আজ শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ইং

Advertise

সম্পাদকীয়

হাসান শাহরিয়ার

০১ অক্টোবর, ২০২৪ ১৯:১২

বিয়ানীবাজারে গণঅভ্যূত্থানের ঢেউ লাগেনি

বিশেষ সম্পাদকীয়


পহেলা জুলাই থেকে শুরু হয় ২৪'র কোটা আন্দোলন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নামের এই সংগঠন ৪ দফা থেকে এক দফায় এসে ১৫ বছরের অধিক সময়ের স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পতন নিশ্চিত করে। আন্দোলনের এক পর্যায়ে ১৪ জুলাই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা যখন ঢাকায় গণপদযাত্রা করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে স্মারকলিপি দিতে যায় তখন তিনি তার বক্তব্যে কোটা আন্দোলনকারীদের “রাজাকারের নাতি-পুতি” হিসেবে অভিহিত করেন।

প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া হিসেবে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা তখন ব্যঙ্গ করে বলতে শুরু করে “তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার; কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার” এবং “চাইতে গেলাম অধিকার; হয়ে গেলাম রাজাকার” স্লোগান দিয় বেরিয়ে আসে, আর তখন থেকে আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়, এক পর্যায়ে "কমপ্লিট শাটডাউন" কর্মসূচি দেয়া হয়।

যখন সাবেক মন্ত্রী কাদের প্রকাশ্যে ছাত্রলীগকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন প্রতিহত করার নির্দেশ দেন, তার পর থেকে শুরু হয় সাধারণ ছাত্রদের সাথে পুলিশ-ছাত্রলীগের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া; এক পর্যায়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ঢাকা বিশ্বিবদ্যালয় থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়, পর থেকে দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেয়া হয় ছাত্রলীগের সকল নেতাকর্মীদের, ফলশ্রুতিতে নেতাকর্মীরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে, পুলিশ আরো মারমুখী হয় পুলিশের সরাসরি গুলিতে শহীদ আবু সাঈদ পথেই লুটিয়ে পড়ে, এর পর থেকে আন্দোলন আরো তীব্রতর হয়, ফ্যাসিস্ট সরকার আরো পাশবিক রূপ ধারণ করে অগণিত ছাত্র-জনতা শহীদ হতে থাকে।

তখন সমন্বয়কদের নিয়ে সরকার নাটক শুরু করে, ৬ সমন্বয়ককে ডিবি পুলিশের হেফাজতে নিয় নাটক সাজায়। একাধারে ৬ দিন বৈঠক করে, অস্ত্রের মুখে সমন্বয়কদের দিয়ে আন্দোলন বন্ধের ঘোষণা দেয়। পরে অবশ্য আন্দলনের মুখে আবার তাদের ছেড়ে দেয়। দমন পীড়ন ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পায়। শতাধিক ছাত্রছাত্রীদের নির্বিচারে গুলির পর গুলি করে, লাশের পর লাশ পড়ে। এসব দেখেশুনে ছাত্রদের ভীড়ে জড়িত হন অভিভাবক, শিক্ষক, আইনজীবী থেকে শুরু করে ধিরে ধিরে সকল শ্রেণী পেশার মানুষ। সূচনা হয় গণজাগরণের। সুগম হয় গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্খিত ধার, আকাশে-বাতাসে ডাক শোনা যায় অসহযোগ আন্দোলনের, ছাত্র-জনতার গণমিছিল, "লং মার্চ টু ঢাকা"

অবশেষে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ১ দফা দাবির প্রেক্ষিতে সম্মিলিত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং দেশ থেকে ভারতে পালিয়ে বাঁচেন। শেখ পরিবারের ১৫ বছরেরও বেশি সময়ের স্বৈরাচারী দুঃশাসনের অবসান ঘটে। যদিও বাংলাদেশের জনগণ এর আগেও আন্দোলন সংগ্রাম করে স্বৈরাচারী সরকারের পতন নিশ্চিত করে, তবে বর্তমান সরকারের সময় মানুষের বাকস্বাধীনতা প্রায় পুরোপুরিই শৃঙ্খলিত ছিলো, অনেকটা আগের “বাকশাল” শাসন ছিলো। ভিন্ন মতালম্বিদের প্রায় স্বাধীনতাই ছিলো না। কথা বললেই পুলিশি হয়রানি আর গুম-খুন ছিলো নিত্য দিনের ঘটনা।
গণভ্যুত্থানকে অনেকেই যেহেতু দ্বিতীয় স্বাধীনতার কথা বলছে, আক্ষরিক অর্থে স্বাধীনতা বা কোন বিপ্লব হয়নি। হয়েছে ৫২ বছরের মধ্যে দীর্ঘতম (একটানাভাবে একটি পরিবার ও একটি সংঠনের) শাসন-শোষণের অবসান, এর আগেও এই দেশ অনেক সময় স্বৈরশাসকের উত্তান ঘটে আবার পতন হয়েছে। এইবার ছিলো একটু ব্যতিক্রম, দেশের স্বৈরতান্ত্রিক রিজিউমের মূল উঠপাঠন করে ছাত্রজনতা। এখানে দেশের বড় রাজনৈতিক দল ছিলো দর্শকের ভুমিকায়। কেননা তারাও কোননা কোনো কারণে জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারেনি বা দলগুলোর চরিত্র ছিলো 'মুদ্রার এপিট ওপিঠটি' এর মতো।

