আজ শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ইং

Advertise

সম্পাদকীয়

মুজিব রহমান

০৭ অক্টোবর, ২০২৩ ০১:১২


সর্বশেষ আপডেট :
০৭ অক্টোবর, ২০২৩ ০১:২৩

নতুন কথা ওরা সহ্য করে না


পৃথিবীতে যারাই নতুন কথা বলেছে সবাই বিপদে পড়েছে। দেবতা ও স্রষ্টার ভক্তরা তাদের বিপদে ফেলেছে। কখনো হত্যা করেছে, কখনো হামলা করেছে, কখনো জেলে পুরেছে। বাংলাদেশের জন্য মুক্তচিন্তাই ছিল নতুন কথা। আরজ আলী ও আহমদ শরীফের বিরুদ্ধে লাগাতার লেগে ছিল। হুমায়ুন আজাদ ও অভিজিৎ রায়সহ বহুজনকে হত্যা করেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তান ও ভারতেও এমন হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। মকবুল ফিদা হুসেন ও সালমান রুশদীর মতো বিশ্বখ্যাত শিল্পী-ঔপন্যাসিককেও ভারত ছাড়তে হয়েছে। দাউদ হায়দার ও তসলিমা নাসরিনকে বাংলাদেশ ছাড়তে হয়েছে৷ এটা নতুন নয়। আমরা যত অতীতে যাব মূর্খ মৌলবাদীদের ততই ভয়ঙ্করসব কাণ্ড দেখবো।

গ্যালিলিওকে ওরা ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেছিল। সে বলেছিল পৃথিবী গোলাকার ও সূর্যের চারদিকে ঘোরে। তাঁর এই বক্তব্য সকল ধর্মের সাথেই সাংঘর্ষিক। যদি এটা সত্য হয় তবে ধর্মকে টিকিয়ে রাখা যায় না। তবে পৃথিবীতে অজ্ঞ ও মূর্খ লোকের সংখ্যা এখনও প্রচুর বিশেষ করে দরিদ্র ও মানহীন শিক্ষার দেশগুলোতে। গ্যালিলিওর আগে এমন কথা বলেছিলেন ব্রুনো। তাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল। কোপার্নিকাস যদি বেঁচে থাকতেন তবে ব্রুনোর আগে তাকেই হত্যা করা হতো।

এর আগে ইউরোপে বছরের পর বছর ছিল অন্ধকার যুগ। সেখানে নতুন চিন্তা নিষিদ্ধ ছিল। এরমধ্যেই আলো ছড়াতে চেয়েছিলেন আরব/পারস্য অঞ্চলের বেশ কয়েকজন দার্শনিক। তারাও রাষ্ট্র ও মৌলবাদীদের নিপীড়নের মুখে পড়ে এবং একসময় বাগদাদ কেন্দ্রিক সকল জ্ঞানচর্চাও বন্ধ হয়ে যায়। ইউরোপের মতো আরব/পারস্য অঞ্চলও ঢুকে যায় অন্ধকারে। এসবের আগে আমরা দেখেছি হাইপেশিয়াকে যিনি আলেকজান্দ্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। তাকেও মূর্খ খৃস্টান মৌলবাদীরা হত্যা করে নির্মমভাবে।

তাদের আগে যেমন জ্ঞানচর্চার বিকাশ ঘটেছিল নগর রাষ্ট্র এথেন্সে আবার মৌলবাদীদের হাতে প্রচুর নিপীড়নের ঘটনাও ঘটে সেখানে। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা সক্রেটিসকে হেমলক পান করিয়ে হত্যা করা। তার বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হয়েছিল প্রচলিত ধর্ম অবমাননার- নতুন চিন্তা সৃষ্টি ও যুবকদের বিপথগামী করার। এক এথেন্সেই ঘটেছে বহু ঘটনা। দার্শনিক এনাক্সগোরাস বলেছিলেন, সূর্য হল একটি লাল ধাতুর গোলক। সূর্যের চলাচলে দেবতাদের হাত নেই। তখন এথেন্সের মানুষের ধর্ম বিশ্বাস ছিল— দেবতা এপোলো প্রতিদিন চার ঘোড়ার রথ টেনে সূর্যকে পূর্ব থেকে পশ্চিমে নিয়ে যায়।

