির্দেশিত হওয়া উচিত।
এই প্রশ্ন নতুন নয়। বাংলাদেশের প্রয়াত লেখক হুমায়ূন আজাদ-ও ধর্মীয় মৌলবাদের কড়া সমালোচক ছিলেন। কিন্তু তাঁর লেখায় ধর্মীয় উগ্রবাদের পাশাপাশি জাতীয়তাবাদ, সামাজিক পশ্চাৎপদতা, রাজনৈতিক ভণ্ডামি এবং বাঙালি সমাজের নানা সংকটও সমানভাবে স্থান পেয়েছে। ফলে অনেকের মতে, মৌলবাদবিরোধিতা তখনই বিশ্বাসযোগ্য হয় যখন তা সব ধরনের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উগ্রবাদের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হয়।
ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাও এই আলোচনাকে প্রাসঙ্গিক করে তোলে। মানবাধিকার সংস্থা, গবেষক এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থান সাম্প্রদায়িক মেরুকরণকে বাড়িয়ে দিয়েছে। গরু জবাই, খাদ্যাভ্যাস, ধর্মীয় পরিচয় এবং নাগরিকত্বের মতো বিষয় নিয়ে দেশটিতে বহু বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সমালোচকেরা প্রশ্ন তোলেন: যদি একজন লেখক সত্যিই সর্বজনীন মানবতাবাদে বিশ্বাস করেন, তাহলে তিনি মুসলিম মৌলবাদের পাশাপাশি হিন্দু উগ্রবাদ, সংখ্যাগুরুবাদ এবং রাষ্ট্রসমর্থিত সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধেও সমানভাবে সোচ্চার হবেন না কেন?
তসলিমা নাসরীন বিভিন্ন সময়ে ইসলামী সমাজের নানা কুসংস্কার, নারীবিদ্বেষী ব্যাখ্যা এবং ধর্মীয় রক্ষণশীলতার সমালোচনা করেছেন। কিন্তু তাঁর সমালোচকদের মতে, হিন্দু সমাজে বিদ্যমান কুসংস্কার, জাতপাত, নারী নিপীড়ন বা ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস নিয়ে তাঁর অবস্থান তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান। যদিও বাস্তবে তিনি কিছু ক্ষেত্রে হিন্দু ধর্মীয় রক্ষণশীলতারও সমালোচনা করেছেন, তবুও জনপরিসরে তাঁর পরিচয় প্রধানত "ইসলামের সমালোচক" হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এখানেই মূল বিতর্ক। একজন লেখকের সমালোচনার লক্ষ্য কি কোনো ধর্মীয় মতাদর্শ, নাকি একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়? যদি লক্ষ্য হয় মানবমুক্তি, তবে সমালোচনার মানদণ্ডও সর্বজনীন হওয়া উচিত। একইভাবে যদি নারীর অধিকারই প্রধান উদ্বেগ হয়, তবে সেই উদ্বেগ মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান কিংবা অন্য যেকোনো সম্প্রদায়ের নারীর ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
তসলিমা নাসরীন নিঃসন্দেহে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সাহসী ও প্রভাবশালী লেখক। তাঁর অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু একজন লেখকের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা মানেই তাঁর সব অবস্থানের সঙ্গে একমত হওয়া নয়। বরং গণতান্ত্রিক সমাজে তাঁর মতো ব্যক্তিত্বদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রশ্ন তোলা, সমালোচনা করা এবং তাঁদের বক্তব্যের সামঞ্জস্য যাচাই করাই বুদ্ধিবৃত্তিক সততার পরিচয়।
আজকের বিতর্ক তাই তসলিমা নাসরীনকে ঘিরে নয়; বরং একটি বৃহত্তর প্রশ্নকে ঘিরে—মানবতাবাদ কি নির্বাচিত হতে পারে? মৌলবাদবিরোধিতা কি কেবল এক ধর্মের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, নাকি সব ধরনের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উগ্রতার বিরুদ্ধে সমানভাবে প্রযোজ্য? এই প্রশ্নের উত্তরই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে কোনো লেখকের অবস্থান কতটা সর্বজনীন, আর কতটা নির্বাচিত রাজনৈতিক অবস্থান।
এই কারণেই আজকের বিতর্ক কেবল তসলিমা নাসরীনকে নিয়ে নয়, বরং বুদ্ধিজীবীর নৈতিক অবস্থানকে নিয়ে। একজন লেখক কি কেবল একটি বিশেষ ধরনের মৌলবাদকে চিহ্নিত করবেন, নাকি ক্ষমতাসীন মতাদর্শের সাম্প্রদায়িক প্রবণতাকেও একই সাহসে প্রশ্ন করবেন? ভারতে মুসলিম মৌলবাদের সমালোচনা যেমন প্রয়োজন, তেমনি হিন্দু জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় মেরুকরণ এবং সংখ্যালঘুদের প্রতি বিদ্বেষমূলক রাজনীতির সমালোচনাও সমানভাবে প্রয়োজন। এই ভারসাম্য অনুপস্থিত থাকলে মৌলবাদবিরোধিতা কখনও কখনও রাজনৈতিক পক্ষপাত হিসেবেও প্রতিভাত হতে পারে।