দেশে যখন পটপরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে আমাদের বিয়ানীবাজার এর ছাত্রজনতার মনোজগতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ পরিবর্তনের ঢেউ আঘাত করতে পারে নাই বা জনসম্মুখে দৃশ্যমান হয়নি। যদিও আমাদের নিকট অতীতের পূর্ব পুরুষ কোন রাজার প্রজা, ভূস্বামীর দাস বা আফ্রিকার অধিবাসী ছিল না। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসতে পারে ৫৬ বর্গমাইলের প্রায় ৩ লক্ষ মানুষ কি বিচ্ছিন্ন কোন দ্বিপের বাসিন্দা!!! নাকি সবাই আওয়ামীলীগ তাদের প্রজা বানিয়েছিলো? না, সবাই এই জনপদেরই মানুষ ছিলো, তাহলে কেন প্রতিবাদহীন, নিরব ছিলো।

অতীতে আমাদের এই অঞ্চলের নানকার বিদ্রোহ, স্বাধীকার-স্বাধীনতা, স্বৈরাচার এমনকি কিছুদিন আগে গণজাগরণসহ সকল আন্দোলন সংগ্রামে অংশগ্রহণ ছিলো দেখার মতো। তাহলে কেন একটি পরীক্ষিত প্রতিবাদী জনগুষ্টি মানুষের জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অস্থিতের সঙ্কটে স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনে ঠিকে থাকার সংগ্রামে নিরব ছিলো!

কারণ হিসেবে অনেকেই মনে করেন, দীর্ঘ কাল থেকে মৌলবাদ ও স্বৈরাচারী সরকারের শাসন-শোষণ-পীড়ন ও একাধিকবার প্রহসনের ভোটে বা ভোট বিহীন অনির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনা করায় মানুষের বর্তমান অবস্থা, যার ফলে গত এক দশকে জনপদকে আওয়ামিলীগীকরণ করা হয়, এলাকার সরকারী বেসরকারী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে আওয়ামিলীগের প্রাধান্য লক্ষনীয়ভাবে দৃশ্যমান ছিল, এখানে গ্রামের প্রাথমিক স্কুল-মসজিদ, ক্লাব-সমতি-খেলাধূলা-স্থানীয় ক্রিড়াসংস্থা-শিল্পসাহিত্যে তাদের যোগ্য থেকে অযোগ্য-অনভিজ্ঞ-অজ্ঞদের আধিক্য ছিলো বেশী।

শুরু থেকেই ‘বিয়ানীবাজার শিল্পকলা একাডেমি’ তাদের মনোনীত লোকেদের নিয়ন্ত্রণে চলছে, শিল্পসাহিত্য যারা চর্চা করে না তারা শিল্পকলার মতো প্রতিষ্ঠান চালিয়েছে, বাকি যে কয়টা সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার প্রতিষ্ঠান ছিলো বা আছে বলতে গেলে সবগুলোই দলীয়করণের ফলে প্রগতি চর্চার পথ রুদ্ধ; বলা যায় বন্ধই ছিলো, আর যা কিছু অবশিষ্ট ছিলো তা সরকার ও দলের উদ্দেশ্যে বাস্তবায়নের জন্য সচল।
এমনকি সামাজিক-সাংস্কৃতিক সকল অনুষ্ঠানে আওয়ামিলীগকে নেতৃত্ব দিতে দেখা যেত। আমার যদি ভুল না হয় ৯৯ ভাগ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানও সেই একই দলের মানুষের ছিলো। সরকারি রাস্তা-ড্রেন-বিল্ডিং-ব্রিজ যেকোনো অবকাঠামো নির্মাণ হলে দুর্নীতির সুযোগ থাকত। কথা বলার বা প্রতীবাদ করার পথ বন্ধ ছিলো। এসকল দূর্নীতি ঢাকার জন্য কৌশলে অনেক সংবাদমাধ্যম বা সামাজিক মাধ্যম দলের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছিলো। সরকার ও দলের বন্ধনা করার জন্য অনেক পত্রিকার পোর্টাল-পেইজ চালু করা হয়। আর দু'একটা নিরপেক্ষ থাকলেও সেগুলোর প্রচার, অনুমতি (লাইসেন্স) বাতিলের ভয়ে বা পুলিশি হয়রানির ভয়ে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রচার বা সত্য প্রকাশ ছিলো অসম্ভব।

