Advertise
২৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১৮:০৪
একসময় প্রবারণা পূর্ণিমা এলেই উৎসবের আমেজে মুখর হয়ে উঠত কুয়াকাটা ও কলাপাড়ার রাখাইন পল্লিগুলো। সন্ধ্যা নামতেই আকাশে উড়ত শত শত রঙিন ফানুস। সাগরপাড়ের রাতের আকাশ আলোকিত হয়ে উঠত ফানুসের আলোয়। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসতেন সেই দৃশ্য দেখতে।
ধর্মীয় আবহের পাশাপাশি ফানুস ওড়ানো ছিল রাখাইন সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য, আনন্দ ও সম্মিলিত উদযাপনের এক অনন্য প্রতীক।কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। একসময় শত শত ফানুসে আকাশ রাঙানো উৎসব এখন অনেকটা অতীত। কোথাও সীমিতসংখ্যক ফানুস উড়িয়ে, আবার কোথাও নামমাত্র আয়োজনের মধ্যদিয়ে উদযাপন করা হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী এ উৎসব।সোমবার (২৬ অক্টোবর) থেকে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা ও কলাপাড়া উপজেলার বিভিন্ন রাখাইন পল্লিতে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্যদিয়ে উদযাপিত হচ্ছে প্রবারণা পূর্ণিমা। সকাল থেকে বৌদ্ধবিহারগুলোতে প্রার্থনা, শীল গ্রহণ, সংঘদান, পিঠা-পুলি নিবেদন ও ধর্মীয় দেশনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সন্ধ্যায় প্রদীপ প্রজ্বালন ও ফানুস ওড়ানোর মধ্য দিয়ে উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ উদযাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, এটা চলবে দুদিন।
তবে আয়োজনের পরিধি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে রয়েছে অতীতের সঙ্গে বর্তমানের তুলনা।শত শত ফানুসের জায়গায় হাতেগোনা কয়েকটিস্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, একসময় কুয়াকাটা ও আশপাশের রাখাইন পল্লিগুলোতে প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে টানা কয়েক রাত ধরে শত শত ফানুস ওড়ানো হতো। পল্লি থেকে পল্লিতে চলত প্রস্তুতি, তৈরি হতো ফানুস। আর উৎসবকে ঘিরে গড়ে উঠত সম্মিলিত আনন্দের পরিবেশ। ধর্মীয় অনুভূতির পাশাপাশি এ আয়োজন ছিল নিজেদের সংস্কৃতি ও সামাজিক বন্ধন প্রকাশের একটি বড় উপলক্ষ।বর্তমানে অনেক পল্লিতে সেই আয়োজন আর নেই। কোথাও ১০-১২টি, কোথাও তারও কম ফানুস ওড়ানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
ফলে উৎসবের ঐতিহ্য টিকে থাকলেও তার ব্যাপ্তি ও জৌলুস আগের তুলনায় অনেকটাই কমেছে।একাত্মতার অভাব নাকি আর্থসামাজিক সংকট?উৎসবের জৌলুস কমে যাওয়ার কারণ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে রয়েছে নানা আলোচনা। অনেকের ধারণা, রাখাইন সম্প্রদায়ের মধ্যে আগের মতো পারস্পরিক একাত্মতা, সম্মিলিত উদ্যোগ ও সামাজিক সংহতি না থাকাও এর অন্যতম কারণ হতে পারে। আগে একটি পল্লির উৎসবকে সবাই মিলে নিজেদের উৎসব হিসেবে দেখতেন। সম্মিলিতভাবে ফানুস তৈরি, অর্থ সংগ্রহ ও আয়োজন সম্পন্ন করার মধ্যদিয়ে তৈরি হতো পারস্পরিক বন্ধন। বর্তমানে সেই সম্মিলিত উদ্যোগ অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন কেউ কেউ।তবে শুধু একাত্মতার অভাবকেই এর একমাত্র কারণ হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। রাখাইন পল্লির সংখ্যা কমে যাওয়া, জনসংখ্যার পরিবর্তন, আর্থিক সংকট, ভূমি হারানোর অভিজ্ঞতা ও ফানুস তৈরির উপকরণের মূল্যবৃদ্ধিও উৎসবের আয়োজন সীমিত হয়ে আসার পেছনে ভূমিকা রাখছে বলে স্থানীয়দের বক্তব্যে উঠে এসেছে।পল্লির অর্ধেকেই সীমিত আয়োজনকলাপাড়া উপজেলায় মোট ১৩টি রাখাইন পল্লি থাকলেও এবার প্রবারণা পূর্ণিমার উৎসব উদযাপিত হচ্ছে প্রায় অর্ধেক পল্লিতে। কোথাও সীমিতসংখ্যক ফানুস ওড়ানোর প্রস্তুতি রয়েছে, আবার কোথাও উৎসবের আয়োজন নেই বললেই চলে।