হিন্দু পুরাণে ৭ ঘোড়ার কথা বলা আছে। ইসলামে আছে ৭০ হাজার ফেরেশতার কথা। তারাও সূর্যকে পূর্বাকাশ থেকে পশ্চিমে টেনে নিয়ে যেতো। এনাক্সগোরাসের বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়। তিনি পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এথেন্সকে একদা সাজিয়েছিল মহান শিল্পী ফিডিয়াস। মন্দিরের কোথাও তাঁর মুখাবয়ব রয়েছে দাবী করে তাঁর বিরুদ্ধেও উঠে নিজেকে দেবতা ঘোষণার অভিযোগ। তাঁকে অন্ধকার জেলে ঢুকানো হয় এবং বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়।

দার্শনিক প্রোটাগোরাস বলেছিলেন দেবতারা কিছুই নিয়ন্ত্রণ করে না, মানুষই সবকিছুর পরিমাপক। প্রোটাগোরাসের বিরুদ্ধেও ধর্মবিরোধীতার মামলা হয়েছিল। তিনিও পালিয়ে যান। তবে তিনি বেশিদিন বাঁচতে পারেন নি। শিল্পী ডেমনই প্রথমে দেবতার পরিবর্তে মানুষের গান গাওয়া শুরু করেছিলেন। তার বিরুদ্ধে দেবতাদের অবমাননার অভিযোগ আনা হলে তিনিও পালিয়ে যান। নারী দার্শনিক আসপাশিয়ার বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হয় যে, তিনি নারীদের কুপথে নিয়ে যাচ্ছেন। এ মামলায় ধর্মান্ধ মৌলবাদীরা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হলেও নতুন অভিযোগ আনে— সে দেবতা মানে না, দেবতাদের নিয়ে বাজে কথা বলে। দার্শনিক এরিস্টটলকেও আত্মরক্ষায় পালাতে হয়েছিল৷


ভারতে বৈদিক সংস্কৃতিতে আমরা আরো ভয়াবহতা দেখেছি। কোন শুদ্র ধর্ম চর্চা করছে এমনটা শুনে পৌরণিক দেবতা রাম তাকে হত্যা করে। নিম্নবর্ণের মানুষ গীতা/বেদ বা কোন ধর্মীয় শ্লোক উচ্চারণ করলেই তার জিহ্বা কর্তন করা হতো, গ্রন্থ পড়তে শিখলে তার চোখ উপড়ে ফেলা হতো এবং গোপনে কান পেতে ধর্মের বাণী শুনলে তার কানে শিসা ঢেলে দেয়া হতো। ব্রাহ্মণরা ধর্মের দোহাই দিয়ে শয়ে শয়ে শিশু-কিশোরীদের বিয়ে করতো। সমাজে ভয়ঙ্কর মনুসংহিতার আইন প্রচলিত ছিল। ভারতে ধর্মীয় উগ্রতার ধরন বদলেছে মাত্র।

এখনো গোমাংশ খাওয়ার জন্য মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। গরুরু বর্জ্য মূত্র-গোবর সেবন করে ধর্মের দোহাই দিয়ে, লক্ষ লক্ষ মানুষ নগ্ন হয়ে কুম্ভমেলা করে। সাম্প্রতিক সময়েও ঘটছে হিন্দুত্ববাদী চেতনার বিরুদ্ধে কথা বলার শাস্তি হিসেবে হত্যার ঘটনা। ভারতের বেঙ্গালুরুর প্রখ্যাত কবি ও সম্পাদক পি লঙ্কেশের কন্যা সম্পাদক গৌরী লঙ্কেশকে শুধু সংঘ পরিবার ও হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে লেখার জন্য ২০১৭ সালে গুলি করে হত্যা করে হিন্দু জঙ্গিরা। তাদের হাতেই খুন হন মহাত্মা গান্ধী!


উন্নত বিশ্ব মৌলবাদীদের কোনঠাসা করেই এগিয়ে যাচ্ছে। এখন সময় আসছে এশিয়ারও। জাপান, সিংগাপুর, হংকং, তাইওয়ান, চীন এগিয়ে যাচ্ছে মৌলবাদকে কবর দিয়েই। দক্ষিণ এশিয়া, আরব/পারস্য, আফ্রিকাকেও ভাবতে হবে— নতুন জ্ঞানের কথা। অজ্ঞতা ও মূর্খতা নিয়ে পড়ে থাকলে কেবলই পিছিয়ে পড়ে থাকতে হবে। মৌলবাদকে হঠাতে না পারলে নতুন জ্ঞানের সৃষ্টি করা অসম্ভব হয়ে উঠে৷ মৌলবাদকে হঠিয়েই নতুন জ্ঞানের দ্বার উন্মোচন করতে হবে৷

শেয়ার করূন

আপনার মতামত