আজ শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ইং

Advertise

মুক্তমত

নিউজ ডেস্ক

০২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০১:১১

হুমায়ুন আজাদের গুরু!

সক্রেটিসের সরাসরি নির্দিষ্ট কোনো গুরু বা শিক্ষক ছিলেন না, তবে প্রখ্যাত নারী দার্শনিক আস্পাসিয়া ও আনাক্সাগোরাস তাঁর চিন্তাগঠনে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। আর এরিস্টটলের প্লেটো আর প্লেটোর তো সক্রেটিস সরাসরিই গুরু ছিলেন৷ শ্রীচৈতন্যের গুরু ছিলেন ঈশ্বর পুরী ও কেশব ভারতী আর লালনের গুরু সিরাজ সাঁই৷...


তাহলে বিক্রমপুরের রাঢ়ীখালের মতো প্রত্যন্ত একটি গ্রামে কীভাবে হুমায়ুন আজাদের মতো প্রথাবিরোধী ও বহুমাত্রিক একজন লেখকের জন্ম হলো যার লেখার মূল উপজীব্য আবার তাঁর শৈশব। যে শিক্ষাগুরুর সান্নিধ্যে তিনি হুমায়ুন আজাদ হয়ে উঠেন তার নাম নূর-উল-হুসেন। তার কারণেই তিনি তার হাইস্কুলটিকে বলতেন, তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়! পরে হুসেন স্যার রাঢ়ীখাল স্যার জগদীশচন্দ্র বসু ইনস্টিটিউশন ছেড়ে আমাদের ভাগ্যকুল হরেন্দ্রলাল উচ্চ বিদ্যালয়ে চলে আসেন। আজাদ স্যার ছিলেন হুসেন স্যারের তরুণ বয়সের ছাত্র আর আমি ছিলাম তার শেষ বয়সের ছাত্র। এভাবেই আজাদ স্যার আর আমি সতীর্থ! আবার আমি আজাদের সরাসরি সান্নিধ্যে থেকেও জেনেছি, শিখেছি৷


নূর উল হুসেন স্যারকে নিয়ে তাঁর প্রিয় ছাত্র হুমায়ুন আজাদ বলেছেন, 'তিনি আমাদের একমাত্র আধুনিক চিন্তার শিক্ষক ছিলেন৷' তিনি সম্ভবত শ্রীনগর উপজেলার প্রথম প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক মানুষ৷ তাঁর এই মনোভাবই ঢুকে পড়েছিল হুমায়ুন আজাদের ভিতরে৷ তিনি হুসেন স্যারের কারণেই বলেছিলেন, যা শেখার তা তিনি রাঢ়ীখাল স্যার জগদীশচন্দ্র ইনস্টিটিউশনেই শিখেছেন,৷ হুসেন স্যারই তাঁর মধ্যে অবিশ্বাসের বীজ বপন করে দিয়েছিলেন। তাদের দুজনের বাড়িই বিখ্যাত রাঢ়ীখাল গ্রামে একটি পুকুরের দুই পাড়ে৷


হুসেন স্যারের সাথে ভাগ্যকুল জমিদার পরিবারের ঘনিষ্ঠতা ছিল৷ তিনি জমিদার বাড়ির ভিতরের অনেক খবর জানতেন৷ এসব তিনি কিছুটা লিখেছেন৷ কবিতা, উপন্যাস, ইতিহাস, প্রবন্ধ মিলিয়ে তাঁর বইয়ের সংখ্যা ২০টির মতো৷ জমিদারদের আকর্ষণেই তিনি রাঢ়ীখাল ছেড়ে ভাগ্যকুল হরেন্দ্রলাল উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক হন৷ আমাদের সৌভাগ্য তাঁকে আমরা শিক্ষক হিসেবে পাই৷ তিনি শান্তি নিকেতনে পড়েছেন৷ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন৷ রবীন্দ্রনাথ সরাসরি তাঁর গুরু ছিলেন। তিনি আমাদের অষ্টম শ্রেণি থেকে পড়ানো শুরু করেন৷ তাঁকে বোঝতে আমারও সময় লাগে৷ তিনি চাইতেন না ছাত্ররা ভুল শিখুক৷ ক্লাসে নাম ডাকার সময় তিনি চাইতেন না, কেউ 'জি স্যার' বলুক বা 'উপস্থিত স্যার' বলুক৷ তারা একটা নির্দিষ্ট ভাষায় বলবে৷