এতে একসময়কার বর্ণিল উৎসবের পরিসর ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসার চিত্র ফুটে উঠেছে।পাঞ্জুপাড়ার বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব মো. মান্নান হাওলাদার জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা ছোটবেলায় দেখেছি, প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে রাখাইন পল্লিগুলোতে ব্যাপক উৎসব হতো। শত শত ফানুসে রাতের আকাশ আলোকিত হয়ে উঠত। এখন সেই দৃশ্য আর তেমন দেখা যায় না।’কেরানিপাড়ার মাতুব্বর উংচং উচো বলেন, ‘আমরা নিজেদের জায়গা থেকে উৎসবটি ধরে রাখার চেষ্টা করছি। তবে আমাদের সংখ্যা কমে যাওয়ায় উৎসবের আয়োজনও ছোট হয়ে গেছে।’তিনি বলেন, ‘আগে রাখাইন পল্লিগুলোতে অনেক মানুষ ছিল। সবাই মিলে বড় পরিসরে উৎসব উদযাপন করতেন। এখন সেই পরিস্থিতি আর নেই। তারপরও নিজেদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি।’ধর্মীয় ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টাকুয়াকাটা কেন্দ্রীয় শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ ভদন্ত ইন্দ্রবংশ থেরো জানান, সকালে বিহারে রাখাইন নারীরা উপস্থিত হয়ে পঞ্চশীল ও উপোসথ শীল গ্রহণ করেন। এরপর ধর্মীয় দেশনা, পিঠা নিবেদন ও সবার মঙ্গল কামনায় সমবেত প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়। সন্ধ্যায় প্রদীপ প্রজ্বালন ও ফানুস ওড়ানোর আয়োজন রয়েছে।মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ উত্তম ভিক্ষু জানান, সকালে ধর্মীয় প্রার্থনা ও শীল গ্রহণের মধ্য দিয়ে তাদের বিহারে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। দিনভর ধর্মীয় আয়োজনের পাশাপাশি সন্ধ্যায় ঐতিহ্যবাহী ফানুস উৎসব অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বেতকাটা রাখাইন পল্লির ধর্ম বিজয় বৌদ্ধবিহারের সভাপতি মংচো জানান, তাদের পল্লিতে প্রথম রাতে ১০-১২টি ফানুস ওড়ানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।তাদের বিহারেও অন্তত ১০টি ফানুস ওড়ানোর কথা জানান গোড়া আমখোলা রাখাইন পল্লির বিজয়রামা বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ সুচিন্ত মহাথেরো।দিয়রাম খোলা পাড়ায় মাত্র চারটি রাখাইন পরিবারের বসবাস থাকলেও সেখানে ৪-৫টি ফানুস ওড়ানোর প্রস্তুতির কথা জানা গেছে।কুয়াকাটা ট্যুর গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কেএম বাচ্চু জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রবারণা পূর্ণিমা কুয়াকাটার রাখাইন সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় উৎসব।
এ উৎসব দেখতে প্রতিবছর পর্যটকদের মধ্যে আগ্রহ থাকে। ফানুস ওড়ানোর ঐতিহ্য কুয়াকাটার পর্যটন আকর্ষণকেও সমৃদ্ধ করে। তবে আগের মতো বড় পরিসরে উৎসব না হওয়ায় পর্যটকদের জন্য সেই বর্ণিল আয়োজন দেখার সুযোগও কমে গেছে। রাখাইনদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে উৎসবটি আবারও দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।’মহিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শামীম হাওলাদার বলেন, ‘প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে থানার আওতাধীন সব বৌদ্ধবিহারে পুলিশি টহলের পাশাপাশি পরিদর্শন করা হয়েছে। উৎসব নির্বিঘ্নে উদযাপন নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।’কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান জানান, রাখাইন সম্প্রদায় যাতে নির্বিঘ্নে প্রবারণা পূর্ণিমা উদযাপন করতে পারে, সেজন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও উৎসব আয়োজনে সহায়তা দেওয়া হয়েছে।