আর রাজনৈতিক চিন্তার স্বাধীনতা, ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা বলতে কিছুই আর অবশিষ্ট থাকেনি, বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মী গত ১৬ বছর তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য প্রায় ছেড়ে দিতে হয়েছে, একেকজন ১০/১৫ মামলার আসামি ছিলো, কারণে অকারণে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা-জিঘাংসা থেকে পুলিশ দিয়ে হয়রানি করা হত। 'ছাত্র ইউনিয়ন' এর মত নিরীহ একটি ছাত্র সংগঠনের ব্যানার পর্যন্ত বিয়ানীবাজার কলেজও অক্ষত থাকেনি। কলেজ ক্যাম্পাস থেকে সরিয়ে ফেলে, এ সমস্ত ক্রিয়াকলাপ দেখে শুনে মানুষ প্রতিবাদহীন এক ভীতু জণগুষ্টিতে রুপান্তরিত হচ্ছিল, অনেকটা গান্ধিজীর” তিন বানরে’র” অবস্থা ।

৫ আগস্টের পটপরিবর্তন আবার মানুষের সংবিত্তি ফিরে আসে। ছাত্র-জনতার আনন্দ মিছিল, ট্রাফিক কন্ট্রোল ও গ্রাফিতি দেখে মনে হচ্ছে আবারও বিয়ানীবাজার তার আগের ঐতিহ্য ফিরে পেয়েছে। পাশাপাশি নির্যাতিতের (রাজনৈতিক দলের) অনৈতিক প্রতিশুধপরায়নাতার রূপও দেখে বিয়ানীবাজারবাসী। বিএনপি-জামায়েত ৫ তারিখে তারা তাদের মুক্তির মিছিল দেয়। ঐদিন আওয়ামীলীগের দ্বায়ীত্বশীল নেতাদের প্রায় ৬/৭ টি অফিস ভাঙচুর করে শহরে ভীতির তাণ্ডব ফেলে দেয়। উশৃংখল জনতার তকমা দিয়ে রাজনৈতিক দল তাদের উপর থেকে দায় এড়িয়ে দিতে চাচ্ছে। যদিও অনেক ভিডিও ফোটেজ থেকে সন্ত্রাসীদের প্রশাসন দরতে পারবে যদি স্বদিচ্ছা থাকে। একই দিন বিয়ানীবাজার থানায় অগ্নিসংযোগ ও অস্ত্র-গোলাবারুত লোটের চিত্র প্রত্যক্ষ করে।

ঘটনাস্থলে পুলিশ গুলি করে তাদের আতœরক্ষার জন্য, কে বা কার গুলাগুলিতে ৩ জনের প্রাণ যায়, যেখানে পুলিশ প্রশাসনের বাড়াবাড়ির কোন ভুমিকাই ছিলো না। ’২৪ এর আন্দোলনে বিয়ানীবাজার পুলিশের ভূমিকা ছিলো জনগণের সেবকের মতো। তারপরো ৫ তারিখ কোন এক অজ্ঞাত রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয় তারা। ঘটনার ১৫ দিন পরে হত্যা মামলা হয় ৫ সাংবাদিক ও কয়েকজন প্রবাসীসহ শতাধিক আওয়ামীলীগ নেতা কর্মীর উপর অথচ এই দিন আওয়ামীলীগ ছিলো এক কথায় বাজার থেকে পলাতক। ২৭ তারিখ আরো দুটি মামলা হয়, তাও রাজনৈতিক প্রতিহীংসার কারণে।

পরিশেষে বলতে হয় আমাদের রাজনৈতিক সংকৃতি সেই আগের মতোই থেকে যাচ্ছে। সব কিছু দেখেশুনে মনে হচ্ছে আওয়ামীলিগের পাশাপাশি অন্যান্য সন্ত্রাসী রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীদের আগে মানুষ হোয়ার সংগ্রামে মনোনিবেশ করতে হবে। পরে না হয় রাজানীতির নামে মানুষের সেবা দেশের সেবা করবেন। শেষে এটাই বলতে চাচ্ছি ছাত্র-জনতার এই ত্যাগ অসংখ্য শহীদের রক্তের গণঅভ্যুত্থান যেন দেশ ও মানুষের কল্যাণ আসে।

শেয়ার করূন

আপনার মতামত