শুক্রবার সকালে স্যার আমাদের বাড়ির কাছে এসে খবর পাঠাতেন৷ স্যারকে তাঁর বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসতাম৷ স্যার ভাবতেন দরিদ্র মানুষরা একসময় ঘুরে দাঁড়াবে৷ মানুষের মধ্যেকার বৈষম্য দূর হবে৷ মাও সে তুং এর লংমার্চের মতো পদ্মা পাড়ের লক্ষ লক্ষ নিপীড়িত মানুষ রাজধানী ঢাকা দখলে নিবে একদিন৷ আমি স্যারের এসব চিন্তা হাস্যকর মনে করে হাসতাম৷ আজ আমিও সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখি৷ তিনিই আমাকে দিয়ে 'ভোলগা থেকে গঙ্গা' পড়িয়েছেন—যখন আমি দশম শ্রেণির ছাত্র৷ দরিদ্র মানুষের কল্যাণের কথা বলতেন, বৈষম্যহীন সমাজের কথা বলতেন।


ধর্মান্ধ মৌলবাদীরা স্যার বিরক্ত করতো৷ একবার তাঁকে জোর করে মসজিদে নিয়ে যায়৷ তিনি প্রতিবাদও করেননি আর মসজিদেও যাননি৷ ধর্মীয় বিষয়ে তিনি কোন বক্তব্য রাখতেন না আর ধর্মীয় অনুশাসন পালনেও আগ্রহ দেখাতেন না৷ স্যার ধুতিও পড়তেন বাঙালির পোশাক মনে করে৷ এই মহান শিক্ষক অবসরে গেলে আমাদের স্কুল কর্তৃপক্ষ তাঁকে বিদায় সংবর্ধনা দিতে অস্বীকার করে৷ বন্ধু সাইফুল ও আমি সিদ্ধান্ত নেই আমরাই তাঁকে সংবর্ধনা দিব৷ হুসেন স্যারকেই জিজ্ঞাসা করি, প্রধান অতিথি কাকে করবো? তিনি তার প্রথম জীবনের ছাত্র হুমায়ুন আজাদকে প্রধান অতিথি করতে বলেন৷ আমাদের সাথে হুমায়ুন আজাদের যোগসূত্র সেটাই৷ আমরা ফোলার রোডে আজাদ স্যারের বাসায় গিয়ে উপস্থিত হই।

স্যার বলেন ১৫ বছর গ্রামে যাই না। আমি অবশ্যই যাবো! সেদিন ছিলো শুক্রবার। স্যার এতোটা বাগ্মী ছিলেন তা আমাদের জানা ছিলো না। তিনি তাঁর স্বভাবসূলভ ঢঙ্গে এক সুদীর্ঘ ও অনবদ্য বক্তব্য রাখলেন টানা দুইটা পর্যন্ত। এরপর হুমায়ুন আজাদ স্যার অসংখ্য বার আমাদের ভাগ্যকুলে এসেছেন এবং আমরা তার ছায়াসঙ্গী হিসেবে থেকেছি। আমার সৌভাগ্য যে হুমায়ুন আজাদ স্যারেরও বিস্তর সান্নিধ্য পেয়েছি।


হুসেন স্যারও অনেকদিন গত হয়েছেন৷ গত হয়েছেন আজাদ স্যারও। কিন্তু তাদের আধুনিক ভাবনা কেবল বিক্রমপুরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি—ছড়িয়েছে সারাদেশেই—সেটা হুমায়ুন আজাদের মাধ্যমেই৷ আধুনিক ভাবনা আরও অনেকেই ভেবেছেন—আরজ, শরিফ, অভিজিৎ—আরও অনেকে৷ তারা নেই কিন্তু তাদের ভাবনা আরও আধুনিক হয়ে আলো ছড়াচ্ছে৷ হুসেন স্যার ও আজাদ স্যারকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি৷

শেয়ার করূন

আপনার মতামত