Advertise
১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৭:১১
মাও সেতুংকে নিয়ে প্রপাগান্ডা ও বাস্তবতা:
গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠাতা মাও সেতুং-এর রাজনৈতিক জীবন এবং তাঁর নীতিসমূহ নিয়ে পশ্চিমা মূলধারার ইতিহাস ও গণমাধ্যমে বেশ কিছু ভুল, একপেশে বা অতিরঞ্জিত নেতিবাচক বক্তব্য প্রচলিত আছে৷ এগুলোর বিরুদ্ধে খুব কমই বলা হয়৷
পশ্চিমা বিভিন্ন বই ও প্রোপাগান্ডায় দাবি করা হয়, মাও সেতুং "ইচ্ছাকৃতভাবে" বা তাঁর নিষ্ঠুরতার কারণে ৭ থেকে ৮ কোটি মানুষকে হত্যা করেছেন।
বাস্তবতা হলো মাওয়ের সময়কালে ‘গ্রেট লিপ ফরওয়ার্ড’-এর ব্যর্থতা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ১৯৫৯-১৯৬১ সালের মধ্যে চীনে একটি বড় দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। তবে সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এই মৃত্যুর পেছনে মাওয়ের কোনো 'ইচ্ছাকৃত গণহত্যার পরিকল্পনা' ছিল না, বরং এটি ছিল স্থানীয় আমলাদের ভুল রিপোর্ট এবং চরম বৈরী আবহাওয়ার সম্মিলিত ফলাফল। তদুপরি, পশ্চিমা গবেষকেরা এই মৃত্যুর সংখ্যার হিসাব করার সময় স্বাভাবিক মৃত্যুর সংখ্যাকেও দুর্ভিক্ষের মৃত্যুর সাথে জুড়ে দিয়ে উপাত্ত অতিরঞ্জিত করেছেন বলে অনেক নিরপেক্ষ জনসংখ্যাবিদ মনে করেন। ওই সময়ে সম্ভবত ১০/১২ লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছে৷
মাও সেতুংকে প্রায়শই হিটলারের মতো একজন রক্তপিপাসু ও উন্মাদ স্বৈরশাসক হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়।
বাস্তবতা হলো ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ জ্যাক গ্রে-সহ অনেক এশীয় বিষয়ক গবেষক এই তুলনাকে ভুল মনে করেন। হিটলারের লক্ষ্য ছিল জাতিগত নিধন, কিন্তু মাওয়ের লক্ষ্য ছিল একটি দরিদ্র, সামন্ততান্ত্রিক ও উপনিবেশিক শোষণে জর্জরিত দেশকে আধুনিক ও স্বাবলম্বী রাষ্ট্রে রূপান্তর করা। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি নিজেই মাওয়ের মূল্যায়ন করতে গিয়ে '৭০ ভাগ সাফল্য এবং ৩০ ভাগ ভুল' নীতি গ্রহণ করেছে, যা দেখায় যে তাঁর ভুলগুলোকে স্বীকার করা হলেও তাঁকে হিটলারের মতো ঢালাও খলনায়ক ভাবা ঐতিহাসিক বাস্তবতার পরিপন্থী।
অভিযোগ করা হয়, মাওয়ের সমাজতান্ত্রিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চীনের অর্থনীতিকে পুরোপুরি পঙ্গু ও দেউলিয়া করে দিয়েছিল।
বাস্তবতা হলো ১৯৪৯ সালে মাও যখন ক্ষমতা নেন, তখন চীন ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত, চরম দরিদ্র এবং আফিমের নেশায় বুঁদ একটি দেশ। মাওয়ের ২৬ বছরের শাসনামলে চীনের অর্থনীতি ধ্বংস হয়নি, বরং আধুনিক চীনের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল। তাঁর সময়ে চীনের মানুষের গড় আয়ু ৪১ বছর থেকে বেড়ে ৬৫ বছরে পৌঁছায়। সাক্ষরতার হার ২০% থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৬৬% পার হয়৷ দেশের শিল্প পরিকাঠামো, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা এবং বিশাল সেচ ও বাঁধ প্রকল্পগুলো মাওয়ের আমলেই তৈরি হয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে ডেং শিয়াওপিং-এর অর্থনৈতিক সংস্কারের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।
পশ্চিমা কিছু প্রচারণায় মাওয়ের ব্যক্তিগত জীবনকে কেন্দ্র করে তাঁকে নারীবিদ্বেষী বা নারীদের ওপর অত্যাচারী হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়।
বাস্তবতা হলো চীনের ইতিহাসে নারীর ক্ষমতায়নে মাও সেতুং সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছেন। তিনিই চীনে বহুবিবাহ, বাল্যবিয়ে এবং নারীদের জোরপূর্বক পা বেঁধে রাখার অমানবিক প্রাচীন প্রথা আইন করে নিষিদ্ধ করেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি ছিল, 'নারীরা আকাশের অর্ধেকটা ধরে রেখেছে'। তিনি নারীদের বিবাহবিচ্ছেদ ও সম্পত্তির সমান অধিকার নিশ্চিত করেছিলেন। মাওয়ের আগের জামানায় কেউ ফিরে যেতে দুঃস্বপ্নেও চাইবে না৷
পুঁজিবাদী ও মৌলবাদী সমাজ দাবি করে, মাও সেতুং কেবল নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিঃশেষ করতেই 'সাংস্কৃতিক বিপ্লব' শুরু করেছিলেন।
বাস্তবতা হলো সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় কিছু বিশৃঙ্খলা এবং কিছু মানুষের ওপর অন্যায় নিপীড়ন হয়েছিল—এটি ঐতিহাসিক সত্য এবং চীন সরকারও একে ভুল হিসেবে স্বীকার করে। তবে মাওয়ের উদ্দেশ্য কেবল ব্যক্তিগত ক্ষমতা রক্ষা ছিল না। মাও লক্ষ্য করেছিলেন যে সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো চীনের আমলারাও বিপ্লবের মূল চেতনা ভুলে গিয়ে নতুন এক সুবিধাবাদী শ্রেণীতে পরিণত হচ্ছে। দল ও রাষ্ট্রের এই আমলাতান্ত্রিক রূপ পরিবর্তন করতে তিনি সাধারণ তরুণ ও শ্রমিকদের 'সদর দপ্তরে আঘাত করার' ডাক দিয়েছিলেন। পদ্ধতিগতভাবে এটি চরম বিপর্যয় ডেকে আনলেও এর পেছনে মূল আদর্শিক তাড়না কাজ করেছিল, কোন ব্যক্তিগত ক্ষমতার লোভ নয়।
যত মিথ্যাচারই করা হোক, আজকের চীন মাও সেতুং এর বিপ্লব ও চেতনারই ফল—এটাই বাস্তবতা৷ গভীর শ্রদ্ধা মাও!